১৬ ডিসেম্বর ২০১৮

বিজয় ভাবনা

বিজয়ের আনন্দ তখনই সার্বজনীন হয় যখন ধনী নির্ধন নির্বিশেষে সর্বশ্রেণীর মানুষ এর মাহাত্ম্য অনুধাবনে প্রণোদিত হয়। বিজয়ের ভেতর দিয়ে আমরা যে উচ্চাশা এবং উচ্ছ্বাস ব্যক্ত করি, তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার মুখচ্ছবি। প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখে আমরা যে বিজয়ের আনন্দে মেতে উঠি, তার পশ্চাতে রয়েছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ইতিহাস। আমরা সেই বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেয়েছি বলেই বিজয় দিবসে আমাদের অবারিত অপার আনন্দ। এই আনন্দ সামষ্টিক। একটি স্বাধীন দেশের দেশপ্রেমিক নাগরিক মাত্রই এই বিজয় আনন্দের ভাগিদার। বাংলাদেশের নাগরিকদের সামষ্টিক অনুভব এবং পরাধীনতা থেকে মুক্তির এই বিশেষ দিনে এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, এই বিজয় অর্জনের পশ্চাতে রয়েছে পূর্বপুরুষের রক্তের ঋণ।

আমাদের বিজয়, আমাদের স্বাধীনতা তখনই পরিপূর্ণতা পাবে যখন রক্তক্ষয়ী আন্দোলন সংগ্রামের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে আমরা যেতে পারব। ক্ষুধা আর দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পাশাপাশি বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত থেকে আমরা সরে আসব। দেশের স্বার্থকে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিব। রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীনতাকে আমরা সমুন্নত রাখব। এক্ষেত্রে কেবল প্রধানমন্ত্রী কিংবা দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ওপর দোষ না চাপিয়ে আমরা প্রত্যেকেই যদি যার যার অবস্থানে দায়িত্বশীল হয়ে উঠি। তবেই সর্বত্র শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িক একটি সমাজকাঠামো নির্মাণ করা জরুরী। সাম্প্রদায়িক সস্প্রীতির দেশ বাংলাদেশ। এই ঐতিহ্যকে অটুট রাখতে হবে। কারণ এগুলো আমাদের স্বাধীনতার অঙ্গীকার।

একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের ভাষা, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্যের প্রতি অনুগত থাকা জরুরী। আমরা যদি এগুলোকে অবহেলা কিংবা অস্বীকার করি তবে আমাদের বিজয় দিবস উদযাপন শ্রেফ কৃত্রিম আয়োজনে পর্যবসিত হবে। আমাদের পূর্বপুরুষ, যারা দেশের তরে জীবন দিয়েছেন তাদের আত্মা কষ্ট পাবে।

আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। যারা কেবল বই পড়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত জেনেছি। তাদের অনুভব ও অনুরাগের মাত্রায় খামতি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে আমাদের অগ্রজ যারা আছেন তাদের উচিত উত্তরপ্রজন্মকে সঠিক পথের নির্দেশনা দেয়া। পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব প্রদর্শন না করে সৌহার্দ্যপূর্ণ এবং পরমতসহিষ্ণু হওয়া। এরকম হলে পরে দেশ ও জাতির প্রশ্নে নিশ্চয়ই দীর্ঘস্থায়ী মঙ্গলপথে আমরা এগিয়ে যেতে পারব।

তবে হ্যাঁ, আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। অবকাঠামোগত দিক দিয়ে আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন কলকারখানা হচ্ছে। এতে করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে। সে জন্য আমাদের দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। মূলত বিজয়ের অন্তর্নিহিত শক্তি এখানেই রোপিত আছে। আমরা মুখে মুখে যতই স্বদেশ চেতনার কথা বলি না কেন, আসলে কাজের ভেতর দিয়ে সেই চেতনার বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। জীবনের প্রয়োজনে পৃথিবীর যে প্রান্তেই আমি যাই না কেন আমার পরিচয় আমি বাঙালী। মনেপ্রাণে আমি একজন বাঙালী।

বিজয় মানেই আনন্দ। সেই বিজয় যদি হয় পরাধীনতার শেকল ছিঁড়ে মুক্তির পথে ধাবিত হবার। তবে তার প্রকাশ নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম এবং অসাধারণ কিছু। বিজয় দিবসে আমাদের বীর শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হবে। দেশের তরে তাদের যে ত্যাগ ও উৎসর্গিত দৃষ্টান্ত তা আমাদের রক্ষা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি এখনও সক্রিয়। দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে তারা এখনও লিপ্ত। তারা এখনও পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্ন দেখে। স্বাধীনতাবিরোধীদের কিছুতেই সুযোগ দেয়া যাবে না।

দেশ আমার, দেশের কল্যাণে আমরা প্রত্যেকেই দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করব। বিজয় দিবসে সবার মনে এই প্রত্যয় অনুরণিত হোক।