২২ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি’

  • রেজা সেলিম

সামনের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দেশের আপামর জনসাধারণ বিশেষত তরুণ সমাজের মধ্যে একটি ধোঁয়াশা তৈরি করে দেয়ার চেষ্টা চলছে। এটা করছে যারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ও বাংলাদেশের সকল গৌরবের প্রতি ঈর্ষান্বিত তারা। সম্প্রতি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের এক সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে দেখে যেমন দেশের মানুষও অবাক হয়েছে, এর প্রভাব তেমনই পড়েছে তরুণ সমাজের ওপরও। যারা নতুন ভোটার হয়েছে ও এবারের নির্বাচন যাদের কাছে গণজাগরণ মঞ্চের তৈরি করে দেয়া অবিনাশী স্বপ্নের মতো তারা কোনভাবেই কোন তর্ক-বিতর্ক আর নতুন করে শুনতে চায় না। কারণ, এই তরুণ সমাজ প্রত্যক্ষ করেছে যারা আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে বর্তমান সরকার তাদের বড় বড় নেতাদের ধরে এনে ’৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে বিচারের মুখোমুখি করেছে, অনেক ক্ষেত্রে সেই বিচারের রায় কার্যকরও হয়েছে এবং আরও বিচার চলমান আছে। এই তরুণ সমাজ জানে যাদের বিচার করা হয়েছে তাদের কেউ কেউ এখনও দেশের বাইরে পলাতক ও তারা নানারকম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। এখন সবাই অবাক হয়ে দেখছেন বাইরের ও ভেতরের নানা অপশক্তি একজোট হয়ে দেশে গত দশ বছরের সকল উদ্যোগ আর অর্জনকেই কি-না চ্যালেঞ্জ করে বসেছে। সবচেয়ে বড় কথা এই অপশক্তির মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশকে অসম্মান করা। কারণ ইতোমধ্যে তাদের জোটবদ্ধ হওয়ার প্রকৃত কারণ জানা গেছে, যা হলো কেমন করে ’৭১ সালে তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়া যায়, যার চেষ্টা তারা ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকেই করে এসেছে। তারা এখন বেছে নিয়েছে বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তাদের নেতা হিসেবে, যিনি ’৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন ও সমুদয় রাজনৈতিক জীবনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। আমার জানা মতে অনেক তরুণ এখন প্রশ্ন করছে এসব কেমন করে সম্ভব হচ্ছে? নামী-দামী মুক্তিযোদ্ধারাইবা কেন মূল শক্তির বিরুদ্ধে কাজ করছে? ফলে এবারের নির্বাচন তরুণদের কাছে আর একটি ধোঁয়াশা বিলোপের মুক্তিযুদ্ধ হয়ে দেখা দিয়েছে। আমাদের ধৈর্য ধরে তাদের সব কথা, প্রশ্ন শুনতে হবে ও উত্তর দিতে হবে।

ইংরেজীতে কহড়ষিবফমব ঝরহহবৎ বলে একটা কথা আছে, যাকে আমরা বাংলায় জ্ঞানপাপী বলে অর্থ করে থাকি। আজকের বাংলাদেশে এরকম জ্ঞানপাপী মানুষের সংখ্যা একেবারে কম নয়। সমাজ পরিচালনায় এরা ভাল মানুষ সেজে কুচক্রীর ভূমিকা নেয় আর আমাদের মতো দেশের সহজ-সরল মানুষকে ভুল বুঝিয়ে নানা কাজ আদায় করে নেয়। এদের কোন জাত-ধর্ম বলে কিছু নেই, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে এদের বসবাস। ফলে লেখাপড়া শিখেও এরা রাজনৈতিক সমাজের ওপর সিন্দবাদের দৈত্যের মতো বসে থাকে। আমরা তাদের ভার কষ্ট করে সহ্য করি আর মাশুল দেই। এরকম কিছু জ্ঞানপাপী ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন যখন দেশের বেশিরভাগ খেটে খাওয়া মানুষ বঙ্গবন্ধুর এক ডাকে আন্দোলিত হয়ে অস্ত্র হাতে জীবন বাজি রেখে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করছিল, তখন চীনপন্থী বিপ্লবী সেজে শ্রেণী সংগ্রামের ডাক দিয়ে ‘এক বুলেট দুই শত্রু’ নামক এক অভিনব পাল্টা যুদ্ধের তত্ত্ব হাজির করেছিল। আমাদের তখনকার প্রবাসী সরকার ও মুক্তিযোদ্ধারা সম্মিলিত কৌশলে এদের সরিয়ে রাখতে সক্ষম হন। স্বাধীনতার পর এসব কথিত বিপ্লবী গ্রামে-গঞ্জে কমিউনিস্ট আন্দোলনের নামে নির্বিচার লুণ্ঠন ও হত্যা সংঘটন করে। অথচ মূলধারার কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতা ও কর্মীরা সকলেই মুজিবনগর সরকারের আনুগত্য মেনে নিয়ে যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে এবং বিজয়ের পর তাদের রাজনৈতিক কর্মকা- প্রকাশ্যেই অব্যাহত রাখে। বঙ্গবন্ধু সরকারের সঙ্গে সহযোগিতাও করে। এমনকি বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকা-ের পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা সমবেত প্রতিবাদে অংশ নেয় ও হতবিহ্বল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ায়।

কিন্তু ওইসব বিপ্লবী বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তাদের আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি ছেড়ে প্রকাশ্য হয় ও দলে দলে বিএনপিতে যোগ দেয়। জিয়া সাহেবের সরকার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীশক্তি জামায়াত ও মুসলিম লীগের পুনর্বাসনের পাশাপাশি এসব চীনপন্থী দুর্বল এবং হিংস্র রাজনৈতিক শক্তিকে তার দলে সম্পৃক্ত করেন। এ রকম এক ‘মিথ’ তৈরি করে জিয়া সাহেব যে অপরাজনীতির সূচনা বাংলাদেশে চালু করেন তার লিগেসি এখনও এই জাতিকে বহন করতে হচ্ছে। ’৭১ সালের এসব ঘাতক, ধর্মীয় গোষ্ঠী ও অতি উৎসাহী বিপ্লবীরা দেশের রাজনীতিতে, ব্যবসায়, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেয়ে ধাপে ধাপে সংবিধানের মূলধারাগুলোকে বিতর্কিত করে বাংলাদেশের ইতিহাসকে অন্য পথে ঘুরিয়ে দেয়ার নানারকম উদ্যোগ ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এরশাদ সাহেব আরও এক ধাপ এগিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের ‘ফ্রিডম পার্টি’ গঠন করে দেশে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। ফলে এই যে নানারকম রসায়ন এসে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঢুকেছে যাদের কোনই আত্মপরিচয়ের গৌরব নেই, মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যের সামান্য অংশীদারিত্ব নেই, আজ এরাই নানা কৌশলে দেশটাকে খামচে ধরেছে। বয়সের ভারে এদের কেউ কেউ আবার এখন সুশীল নামের বুদ্ধিজীবীও হয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে এরাই জ্ঞানপাপী, যারা দেশের অমঙ্গলের সকল সূত্র নিয়ে খেলছেন।

বাংলাদেশের যে মূলধারার গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা তা অবশ্যই হতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অংশীদারিত্বের রাজনীতি। কিন্তু যাদের কথা এই সংক্ষেপ রচনায় উল্লেখ করা হলো তাদের সে অধিকার নেই বা হারিয়েছে বলে এরা সব সময়ই ষড়যন্ত্রের ও কূটকৌশলের রাজনীতি করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। পৃথিবীর কোন দেশে, যেসব দেশ মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে এমন উদাহরণ দেখা যায় না যে, সেসব দেশের রাজনীতির দ মু- কর্তারা দেশের জন্মের আন্দোলনের ত্যাগ ও সংগ্রামকে অস্বীকার করে উল্টোধারার রাজনীতি করেন। এটা বাংলাদেশের প্রথম দুর্ভাগ্য।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় দুর্ভাগ্য এনেছে একশ্রেণীর সঙ্কীর্ণ ও নিম্নমানের চিন্তা-চেতনার অধিকারী মানুষ, যাদের দুনিয়ার কোন মানবিকতা স্পর্শ করে না। তা না হলে যারা লেখাপড়া করা তারা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস বিকৃত করে মিথ্যাচার করে, স্বাধীন দেশের জাতির পিতাকে হত্যা করে, তাঁর হত্যাকারীদের বিচার হবে না বলে আইন পাস করে, হত্যাকারীদের কুড়াল হাতে নিয়ে রাজনীতি করতে দেয়, প্রকাশ্যে গ্রেনেড মেরে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে মেরে ফেলতে চায়, আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারে। সেসব অপরাধীর পক্ষে ওইসব বিবেকবর্জিত মানুষ কেমন করে কথা বলে? এটা কি কোন সভ্য সমাজে সম্ভব? বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য হলো, জন্মের পর থেকেই তাকে এসব অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে। আর এসবই সম্ভব হয়েছে এই দেশের মানুষ নিতান্তই সহজ-সরল ও মানবিক বলে। না হলে কবেই এই পরগাছা তৃণদের নিজের হাতে আইন তুলে নিশ্চিহ্ন করে দিত।

তাই আমার বিশ্বাস ডিজিটাল বাংলাদেশের তরুণ সমাজ সত্য অনুসন্ধানে এখন ব্যস্ত হবে। সব তথ্য ইন্টারনেট দুনিয়ার কাছে এখন প্রকাশ্য। মিথ্যাচারের তৃতীয় দুর্ভাগ্য যেন আমাদের এই কাজে শেষ হয় যে, আমরা সত্যটা জেনে নিতে পারছি ও সেইভাবে দেশটা চালাতে শিখে নিতে পারছি। পৃথিবীর নানা দেশের আর্কাইভে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। ষাটের দশকের সব আন্দোলনের খবর আমাদের গোয়েন্দা বিভাগের রেফারেন্সে সম্প্রতি প্রকাশিত বইতেই আছে। এর সঙ্গে যদি আমরা মিলিয়ে দেখি অন্য দেশের পত্র-পত্রিকায় কি কি লেখা হয়েছিল, কে কখন কোন্ তথ্য কোথায় সংরক্ষণ করেছে সেসব খুঁজে বের করার কাজটা যদি করে নেই তাহলে অন্তত আমাদের সম্মান ধরে রাখতে পারব। আমাদের মনে রাখতে হবে ’৭১ সালে আমাদের মায়েদের, বোনদের সম্মান নষ্ট করেছে ওরা, আমাদের বাবা-ভাই-বোন-আত্মীয়-স্বজন, দেশের মুক্তিকামী মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করেছে ওরা। যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে যখন বুঝতে পারল আর রক্ষা নেই তখন দেশের নামী-দামী বুদ্ধিজীবীদের খুঁজে খুঁজে এরা নির্মমভাবে হত্যা করেছে, যেন আমরা স্বাধীন হলেও দেশটা চালাতে না পারি। কত ভয়াবহ খারাপ চিন্তার অধিকারী হলে এমন পরিকল্পনা মানুষ করতে পারে? আর এসবেরই বিনিময়ে আমরা যে স্বাধীন দেশটা পেলাম তা পরিচালনার দায়িত্ব কার? একমাত্র তাদেরই যারা সত্যটা জানে।

এবারের ভোটে তাই নিঃসংশয়ে আমাদের অংশ নিতে হবে। ওইসব জ্ঞানপাপীর ভোটের রাজনীতি দেখে আমাদের চিন্তার কিছু নেই। কারণ ওদের বিবেক সুসংহত নয়, ওদের উদ্দেশ্য মোটেই মহৎ নয়। এদের মধ্যে অনেক বড় মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের লোক আছেন, যিনি ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ফেরত দেন না বলে ঋণখেলাপী হয়েছেন। এদের মধ্যে আছেন পেশাজীবী, যিনি আজীবন মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা বিক্রি করে সমাজসেবক হতে চেয়েছেন। আছেন নানা মত-পথের লোক, যারা রাজনীতি চর্চা করেছেন; কিন্তু একটু সম্মান সারা জীবনেও অর্জন করে নিতে পারেননি। এসব উচ্ছিষ্ট নেতাকে ভোটের মাঠে দেখে আমাদের ভাবনার কিছু নেই। এরা মৌসুম ফুরিয়ে গেলে আস্তাবলে ফিরে যাবে।

আমরা সামনে যে জ্ঞান সমাজে প্রবেশ করতে যাচ্ছি সেখানে বাংলাদেশের তরুণদের অগ্রগামী ভূমিকা থাকবে। দায়িত্ব এখন আমাদের, ওদের নয়। কোন ধোঁয়াশা নয়। বাংলাদেশ তো আমাদের মা। মায়ের দায়িত্ব তো সন্তানদেরই নিতে হবে। কারণ তাদের পিতাকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের ঘরবাড়ির ইতিহাস পুড়িয়ে দেয়ার বৃথা চেষ্টা করেও কোন লাভ হয়নি। কবি দাউদ হায়দারের ভাষায়- ‘আমি আপনি আজ কেন বাংলাদেশের, কেন বাংলাদেশী, গর্বিত’- এটা আমাদের ভাবতে হবে এবং সব সময় মনে রাখতে হবে।

ভয়ের কিছু নেই। আমাদের পতাকা আমাদের হাতেই থাকবে।

লেখক : পরিচালক, আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প

rezasalimag@gmail.com