২১ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অধিনায়ক

  • মাসুদ আহমেদ

৫ আগস্ট, ১৯৭১। ২০ আষাঢ়। বাংলা মুল্লুকের এই মাসটার নাম ওদের জানা নেই। কিন্তু নাম যাই হোক কামে ওদের বড়ই লাচার লাগছে। অবশ্য জুন মাস থেকেই এই অবস্থা। গরম, ঘাম, বৃষ্টি, মশার কামড় আর স্যাঁতসেঁতে ভ্যাপসা। সারাদিন খাকি ইউনিফরম ভিজেই থাকে। ওটা না পরেও উপায় নেই। দেশের অখ-তা রক্ষা নিয়ে যুদ্ধ চলছে। ডিসিপ্লিনে কোন ফাঁকির উপায় নেই। ফ্যানে এই গরম যাবার নয়। এখন সকাল ন’টা। লম্বা দিনের মাত্র শুরু। ১৪ পাঞ্জাবের কমান্ডিং অফিসার অফিসে বসে এসব এবং গত চার মাসের এখানকার নানা অভিজ্ঞতার কথা ভাবছিল। রুপার খান ভাটিয়ার বাড়ি চাকলালার পাশে রতন লাল তহসিলে। জাতভিমান এবং বাঙালী বিদ্বেষ ওর প্রচ-। গত ফেব্রুয়ারি মাসে লে. কনেল পদে প্রমোশনে আনন্দিত হলেও তার পরই পূর্ব-পাকিস্তানে এই বদলিতে মনটা একেবারে জলো হয়ে গিয়েছিল। ইস্ কি আছে এখানে? মৌজ বা ফুর্তি করার কিছুই নেই।

আর বোতল যোগাড় করাও নাকি কঠিন ওর পর্যায়ের অফিসারের জন্য। অথচ নামাজ না পড়লেও ওটা ছাড়া চলে না। রাওয়ালপিন্ডি আর ইসলামাবাদের নাইট ক্লাবগুলোর কথা ভেবে ভেবে ওর মন আরও বিরস হয়ে ওঠে। শুধু রাও ফরমান আলীই ভরসা। করাচী থাকতেই ওর সঙ্গে পরিচয় ছিল। কিন্তু তখন ছিল বসের সম্পর্ক। ২৬ মার্চের পর সম্পর্কটা হয়ে গেছে বন্ধুর মতো। ফরমান ওর মনোকষ্টের কথা জেনে বলেছিল ঠিক আছে পানি খাবার পথ আমি বাতলে দেব। যুদ্ধরত জাতির মেজর জেনারেলের হুকুম। পানি আসতে থাকল কোথা থেকে যেন।

কিন্তু আর এক অভাব যে রযে গেল। এটা তো আর তাকে বলা যায় না। এমন ফকিরা দশা এখানকার যে কোনো নাইট ক্লাব পর্যন্ত নেই। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ওই জিনিসটা ছিল। কিন্তু তা ব্যয়বহুল। তারপর আবার ২৬ মার্চের পর থেকে ওখানে কসবীরা আর আসছে না কিসের ভয়ে যেন। কিন্তু ভাগ্য বলে একটা কথা আছে। তাই এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ হতে হতেই ভাটিয়া বুঝতে পারল যে নাইট ক্লাব আর খুঁজতে হবে না। সারা পূর্ব পাকিস্তানই এখন একটা নাইট ক্লাবে পরিণত হয়েছে। পাক সৈন্যরা এই ক্লাবের যে কোন রুমে বিনাবাধায় এবং বিনামূল্যে আসা যাওয়া করতে পারে। আজ গুলশান, কাল বনানী আর একদিন ইস্কাটন কিংবা ধানম-ি। ভালই সময় কাটতে লাগল। এত নারী। পালাবে কোথায়? সেই থেকে লে. কর্নেল ভাটিয়া ভালই আছে। তবে ওর একটা দাফতরিক সঙ্কট চলছে মার্চের শেষ সপ্তাহ আর এপ্রিল মে মাসের কয়েকটা অপারেশন শেষ হওয়ার পর থেকে।

ওর ব্যাটালিয়ন কোম্পানির সংখ্যা তিনটা। এর মধ্যে প্রায় এক কোম্পানি ‘মুক্তি’দের হাতে নিশ্চিহ্ন হয়েছে। আর এক কোম্পানিকে কাছেই সাভারে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সেই থেকে রাওয়ালপিন্ডিতে ও সৈন্যর জন্য সিগনাল মেসেজ আর চিঠি দিয়ে রেখেছে। একটা মিক্সড কোম্পানি গতকাল সকালে কুর্মিটোলা পৌঁছে গিয়েছে। ‘মিক্সিড’-এর কোন ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। একজন স্টাফ কর্র্নেল ওকে একটা দুই লাইনের মেসেজে বলেছে,

‘দেশের এই জরুরী অবস্থায় এর চেয়ে বেশি কিছু করা গেল না। তোমার লোকজন তুমি বুঝে নাও। বোঝ তো। চারদিকেই এখন সৈন্যর চাহিদা রয়েছে।’

এমকি মেসেজে সৈন্য সংখ্যাও বলা হয়নি। ব্যাটালিয়ন বা কোম্পানির সংজ্ঞা এখন মিলিটারি ম্যানুয়ালেই আছে। নানা জায়গায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে ভাটিয়া একই রকম খবর পেয়েছে। এখন এক হাজার মাইল দূরে এ নিয়ে কার সঙ্গে তর্ক করবে? এসব চিন্তা করতে করতে বেল টিপল ভাটিয়া। মুহূর্তে সুবেদার সফদর জিলানী রুমে প্রবেশ করে স্যালুট করল।

- মেজর সাব্ কো বোলাও।

- জি সাব।

মেজরকে ইন্টারকমে ডাকা যায়। কিন্তু সেন্ট্রি দিয়ে ডাকলে তাতে ভার বেশি হয়। মেজর পাশা রুমে ঢুকে কাঁধ টানটান করে দাঁড়ালো।

- স্যার।

- কিদারা পার বাঠ যাও।

- পাশা বসল।

- আচ্ছা ফোর্স কি রেডি?

- জি স্যার।

- কত জন এসেছে?

- স্যার একশ নব্বই জন।

- হুঁ। আর কেউ বাকি আছে?

- না স্যার।

- ডাক ওদেরকে।

- স্যার, মানে, একে একে?

- নো, শুধু কমান্ডারদের । কতজন হবে ওদের সংখ্যা?

- স্যার নয় জন।

- বেশ, তোমার রুমে যাও এবং ওখান থেকে হয়ে একজন একজন করে এখানে পাঠাও।

- একি মাথায় লাল বেরেট আর সবুজ ঝুটি, এরা কারা?

প্রথমে যে ঢুকল তার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল রুপার। লোকটা স্যালুট করে দাঁড়াতেই প্রশ্ন করল-

- নাম কি তোমার?

- ফাইয়াজ গুল।

- পাঞ্জাব কত নম্বর? ইউনিফরম আর টুপি এ রকম কেন?

- স্যার পাঞ্জাব নয়। আমি গিলগিট স্কাউট ব্যাটালিয়ন...

- ও, আচ্ছা। বাড়ি কোথায়?

- খাইবার, স্যার।

- তোমার র‌্যাংক বোঝাও তো মুশকিল।

- ভাটিয়ার জেরাতে ২৩ বছর বয়সী এই পাঠানের মধ্যেই ঘাবড়ে গেছে। সেটা গোপন করে বলল,

- স্যার, গ্রুপ কমান্ডার। সেকেন্ড লেফটেনেন্টের ইকুইভ্যালেন্ট।

- ঠিক হায় ফাইয়াজ। তোম যা সেকতা।

আগের চেয়েও আনাড়িভাবে স্যালুট দিয়ে বের হয়ে গেল লোকটা। সঙ্গে সঙ্গে ঢুকল দ্বিতীয় জন। ফর্সা, লম্বা, স্বাস্থ্যবান এই লোকটার চেহারা অনেকটা অভিনেতা কাদের খানের মতো। মুখে বসন্তের দাগ। দেখলেই বোঝা যায় নির্বিকার নিষ্ঠুর। ইউনিফরম খাকি। এর কাঁধের চিহ্নগুলোও ভাটিয়ার কাছে অপরিচিত মনে হলো।

- নাম কি?

- মোহাম্মদ ফায়েক আলী।

- মোকাম

- নাথিয়া গলি, স্যার।

- ফোর্স?

- লাহোর রেনজারস।

- তুমি কি ক্যাপ্টেন?

- জি স্যার।

- বয়স কত?

- ছাব্বিশ বছর স্যার।

- ময়দানের কোন অভিজ্ঞতা...?

- ৬৫তে হোসাইনীওয়ালাতে রেকি করেছি স্যার।

- ঠিক আছে যাও।

এবার যে লোকটা ঢুকল তার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে লে. কর্নেল ভাটিয়ার মনে হলো এ একজন নিরেট ভদ্রলোক। সিনেমার নায়কের মতো চেহারা। খাকি ইউনিফরম চমৎকারভাবে ইস্ত্রি করা। বেরেট খাকি। কালো বুট ঝক্ ঝক করছে। মুখে-চোখে পরম নিশ্চিন্ত ভাব। মাত্র গতকালেই যে সে এক হাজার মাইল দূর থেকে এখানে এসছে মুখ চোখ দেখে তা বোঝার উপায় নেই।লোকটা স্যালুটও দিল নরমভাবে।

- নাম কি?

- নওয়াজিশ লোদি।

একটু ভেবে ভাটিয়া বলল, তুমি কি...? প্রশ্নটা অনেকক্ষণ শেষ করল না।

- স্যার আমি পাঞ্জাব পুলিশের এএসপি...।

রাগে মাথা গরম হয়ে গেছে ভাটিয়ার। তা দমন করে বলল,

- মোকাম?

- শুককুরের গুড্ডু ব্যারেজের কাছে তারা সিং তহসিলে।

- তুমি চাকরিতে ঢুকেছ কবে, কোন ব্যাচ্?

- স্যার আমি পাকিস্তান পুলিশ সার্ভিস এর ৬৯ এর ব্যাচ।

- ইউ ক্যান গো নাউ।

লোদী বের হওয়া মাত্র ভাটিয়া ইন্টারকম তুলে মেজর পাশাকে ডাকল।

- স্যার?

ভাটিয়া প্রচ- রাগের সঙ্গে টেবিলে মুষ্ঠঘাত করে চেঁচিয়ে বলল, এসব ফাজলামির মানে কি?

এইগুলো কারা করছে?

পাশা বিষয়টা আগেই জানে। ও গত রাতেই এসব নবাগতদের সবার সঙ্গে কথা বলেছে। ও চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

- আচ্ছা বল কেউ স্কাউট, কেউরেনজার, কেউ বা পুলিশের সেপাই। কারো বাড়ি ফ্রনটিয়ার, কারও সিন্ধু। এদের কি সৈন্য বলা যায়? এখন কানা, খোঁড়া, ফকির, টাঙ্গাওয়ালা আর আনারকলির মোড়ে সন্ধ্যাবেলায় যারা দালালি করে তাদের পাঠানোটা বাকি আছে দেখছি। আচ্ছা তুমিই বল এদের দিয়ে কি যুদ্ধ করব?

- স্যার, আমি আর কি বলব?

- এই যে পিএসপি একটা এসেছে। একে তো দেখে মনে হচ্ছে যেন এখানে শ্বশুরবাড়ি। বেড়াতে এসেছে। যা হোক বাকিদের অবস্থা কি বল দেখি। প্রকৃত ফৌজ কয়জন আছে?

- স্যার ফৌজ বলতে আছে একজন হাবিলদার আর একজন ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেন তাজ খান আবার অনারারি। গত ১৪ আগস্ট ও ওই টাইটেল পেয়েছে।

- আর বাকিরা?

- স্যার রাগ করবেন না তো আমার ওপর?

- তোমার দোষটা কোথায়? বল।

- স্যার বাকি চার জনের একজন সিভিল ডিফেন্সের, দু’জন ফায়ার ব্রিগেডের আর একজন শিয়ালকোট আনসার।

- আর সিপাইরা।

- স্যার অধিকাংশই রিজাভিস্ট।

- এ অসহ্য। ওদের বাড়িঘর কোথায়?

- স্যার গত রাতে আমি সবার রেকর্ড দেখেছি। নব্বইভাগই প্রাক্তন ইউপি বিহার। পাঁচ ভাগ সিন্ধু, বেলুচিস্তান আর ধরুন দুই ভাগ পাঞ্জাবি। বাকিরা পাঠান।

- আচ্ছা এদের দিয়ে যুদ্ধ হবে? হতে পারে? একে, এগুলো তো সৈন্যই নয়, দুই পাঞ্জাবিও নয়। এরা বাঙালীদের কি চোখে দেখে রাওয়ালপিন্ডির কর্তারা কি তা জানে না? এই আমার রিপ্লেসমেন্ট! কি হচ্ছে এসব?

ইঙ্গিতটা পরিষ্কার। অপাঞ্জাবিরা বাঙালীর প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন। যেমন পাকিস্তানের সব হিন্দুদেরও ভাবা হয় তারা পাকিস্তানকে মনে মনে পছন্দ করে না।

মেজর পাশা আবার বলে, স্যার এখানকার অনেক ইউনিটেরই ওই একই দশা শুনতে পাচ্ছি। আমার ব্যাচ্মেট মেজর রাওয়াত চিটাগং পোর্ট এ নতুন সৈন্যর চালান রিসিভ করে। ও বলছে, জাহাজ থেকে এমন সব মানুষ নামছে যাদের সৈন্য ভাবাই যায় না। অদ্ভুত সব ইউনিফরম। কারও টুপ ফাটা, কারও পায়ে বুটের বদলে কাপড়ের জুতা। কারও বেল্টটা পর্যন্ত ব্যক্তিগত এবং তা বাঁধা হয়নি ঠিকমতো। এরা কি ডিউটি করবে স্যার?

এদের তো আমার ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সেসের লোকদের থেকেও অধম মনে হলো। এরপর হয়ত বাবুর্চি আর ব্যান্ডবাদকেরও পাঠাবে যুদ্ধ করার জন্য।

ভাটিয়া আবার বলে, দেখ এসব বাড়তি লোকদের থাকার ব্যারাক, ছাউনি তো নেই-ই এমন কি যথেষ্টসংখ্যক তাঁবু পর্যন্ত নেই। ডেপুটি কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল ব্রিগেডিয়ার রিয়াজ সরফরাজকে কথাটা জানালামও। ঢাকায় তিন দিন তিনি ঘুরেফিরে গেলেন। কই কোন খবর নেই। অথচ আমার সৈন্যরা অনেকেই বারান্দায় আর মাঠের মধ্যে রাত গুজরান করছে। তাতে সাপের কামড়ে মারাও পড়েছে ক’জন।

পাশা ও পাঞ্জাবি। তার মনেও এক গোপন ইচ্ছা কাজ করছে। তার সিওর মতোই তার মনেও অপাঞ্জাবিদের সম্পর্কে অনাস্থা। ও বলে,

- স্যার মুক্তিরা বেশ গ-গোল করছে কয়েক জায়গায়। এই নতুন লোকদের ব্যবহার করার কথা ভাবছেন কিছু?

- হ্যাঁ, প্ল্যান তো আছেই। এ বিষয়ে তোমার সঙ্গে আলাপ করব। এই যে দেখ আমরা কি করতে যাচ্ছি।

- স্যার, একটা কথা।

- বল?

- এদের কমান্ডার পর্যায়ের আরও ক’জনকে আসতে বলেছিলেন। ওরা বাইরে অপেক্ষা করছে...।

- না, এসব বেকুবদের দেখার আমার আর কোন ইচ্ছা নেই। তুমিই ওদের ব্রিফ করবে। নাউ ডিসমিস্ দেম অল।

আরও দুই মাস পার হয়েছে। সিও হিসেবে একজন অফিসার এর নিজের সৈন্যদের ভালভাবে চেনার কথা, বোঝার কথা। ভাটিয়া বুঝতে পারল তার বোঝার ভুল আছে। ওর বাহিনী এর মধ্যে বেশ কয়েকটা অপারেশন এ অংশ নিয়েছে। ইউনিট ইন্টেলিজেন্স অফিসাররা জানাল বাঙালীদের হত্যার ব্যাপারে ওই স্কাউট, রেঞ্জার ও রিজাভিস্টরাÑ যারা কিনা অধিকাংশই অপাঞ্জাবিÑ যথেষ্ট আন্তরিকতা এবং দক্ষতা দেখিয়েছে এবং টাকা-পয়সা, সোনা-দানা লুট আর বাঙালী জেনানাদের নির্যাতনেও এসব তরুণ এবং প্রৌঢ় একটুও পিছিয়ে থাকে না। এসব করতে গিয়ে এদের অনেকে মারা পড়েছে। এদের মধ্যে আহত অনেকে বাঁচতে পারত কিন্তু...

ভাটিয়া জানতে চেয়েছিল কিন্ত কি?

লে. কর্নেল রোপার ভাটিয়ার বাহিনী এখন আরও ছোট হয়ে এসেছে। এখন ওদের সংখ্যা নেমে এসেছে দু’শ’ সত্তর জনে। নবেম্বরের প্রথম দিকে ওর ভাল একটা ইউনিটকে বগুড়া ব্রিগেডের সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে। সীমান্তে খারাপ অবস্থা। এ অবস্থায় ঢাকায় এত সৈন্যদের কি দরকার’

এখন দিনেও নিরাপত্তা নেই। রাতে সৈন্যরা ভয়ে বের হতে চায় না। মেজর পাশা মারা যাবার পর ওর টু-আইসি ক্যাপ্টেন হামদাম। রাতের ঢাকার কয়েকটা জায়গায় টহল দেয়া এই ইউনিটের সৈন্য আর অফিসারদের ডিউটি। আজ নবেম্বরের ১৮ তারিখ। গত রাতেও একজন ক্যাপ্টেন মারা গেছে। সঙ্গে পুলিশের তিনজন সেপাই। সকালে হামদাম ভাটিয়াকে বলল,

‘স্যার একটা কথা ভাবছিলাম।’

এখন পূর্ব পাকিস্তানে অফিসার আর সৈন্যর মধ্যে ব্যবধান প্রায় নেই। কারণ নিরাপত্তাবোধ এবং সবার একসঙ্গে লুটপাট, হত্যা আর নারী লুণ্ঠনে অংশগ্রহণ। তাই এ রকম আলাপ অনেক ইউনিটেই হচ্ছে।

ভাটিয়া বলল, বল কি কথা?

- স্যার, গুলি করবেন না তো?

- শত্রুর বিরুদ্ধে গুলি করতে পারছি না আর তুমি বলছ নিজেদের মধ্যে তাই করব?

- স্যার যে অবস্থা। চলেন না বাড়ি চলে যাই।

কথাটায় পালানোর ইঙ্গিত স্পষ্ট।

খুশি হলেও কর্তৃত্বের ভাব দেখানোর জন্য ভাটিয়া বলল, কিভাবে? কোন্ পথে?

-তেজগাঁ হাওয়াই আড্ডি থেকে পিআইএর একটা জাহাজ নিয়ে চলে যেতে পারি আমরা। প্রতিদিনই তো জাহাজ আসছে যাচ্ছে।

নিজেদের দুর্দশার ঘনত্ব বুঝতে পেরে ভাটিয়াও এমন কথা ভাবছিল বেশ কিছুদিন থেকে। ও বলল,

- ফ্লাইটের সিডিউল জান?

- স্যার জানি? অফিসারদের লাশ একদিন পর পরই তো করাচী যাচ্ছে। অমন একটা ফ্লাইট দখল করলেই আমাদের চলবে। আমাদের ইউনিটের অনেকেই এই আলাপ করছে। আমি আপনি যদি নাও করি ওদের কজন মিলে এই কাজ করেফেলবে দেখবেন। এসব জেনেও আমি তো কোন এ্যাকশনও নিতে পারছি না। মিলিটারি পুলিশ আছে ৬ জন আর আমার ফোর্স হচ্ছে ২৬৪ জন। বুঝতেই পারছেন স্যার। কিছু করতে গেলে...

- তো এয়ারপোর্ট যাবার সময় এদের কি বলবে? আর ওখানে পৌঁছার পর আমাদের বিচার?

শিয়ালের মতো এক হাসি দিয়ে ক্যাপ্টেন বলে কেন স্যার? বলব আমরা বদলি হয়েছি। সিও ছাড়া আর কারও কাছে বদলির অর্ডার যায় নাকি? এ রকম লম্পট ইয়াহিয়া, হামিদ বা শের আলীর আর বিচার করার কোন ক্ষমতা নেই। ওদেরও জান বাঁচে কিনা তাই দেখেন।

- হুঁ তোমার বুদ্ধি আছে। ঠিক আছে দিন তারিখ ঠিক কর।

ভাটিয়ার বড় আরাম বোধ হয়। কতদিন বাড়ি দেখিনি। আমার ব্রিগেড কমান্ডার গত ছয় মাসে একবারও খোঁজ নেয়নি। অতএব পালানোয় দোষ নেই।

তেজগাঁও এয়ারপোর্ট চারদিকে থেকে মিলিটারি দিয়ে ঘেরা। সিভিলিয়ন যাত্রীদের ঢুকতেই তল্লাশি করা হয়। কিন্তু ১৪ পাঞ্জাবের ৭টা ট্রাক, ১০টা হাফ- ট্রাক, কয়েকটা পিকআপ এবং একটা কমান্ড কার যখন গেটে এসে আস্তে আস্তে থামল মিলিটারি গার্ডরা শুধু তাকিয়ে দেখল। শোল্ডার ব্যাচ দেখে ভাটিয়া এবং অফিসারদের স্যালুট করল। সিপাই, নার্স সবাই লাইন ধরে যাত্রী লাউঞ্জে ঢুকে পড়ল। কেউ কোন প্রশ্ন করল না। ডোমেস্টিক টার্মিনাল। ইমিগ্রেশন, কস্টিমসের ঝামেলাও নেই। পিআইএর নিরাপত্তা অফিসাররা ডিউটিতে। তারা টিকেট দেখে বোর্ডিং পাস ইস্যু করে। তাদের কাউন্টারের সামনে ভাটিয়া গিয়ে দাঁড়াতেই ডিউটি অফিসার বলল, আপ কা টিকেট?

- আমরা প্লেনে চড়ব না। টারমাকে কাজ আছে। সঙ্গে এরাও যাবে। বিহারী ডিউটি অফিসার ঠিক জানে না এমন অবস্থায় কি করতে হবে। সে লে. কর্নেলের ইউনিফরম দেখে একটা স্যালুট ঠুকে দিল। সিভিল এ্যাভিয়েশনের সিকিউরিটি অফিসারও ব্যাপারটা দেখেছে। সে বোর্ডিং পাসের কথা জিজ্ঞেস না করে পুরো বাহিনীকে যেতে দিল। প্রত্যেকের সঙ্গে ব্যাগ আছে। হাতে বা কাঁঁধে অস্ত্র। এয়ারপোর্টে এখন এ রকম প্রায়ই হচ্ছে। আর্মি ঢুকছে বের হচ্ছে যখন তখন। তবে সিভিল এ্যাভিয়েশনের এই অফিসারটির মনে হলো ‘আর্মি তো যাত্রীদের পথ দিয়ে ঢোকে না। কিন্তু এদের কোন প্রশ্ন করতেও তার সাহস হলো না। ওর এত চিন্তা কি? সারা এয়ারপোর্টেই তো পাহারা দিচ্ছে আর্মি সেই ১ মার্চ থেকে। ক্যাপ্টেন হামদামকে ভাটিয়া বলল, ‘তুমি চার জন সৈন্য নিয়ে আগে বাড়াও। বল হাওয়াই জাহাজ চেকিং হবে।

হামদাম তাই করল। এখন সন্ধ্যা ছয়টা। যে প্লেনটা ছাড়বার জন্য দাঁড়িয়ে আছে ওটা একটা বোয়িং। এখন কোন টাইমটেবিল নেই। যাত্রীর ভিড়ও মারাত্মক। অসংখ্য অবাঙালী প্রতিদিন এয়ারপোর্টে গিজ গিজ করে। তিন মাস আগে টিকেট কাটা হলেও অনেকেই যেতে পারে না। তার মধ্যে সেনাবাহিনীর এক নম্বর অগ্রাধিকার। তাদের কোন দল যেতে চাইলে অন্য যাত্রীদের যাত্রা আরও পিছিয়ে যায়। হামদাম তার দু’জন সৈন্য নিয়ে প্লেনের প্রথম দরজার সিঁড়ির কাছে গেলে সিভিল এ্যাভিয়েশনের নিরাপত্তা কর্মী বলল,

‘র্আ লোগো কো বোর্ডিং পাস্?’

- আমরা যাত্রী নই। প্লেন চেক হবে। জাহাজে বোমা আছে।

এবার হামদামের পর ভাটিয়ার পেছন পেছন তার বাহিনী উঠতে থাকল। হামদাম কক্পিটের ঢুকে স্টেনগানটা পাইলট হাসান দররানির পিঠে ঠেকিয়ে বলল, চুপচাপ উড়বে, কেমন? একেবারে সিলোন। তারপর করাচী। টারমাকে বা কন্ট্রোলে উল্টাপাল্টা কিছু বলার চেষ্টা কর না। আমরা ডাকাত নই। পাকিস্তান আর্মি।

দুররানী লক্ষ্মী ছেলের মতো এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার এর সঙ্গে কথা বলা শুরু করল। কো-পাইট প্যানেলে মগ্ন। হামদামের ওয়াকিটকি খস্ খস্ করে বেজে উঠল। সিওর কণ্ঠ।

‘স্যার?’

-জাহাজে তো সবার জায়গা হবে না।

- হ্যাঁ স্যার বোয়িং হলেও এটা ছোট। ইনফরমেশন ছিল অন্য রকম কিন্তু করাচী থেকে আজ এই ছোট জাহাজই এসেছে।

- গাদাগাদি করে দু’শ’ বিশ জন যাবে বাকিরা থাকবে।

- স্যার আপ প্রাইয়োরিটি ফিক্সকার দিজিয়ে।

- হ্যাঁ ফিকির মতো কর। তুমি ওখানেই থাক।

যাত্রী উঠে গেছে অনেক এবং প্লেনের দরজার বাইরে টারমাকে দাঁড়িয়ে আছে অনেকেই। ভাটিয়া একটা ব্রেন-গান হাতে একজন লেফটেন্যান্টকে সঙ্গে নিয়ে দাঁড়ালো। তারপর বসা এবং দাঁড়ানো ক’জনের দিকে আঙ্গুল তুলে বলল, তোমরা নামো। অনেকে কথাটা না বোঝার ভান করল। ভাটিয়া তখন নাম ধরে ডাকা শুরু করল। এবার এরা উঠে দাঁড়ালো এবং নামা শুরু করল। এই খালি সিটগুলোতে এবার বাইরে নিচে দাঁড়ানোদের থেকে ওঠা শুরু হলো। এয়ার হোস্টেস আর পার্সারা নীরবে সব দেখছে। সিট নম্বর এবং বোর্ডিং পাসের বালাই নেই। দু’জন গিয়ে ঢুকেছে ককপিটে, তাও প্রশ্ন করা যাচ্ছে না। আবার প্লেনটা যে ঠিক হাইজ্যাক হয়েছে তাও নয়। পরিষ্কারই দেখা যাচ্ছে কোন বাঙালী নেই যাত্রীদের মধ্যে।

প্লেন এবার পরিপূর্ণ। যাদের নামিয়ে দেয়া হয়েছে তারা এখনও বিয়ষটা পুরো বুঝতে পারেনি। প্লেনের ডানা এবং ফিউজেলেজের নীল ও লাল বাতি এখন জ্বলছে আর নিভছে। প্লেনের দরজা বন্ধ করা হয়েছে। সিঁড়ি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ফিল্ড এ্যাম্বুলেন্স ইউনিটের নার্স আদিফা, আফিয়া, নর্দান স্কাউটের আইয়ুব, গিলগিট স্কাউট, লাহোর রেঞ্জারসের সৈন্য, পাঞ্জাব পুলিশের লোদী, ফাইরাজ গুল, ফায়েক আলী এবং জোড়া তালি দেয়া রং-বেরঙের ইউনিফরম পরা চল্লিশ জন প্রৌঢ় সিভিল ডিফেন্স আর রিজারভিস্ট সৈন্যের হতবিহ্বল দৃষ্টির সামনে দিয়ে জানালার ভেতর থেকে মৃদু আলো ছড়াতে ছড়াতে উড়োজাহাজটা রানওয়ের দিকে যেতে থাকল। প্রতারণাটা তার বুঝতে পেরেছে। অন্ধকার এই টারমাকে দাঁড়ানো নেতাহীন, দিশেহারা সত্তর জন নারী-পুরুষের মনে একটা মাত্র আতঙ্কই এখন ঘুরছে। তা হলো ‘কোর্ট মার্শাল’।

নির্বাচিত সংবাদ