২৪ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দিনাজপুরের সংখ্যালঘুরা নির্বাচনে সময় আতংকে থাকেন

দিনাজপুরের সংখ্যালঘুরা নির্বাচনে সময় আতংকে থাকেন

স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুর ॥ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রায় ৫ বছর চলে গেলেও ভয় কাটেনি দিনাজপুরের কর্ণাইসহ ৮ গ্রামের সংখ্যালঘুদের মাঝে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনের সহিংসতার ঘটনা মনে পড়লে এখনও আঁতকে উঠেন ৮টি গ্রামের কয়েক হাজার সংখ্যালঘু ভোটার। নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় বেশ কয়েকটি হিন্দু পরিবার দেশ ছেড়ে চলেও গেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখেও ওই ৮টি গ্রামের সংখ্যালঘু ভোটারদের মনে ৫ জানুয়ারির আতঙ্ক এখনও বিরাজ করছে। সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনায় তিনটি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। আজ শুক্রবার উক্ত এলাকাল কয়েজন সংখ্যালঘুদের সঙ্গে কথা বলে তাদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী নির্বাচনের পর সারাদেশের মত দিনাজপুরেও নির্বাচনী সহিংসতার অজুহাতে জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাসবাদ এর মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্বের উপর একটি অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করা হয়। সন্ত্রাসবাদের মাধ্যমে বিএনপি-জামাত জোট দেশের নিরীহ জনগনের উপর নির্মম নির্যাতন চালায়। দশ মাইল ও দিনাজপুর শহরের মাঝামাঝি বাঁশেরহাট এলাকা। সেখান থেকে পশ্চিম দিকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে কর্নাই গ্রামের বাজার। বাজারে আছে শতাধিক দোকান। ১ নম্বর চেহেলগাজী ইউনিয়ন পরিষদে পড়েছে গ্রামটি। বাজার সংলগ্ন উত্তর দিকে কর্নাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টিতে ভোটকেন্দ্র করা হয়। স্থানীয়রা জানায়, নির্বাচনের দিন সকাল ১০টায় কর্নাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। বেলা বারোটা পর্যন্ত ভালোভাবেই চলছিল ভোট গ্রহণ।

সেদিন সকাল আটটার আগে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের লোকেরা কর্নাই বাজার থেকে এক কিলোমিটার উত্তরে প্রিতম পাড়ার সংখ্যালঘুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট দিতে নিষেধ করে। তারপরও ভোট দিতে গিয়ে ছিলো সংখ্যালঘু লোকজন। এই ক্ষোভে ভোট প্রতিরোধকারীরা সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা করে। ভোট দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা প্রিতমপাড়ার যুবক রাজগোপালের মাথা ফাটিয়ে দেয়। এ ঘটনার কয়েক মিনিটের মধ্যেই কাটাপাড়া, মহাদেবপুর, বকুরিপাড়া, ডুমুরতলী এবং পাশ্ববর্তী গোবিন্দপুর, কানাইগাতি ও বেগুনবাড়ি গ্রামের বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের কয়েক হাজার লোক একযোগে হামলা চালায় সংখ্যালঘুদের বাড়িতে। এরপর তারা হামলা চালায় ভোটকেন্দ্রে। সংখ্যালঘুরা প্রতিরোধ করলে কর্নাই বাজারের সংখ্যালঘুদের দোকানপাট ভেঙে গুড়িয়ে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা বেছে বেছে শুধু সংখ্যালঘুদের দোকানপাটই ভাঙচুর করেছে। তারপর দোকানের সব মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।

স্থানীয়রা জানান, এই এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করেন চেহেলগাজী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আনিসুর রহমান বাদশা, নাজির মেম্বার ও জামায়াত নেতা ডা. ইউনুস আলী। তাদের নির্দেশেই স্থানীয় সন্ত্রাসী জাফর, আকবর, কাফি, শাকিল, তৈমুর, বাবলা, একরামুল, নয়ন ও রফিকের নেতৃত্বে কয়েক হাজার লোক কর্নাই গ্রামের সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা চালায়। বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের কয়েক হাজার নেতাকর্মী কর্ণাইসহ ৮টি গ্রামের সংখ্যালঘুদের উপর অতর্কিত হামলা করে। তাদের একটিই অপরাধ- ‘কেন তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে গেল’? ভোট দেয়াকে কেন্দ্র করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী রাতে ওই ৮টি গ্রামের সংখ্যালঘুদের উপর চলে নির্মম নির্যাতন। বাড়িঘর, মন্দির ও পার্শ্ববর্তী বাজারে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায় হামলাকারীরা। আর সেই ঘটনার মনে পড়লে আঁতকে উঠেন ওই ঘটনার হামলার শিকার প্রত্যক্ষদর্শী অনেকে। তারা আর এধরনের নির্যাতনের শিকার হতে চান না।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও হামলার শিকার তেলিপাড়ার তিলক বালা (৬৫) নির্বাচন পরবর্তী ঘটনা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, নির্বাচন শেষে রাতে খাবার খেয়ে শোয়ার ঘরে ঘুমিয়ে পড়েন। হঠাৎ তার ঘরের চারপাশ থেকে অতর্কিত দা, কুড়াল, শাবলসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা করে ঘর ভেঙ্গে দেয়। এ সময় হামলাকারীরা বলে, ‘তোরা কেন ভোট দিতে গেছিস? তোদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল? কিন্তু তোরা গেছিস? এখন বুঝ। হামলাকারীরা রাজকুমার রায়, দীপক রায়, শিবু রায়, রতন রায়সহ বিভিন্ন বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, কয়েকটি বাড়ি ও মন্দিরে হামলা, লুটপাট এবং গ্রামের পাশ্ববর্তী কর্ণাই বাজারের দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে।

হামলাকারীদের আক্রমণে ৫০ জন আহত হয়। হামলার শিকার বৈদ্যনাথপুর গ্রামের জীবিত রায় (৩০) জানান, হামলায় তার শরীরে ক্ষতের চিহ্ন এখনও রয়ে গেছে। দা’র কোপে তার ডান হাতে ৯টি সেলাই পড়ে। ৫ বছর পরও ক্ষতের চিহ্ন রয়ে গেছে। হামলার সময় তার বাড়ীর স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ, মোবাইল, গরু-ছাগল ও আসবাবপত্রসহ অন্যান্য মালামাল লুঠ করে নিয়ে যায়। রাত ১১টায় শুরু হওয়া প্রায় ৪ ঘন্টাব্যাপী এই তান্ডবের খবর পুলিশ ও প্রশাসনকে জানিয়েও কোন সহযোগীতা পাননি তারা। পরদিন ভোরে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। পরবর্তীতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩ সদস্য বিশিষ্ট ১টি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেয়া হয়। কমিটিতে তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আবু রায়হান মিঞাকে প্রধান করে এবং তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সঞ্জয় সরকার ও তৎকালীন সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কন্দর্প নারায়ন রায়কে সদস্য করা হয়। এই ঘটনা নাড়িয়ে দেয় দেশ তথা বিশ্ব বিবেকের। ছুটে আসেন মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান, রুখে দাড়াও বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, আইন ও শালীশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক এড. সুলতানা কামাল, বিশিষ্ট সাংবাদিক আবেদ খান, স্থানীয় সংসদ সদস্য ইকবালুর রহিম সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা।

হামলার পর দিনাজপুর কোতয়ালী থানায় ক্ষতিগ্রস্ত মনোহর সরকার ও কার্তিক চন্দ্র রায় বাদী হয়ে ফৌজদারী ধারায় ২টি পৃথক মামলা দায়ের করেছেন। এছাড়াও এই ঘটনায় ওই গ্রামের নির্যাতিত গৃহবধূ পারুল বেগম বাদী হয়ে কোতয়ালী থানায় দ্রুত বিচার আইনের মামলা দায়ের করেন। উভয় মামলায় ৬০ জন আসামির নাম উলে¬খ রয়েছে। এছাড়াও অজ্ঞাতনামা ৫/৬শ জনকে আসামী হিসেবে দায়েরকৃত মামলার এজাহারে উলে¬খ করা হয়েছে। মামলাগুলি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

হামলা ও ক্ষতিগ্রস্তের শিকার প্রতিমা রায়, তিলক রায় ও গনেশচন্দ্র জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, আতঙ্ক ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে এখানকার মানুষের চোখেমুখে। চেহেলগাজী ইউনিয়ন পরিষদের ২নং ওয়ার্ড মেম্বার মোঃ নাজির হোসেন জানান, ওই ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার প্রফুল্ল রায়সহ হামলার শিকার ৮টি গ্রামের প্রবীণ ও নবীণ ব্যক্তিদের নিয়ে কয়েকদিনের মধ্যে একটি সমন্বয় কমিটি করে দেয়া হবে। কোন ব্যক্তি কোন উস্কানীমূলক বক্তব্য না দিতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখবে ওই সমন্বয় কমিটি। ৫ জানুয়ারীর মত আর কোন ধরনের হামলা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা হবে। কর্ণাই গ্রামসহ আশেপাশের সকল গ্রামের মানুষ এখন সজাগ দৃষ্টি রাখছে। নিজেদের মধ্যেই তারা গঠন করেছে গ্রাম তদারকি কমিটি। যাতে করে কোন দুস্কৃতিকারী অতীতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে না পারে।

দিনাজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ফিরুজুল ইসলাম জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। একাদশতম জাতীয় সংসদের নির্বাচনে কর্ণাইয়ের ঘটনা যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে ব্যাপারে প্রশাসনের সজাগ রয়েছে। কর্ণাইসহ ৮টি গ্রামের স্থানীয়দের নিয়ে মতবিনিময় করা হচ্ছে। কোন ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি যাতে না হয় সে ব্যাপারে খেয়াল রাখা হচ্ছে।