২১ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঐক্যফ্রন্টের অভিন্ন ইশতেহার সোমবার ঘোষণা

  • জনবান্ধব পরিকল্পনা তুলে ধরার চেষ্টা, তারেকের প্রস্তাব যুক্ত করা নিয়ে দ্বিমত

রাজন ভট্টাচার্য ॥ দু’দফা তারিখ পরিবর্তনের পর আগামী সোমবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এদিন বেলা এগারোটায় হোটেল পূর্বাণীতে ইশতেহার ঘোষণা করা হবে। এবারের নির্বাচনে বিএনপি বা ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে পৃথক কোন ইশতেহার নয়। অভিন্ন ইশতেহার নিয়ে হাজির হবেন নতুন রাজনৈতিক মোর্চার

আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন। ইতোমধ্যে ইশতেহারের খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। জানা গেছে, আওয়ামী লীগের ইশতেহারের অপেক্ষায় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারের তারিখ বার বার পেছানো হচ্ছে। ফ্রন্ট নেতারা চান, ক্ষমতাসীন দলের ইশতেহারের চেয়ে আরও নতুন কিছু যোগ করতে; যাতে দেশের তরুণ ও যুব সমাজ থেকে শুরু করে নারীরা আকৃষ্ট হবে। এতে নির্বাচনী ফলে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এমন বিশ্বাস ফ্রন্ট নেতাদের।

চলতি বছর ১৩ অক্টোবর গণফোরামের নেতৃত্বে বিএনপিসহ কয়েকটি দল নিয়ে গঠিত হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এতে নাগরিক ঐক্য, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, জেএসডি যুক্ত হয়েছে। এছাড়া বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী ও সাবেক আওয়ামী লীগের নেতাও রয়েছেন। নতুন এই রাজনৈতিক মোর্চার পক্ষ থেকে প্রথম দফায় নবেম্বরের শেষ সপ্তাহে এবং ডিসেম্বরের ৮ তারিখে ইশতেহার ঘোষণার কথা বললেও পরে তা করেনি।

ইশতেহার তৈরির জন্য ৬ সদস্যের কমিটি করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। কমিটিতে বিএনপি থেকে মাহফুজ উল্লাহ,গণফোরাম থেকে আ ও ম শফিক উল্লাহ, নাগরিক ঐক্য থেকে ডাঃ জাহেদ উর রহমান, জেএসডি থেকে শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের অধ্যক্ষ ইকবাল সিদ্দিকী এবং ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী আছেন। ইতোমধ্যে ইশতেহার চূড়ান্ত করতে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ ডাঃ জাফরুল্লাহ গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

জানা গেছে, বিএনপির পক্ষ থেকে ইশতেহারে যেসব বিষয় যুক্ত হতে পারে তা কমিটির কাছে জমা দেয়া হয়েছে। এছাড়া গণফোরামসহ ফ্রন্টের শরিক দলগুলো নিজেদের পরিকল্পনা জমা দেয় ইশতেহার কমিটির কাছে। সকলের পরিকল্পনা থেকে একটি খসড়া চূড়ান্ত হয় প্রথমে। এরপর ইশতেহার কমিটি কিছু বিষয় ইশতেহারে যুক্ত করে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান সমন্বয়কারী মোস্তফা মহসিন মন্টু আগামী সোমবার ইশতেহার ঘোষণার কথা জানিয়ে বলেন, ঐক্যফ্রন্টের দলগুলোর দেয়া ইশতেহারের সমন্বয়ে অভিন্ন একটি ইশতেহার তৈরি করা হয়েছে। ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে ঐক্যফ্রন্টের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত থাকবেন।

২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি। তাই এবারের নির্বাচনে অংশ না নেয়ার পথেই হাঁটছিল দলটি। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পর পর দু’বার নির্বাচনে অংশ না নিলে দলের নিবন্ধন বাতিলের আইন রয়েছে। তাছাড়া দুর্নীতির দায়ে দল প্রধানের কারাদন্ড ও দলের ভাইস চেয়ারম্যানের দেশত্যাগের কারণে বিএনপিতে সঙ্কটের মাত্রা আরও বাড়ে। রাজনৈতিকভাবে অনেকটা বেকায়দায় থাকা বিএনপির হাল ধরেন কামাল হোসেন; যার নামমাত্র নেতৃত্বে এখন বিএনপি আবারও পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, লন্ডনের নির্দেশনায় চলছে ঐক্যফ্রন্ট। তবে কামাল হোসেন বিএনপিকে শেষ রক্ষায় এগিয়ে এলেও আসন বণ্টন ইস্যুতে ফ্রন্টের শরিক সব দল চাহিদা অনুযায়ী আসন পায়নি। খোদ কামাল হোসেনের দলও এ নিয়ে অনেকটা ক্ষুব্ধ।

২০০১ সালের এক অক্টোবর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে চার দলীয় জোট। এর পর থেকে ক্ষমতার বাইরে দলটি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলে থাকলেও ২০১৪ সাল থেকে একেবারেই সংসদের বাইরে বিএনপির অবস্থান। তাই এবারের নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার নিয়ে রয়েছে নানামুখী আলোচনা। কি চমক আছে এই জোটের ইশতেহারে তা নিয়ে অপেক্ষা অনেকের। তাছাড়া ভোট টানতে গণমুখী ইশতেহার আসবে, এটা বলছেন সবাই।

বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইশতেহারে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, দুদকের সংস্কার, সরকারী অর্থায়নে দরিদ্রদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান, কৃষিপণ্য উৎপাদনে ভর্তুকি ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫, চাহিদা অনুযায়ী কোটা সংস্কার, পরিবহন ও সেবা খাতসহ ১৭টি অঞ্চলভত্তিক বিকেন্দ্রীকরণ, অঞ্চলভিত্তিক সাংবিধানিক কোর্ট ও ‘অপ আইন’ রোধ, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ, সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার প্রতিশ্রুতি, বিদেশী কর্মসংস্থান, প্রবীণদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক সুবিধা, অবসরকালীন বিনিয়োগে সুদ বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয় থাকতে পারে। ‘দেশ বাঁচাতে, মানুষ বাঁচাতে, আনবে পরিবর্তন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’, ‘জনগণ এ রাষ্ট্রের মালিক’- এমন প্রত্যয় নিয়ে ঘোষিত হচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার।

নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের কথা মাথায় রেখে ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম কমানোর ঘোষণাসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে থাকছে কৃষকের স্বার্থ, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের কৌশল ও ঘোষণা। কিছু ‘অপ আইন’ সংশোধন আর পরিবহন সেক্টরের নৈরাজ্য বন্ধের পরিকল্পনাও থাকছে ইশতেহারে।

ফ্রন্ট নেতারা বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার হবে সাধারণ মানুষবান্ধব। বিগত সরকার ও অন্যান্য দলের ইশতেহারে অনেক জটিল ও অবাস্তব স্বপ্ন তুলে ধরলেও ঐক্যফ্রন্ট সেটা করছে না। ইশতেহারের প্রতিটি লাইন হবে সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত। তবে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ঘোষিত ‘ভিশন ২০৩০’র আলোকে ইশতেহার হচ্ছে কিনা বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়। তবে একাধিক নেতা জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার ঘোষিত ভিশনকে সামনে রেখে ইশতেহার চূড়ান্ত করা হবে। এছাড়া বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কিছু পরিকল্পনাও ইশতেহারে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে তারেকের পরিকল্পনা ইশতেহারে যুক্ত করা নিয়ে ইশতেহার কমিটির অনেকের দ্বিমত রয়েছে। তারা মনে করেন, তারেকের পরিকল্পনার অনেক কিছুই বাস্তবসম্মত নয়, যা শুধুমাত্র দলীয় এজেন্ডা।

ইশতেহার চূড়ান্তের বিষয়ে কমিটির সদস্য নাগরিক ঐক্যের নেতা ডাঃ জাহেদ উর রহমান বলেন, ইশতেহার সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকবে। গ্যাস ও বিদ্যুত বিল ইত্যাদি যা মানুষের নাগালের বাইরে যাচ্ছে তা কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অনেক কিছুই উঠে এসেছে, এখন সিদ্ধান্ত নেয়া হবে কোন্টা কীভাবে অগ্রাধিকার দেয়া হবে, কোন্টা আগে আসবে এবং কোন্টা পরে আসবে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সমস্যার সব সমাধান নিয়েই তৈরি হবে ইশতেহার, যোগ করেন তিনি।

ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে তরুণদের বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। জানা গেছে, তরুণদের একাংশের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ করার অঙ্গীকার করা হবে, অবসরের বয়স বাড়ানো হবে। শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী সংস্কার করা হবে চাকরিতে প্রবেশের কোটা, কমানো হবে ইন্টারনেটের দাম।

এছাড়া পরিবহন সেক্টরে দীর্ঘদিনের নৈরাজ্য বন্ধে থাকছে বিশেষ অঙ্গীকার। গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া কার্যকর করা, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর মতো পরিবহন খাতকে বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে। যেমন লাইসেন্স, ফিটনেস প্রতিটি জেলার অফিস থেকে দেয়া হবে। এগুলো প্রদানের ক্ষমতা থাকবে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের হাতে। তবে সরকার ‘বোর্ড সুপারভাইজার’ হিসেবে থাকবে।

কৃষকের লাভ বাড়াতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব থাকবে ইশতেহারে। একজন কৃষক যাতে তার পরিশ্রম অনুযায়ী ন্যায্যমূল্য পায়, একইভাবে শহরে যাতে ন্যায্যমূল্যে পণ্য পাওয়া যায় সে অঙ্গীকার করা হবে। সব কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য ভর্তুকি দেয়া হবে। কৃষিতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও কৃষিজাত পণ্যের আমদানি কমানোর অঙ্গীকার করা হবে।

ঐক্যফ্রন্ট সূত্র জানায়, জোটের ইশতেহারে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেশে ফেরত পাঠানোর অঙ্গীকার থাকবে। এছাড়া ক্ষমতায় যাওয়ার দুই বছরের মধ্যে প্রশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পাঠ্যপুস্তক প্রকাশনা, গণপরিবহন, নারী উন্নয়ন ও সমাজকল্যাণ ব্যবস্থাপনা, আটটি প্রদেশ বা ১৭টি অঞ্চলভিত্তিক বিকেন্দ্রীকরণ করার কথা উল্লেখ থাকতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে সুপ্রীমকোর্ট, সেনাবাহিনী, পররাষ্ট্র, বৈদেশিক বাণিজ্য, বিমান ও সমুদ্রবন্দর, আন্তঃজেলা মহাসড়ক এবং ইনকাম ট্যাক্স ও শুল্ক ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।

খুনের মামলা ছাড়া অন্য মামলায় আসামিদের হাইকোর্টে জামিন হলে সরকার সুপ্রীমকোর্টে আপীল করে অহেতুক সময় ও অর্থব্যয় না করাসহ অঞ্চলে আলাদা সাংবিধানিক কোর্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে ঐক্যফ্রন্টের।

ইশতেহার কমিটির অন্যতম সদস্য গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে বলেন, ইশতেহার জনবান্ধব হচ্ছে। প্রতিটি দলের ড্রাফট পেয়েছি। আমরা সম্মিলিতভাবে এবং চূড়ান্তভাবে জনবান্ধব একটি ইশতেহার দাঁড় করাতে পারব। ইশতেহারে প্রয়োজনীয় সময় অনুযায়ী প্রতিশ্রুতি দেয়া হবে। যেমন ক্ষমতায় যাওয়ার পর আমরা এক বছরের মধ্যে কী করব, দুই বছরের মধ্যে কি কি করব তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।

তিনি বলেন, আইনের নামে বাংলাদেশে যেসব ‘অপ আইন’ চলছে তা বন্ধের ঘোষণা থাকবে। এছাড়া আমাদের অন্যতম গুরুত্ব থাকবে কৃষক যাতে তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায়। ঢাকার মানুষও যেন ন্যায্যমূল্য পায়। সবদিকে সামঞ্জস্য রাখা হবে। আমরা এমন ইশতেহার দেব যাতে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তরা বেশি উপকৃত হয়।