২১ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ব্যতিক্রম পেশায় নারীদের সম্পৃক্তকরণে প্রশিক্ষণ

  • নাজনীন বেগম

উন্নয়নের ক্রমবর্ধমান অগ্রযাত্রায় নারীরা আজ জোরালোভাবে তাদের অংশীদারিত্ব প্রমাণ করছে। বিমান চালনা থেকে শুরু করে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে দায়িত্ব পালনই শুধু নয় সামরিক বাহিনীর মেজর জেনারেলের পদ অলঙ্কৃত করা নারীরা আজ সময়ের বলিষ্ঠ পথিক। প্রচলিত হরেক রকম কর্মক্ষেত্র শিক্ষকতা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সরকারী-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উর্ধতন কর্মকর্তা হিসেবে নারীরা যে মাত্রায় তাদের সম্পৃক্ততা প্রমাণ করছে সে সব যুগান্তকারী অবদান পুরো দেশের সমৃদ্ধির অন্যতম নিয়ামক। এ ছাড়া কৃষি, পোশাক শিল্প, নির্মাণ শ্রমিক, নগরে, বন্দরে, শহরে আবর্জনা পরিষ্কার করা নিম্নমানের পোশাকেও গ্রহণ করতে তারা মোটেও ভাবছে না। কিন্তু কিছু ব্যতিক্রমী পেশা আছে যেখানে নারীরা আজও সেভাবে অবারিত নয়। সমাজও অতখানি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে বেশ হিমশিম খাচ্ছে। সাধারণ প্রচলিত সংস্কারের আবর্তে পড়া অনেক পেশা মেয়েদের জন্য সহজলভ্য। কিন্তু তার বাইরে আসবাবপত্র, খাবারের রেস্টুরেন্টে যে কোন ধরনের কর্মযোগ কিংবা ফ্রিজ আর এসির মতো প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোতে শিক্ষানবিস হিসেবে নিজেদের নতুন মাত্রার এসব পেশায় সম্পৃক্ত করতে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করে যথার্থ জায়গায় নিয়ে আসা সেও এক সময়ের যৌক্তিক দাবি, নারীর ক্ষমতায়নে এসব পোশাকে যুক্ত করে দক্ষ আর পারদর্শী নাগরিকের ভূমিকায় নিয়ে আসতে এক অন্য মাত্রার প্রকল্প হাজির করা হয়। প্রকল্পটির তত্ত্বাবধানে ছিলেন বিশিষ্ট নারী ব্যক্তিত্ব নীলুফার করিম। তাঁর সঙ্গে সহযোগিতায় ছিল আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার উদ্যোগী সদস্যরা।

১০ ডিসেম্বর সোমবার প্রশিক্ষিত এসব নারীর ওপর তৈরি এক পর্যালোচনা জরিপ উপস্থাপন করেন মিসেস নীলুফার করিম। তিনি তার কয়েক সহযোগী নিয়ে এই মহৎ এবং অন্যমাত্রার প্রস্তাবনার লক্ষ্য, বিষয়বস্তু, পদ্ধতি, তথ্য সংগ্রহের কৌশল, প্রাপ্ত ফলাফল সেখান থেকে আগাম বার্তা তুলে আনা সেও এক বস্তুনিষ্ঠ আলোচনার প্রতিবেদন। প্রকল্পের আওতায় থাকে পুরো প্রস্তাবনার এক সুংসবদ্ধ দিকনির্দেশনা, শুধু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ কিংবা সরাসরি প্রশ্নমালা তৈরি করে মতামত যাচাইয়ে মাত্রায় শেষ অবধি একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে এর সীমানা নির্ধারিত হয়। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক, মিসেস নীলুফার তার জরিপে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংযোজন করলেন যে সব নারী দক্ষ শ্রমজীবী হিসেবে তৈরি হয়ে যদি বিশেষ কোন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশই করতে না পারেন তাহলে পুরো কর্মপ্রক্রিয়া বাস্তবোচিত হবে না। প্রশিক্ষিত নারীরা সুনির্দিষ্ট পেশায় অভিষিক্ত হওয়া সেও এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই গবেষকের জরিপে উঠে আসে আসবাবপত্র তৈরির মতো একটি শক্ত এবং অন্য রকম পেশায় আজ অবধি মেয়েদের অংশীদারিত্ব চোখে পড়ার মতো নয়। রেস্টুরেন্ট কিংবা যান্ত্রিক নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীতে যেমন, ফ্রিজ, এসিসহ পর্যটন শিল্পেও মেয়েদের কাজের ক্ষেত্র এখনও অবাধ কিংবা মুক্ত নয়। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনায় এনে মেয়েদের এসব পেশার ক্ষেত্রে অনীহার কারণগুলো বের করার চেষ্টা করেন। অর্থাৎ মেয়েরা কেন এসব পেশায় নিজেদের ভাবতে পারছে না। প্রথম বাধাটা একেবারে পরিবার থেকে। বিদ্রোহী কবি নজরুলের বিখ্যাত উক্তি এক্ষেত্রে স্মরণীয় নারী শিক্ষা কিংবা প্রগতির দ্বার বাইরে থেকেই শুধু নয় ভেতরে থেকেও বন্ধ। তাই পরিবারই নয় একটি মেয়ে নিজেই আগ্রহবোধ করে না অপ্রচলিত কোন পেশায় শামিল হতে। আর সামাজিক প্রতিবন্ধকতা তো পর্বত্র প্রমাণ। এই শক্ত প্রাচীর ভেঙ্গে কোন উৎসাহী আগ্রহী উদীয়মান তরুণী কিছু ভাবতেও শঙ্কিত হয়ে ওঠে। তার পরেও সময় বদলেছে, পরিবর্তিত যুগ নব নব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন প্রজন্মের কাছে তাদের দাবি হাজির করছে। ফলে অন্যরকম ভাবনা-চিন্তাও যুগের প্রয়োজন মেটাচ্ছে। নারীরা সেই আবেদনে সাড়াও দিচ্ছে। ফলে প্রচলিত ধারার বিপরীতে নতুন মাত্রার কর্মদ্যোতনা সব মানুষকেই নাড়া দিচ্ছে। নীলুফার করিমের প্রকল্প ও প্রশিক্ষকদের যথার্থ পর্যবেক্ষণে আসবাবপত্র শিল্পের মতো দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো অতি আবশ্যিক পণ্য সামগ্রীতেও নারীর পদচারণা শুরু হয়েছে বলাই যায়। যেমন একজন মেয়ে যদি কাঠমিস্ত্রির পর্যায় নিজেকে প্রশিক্ষিত করে তৈরি হয় সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মে তার অংশগ্রহণ যৌক্তিক। তার পরও সংখ্যায় এত কম হওয়াতে মেয়েটি নিজেই পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। বিপরীত দিক থেকে তার কাজের সাথি নিজেকে তারচেয়ে যোগ্য মনে করে, এসব অন্তর্নিহিত বিরোধীগুলো ছাড়াও পুরো প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধায় লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার হয়। শ্রম মজুরিতে নারী-পুরুষের পার্থক্য দৃষ্টিকটুভাবে দৃশ্যমান। আর রেস্টুরেন্টে নারীদের কর্মক্ষেত্র তৈরি করা সেখানেও আছে হরেক রকম বিপত্তি। সংখ্যা স্বল্পতাই সবক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের প্রধান অন্তরায়। একজন মেয়ে কোন হোটেলে কাজ করতে গেলে সে নিজেও অস্বস্তিতে ভোগে, জনসংখ্যার অর্ধাংশ নারী হলেও পেশাজীবী হিসেবে নারীরা এখনও সমতাভিত্তিক উন্নয়নে নিজেদের প্রমাণ করতে পারেনি। পরিবার, সমাজ, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে ব্যর্থ হলে নারীদের কর্মক্ষেত্র অবারিত হতে বিলম্ব হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। পর্যটন শিল্পে নারীরা একেবারে নির্লিপ্ত কিংবা আগ্রহী নয় এ কথা বলা ঠিক হবে না। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত দেশী এবং বিদেশী পর্যটকদের আনন্দযোগের অন্যতম মাধ্যম। প্রকৃতির সুরম্য লীলা নিকেতন সিলেটও নয়নাভিরাম বৈভবে সবাইকে মুগ্ধ আর বিমোহিত করে। সেভাবে বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান যেখানে পর্যটন খাতটি মোট জাতীয় আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত। সেখানে নারীদের অংশগ্রহণ খুব কম হলেও একেবারে শূন্য তা বলা যায় না। বিশেষ করে পর্যটন এলাকায় বিলাসবহুল হোটেলগুলোতে অভ্যর্থনাকারী হিসেবে নারীদের সক্রিয় ভূমিকা দৃশ্যমান। ফলে এই কৃতি গবেষকের আলোচনায় মূলত অদক্ষ পিছিয়ে পড়া এবং সুবিধাবঞ্চিত নারীদের ওপরই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থায় তাদের উল্লিখিত পেশায় প্রবেশ করানো যোগ্য করে তোলা হয়। যাদের বয়স ১৮ থেকে ২৫ পর্যন্ত। তবে এই ধরনের প্রকল্পের প্রাপ্ত তথ্যউপাত্তসহ প্রশিক্ষণকে শুধুমাত্র বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ রাখলে উদ্দেশ্য যথাস্থানে পৌঁছতে দেরি করবে। এটা হতে হবে পর্যায়ক্রমিক কর্মপ্রক্রিয়া। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা এবং বগুড়ার মতো আধুনিক শহরের ওপর এই ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা শুরু হলেও সামনে এর পরিধি আরও সম্প্রসারিত করা বাঞ্ছনীয়। যদিও এরই ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয় যা সামগ্রিক বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে না, তবে যেটুকু করা হয়েছে তার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন। বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা এমন ধরনের প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন করে থাকে। সুতরাং যা হয়েছে শুধু তার পরিধির ব্যাপ্তিই নয় আরও নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণও বাস্তবে রূপ দেয়া পিছিয়ে পড়া অর্ধাংশ এই গোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত জরুরী। বলিষ্ঠ নারী নেতৃত্ব বেগম রোকেয়াকে উদ্ধৃত করে তাকে স্মরণ করছি ‘সমাজের দুটো চাকা যদি সমানভাবে চলতে না পারে কোন কারণে একটি পেছনে পড়ে যায় তাহলে সমাজ পদে পদে হোঁচট খাবে।’