২১ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশাখার ভালোবাসার নাম জল

  • নিমাই সরকার

বিশাখার ভালোবাসার নাম জল। তাঁর ইচ্ছে ছিল, তরল হয়ে বয়ে যাওয়ার। কিন্তু সেটা হতে পারেননি। তাইতো তৃষ্ণায় তাঁর বুকটা ভেঙে চৌচির। ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে। চক্ষে আমার তৃষ্ণা।’ ঘটনা প্রবাহে এই নারী অনেক কিছুর মুখোমুখি হয়েছেন, সেখানে তাঁর উপস্থিতিও ছিল সরব। তবে পরবর্তীতে তাঁকে কেউ আর খুঁজে পায়নি। একটি চক্রে ঘুরছে তাঁর জীবন। সেদিন তাঁর বাড়ির পাশে অনেক লোকের ভিড় ছিল। সেখানে পুলিশ অফিসার এসেছেন জেলা সদর থেকে। হাসপাতাল থেকে সিভিল সার্জন। আজ লাশটি মাটি থেকে তোলা হবে। তারপর করা হবে ব্যবচ্ছেদ। তাঁর মৃত্যুর কারণটা বের করার জন্য এখন সবাই যারপরনাই ভীষণ ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও সেখানে সমুপস্থিত। কঠোর নিরাপত্তাও রক্ষা করা হচ্ছে। আনসার ভিডিপিকে ডাকা হয়েছে । কিন্তু তারপরও ভিড় ঠেকানো যাচ্ছে না। দলে দলে মানুষ আসছে বিশাখার সমাধিতে।

খবরদার! ভয়ে লাফ দিয়ে সরে আসে গোর খোদক হুরমুজ আলী। একই সাথে সরে পড়ে গোরের কাছের মানুষগুলো। পুলিশ সুপার এগিয়ে আসেন। তাঁর নির্দেশে পুনরায় তারা গোর খুঁড়তে শুরু করেন।

‘না, না বলছি। তোদের হাত যেন আমার শরীর স্পর্শ না করে!’ সমাধির মধ্য থেকে কথাগুলো ছড়িয়ে পড়ে চারদিক। সবাই তাজ্জববনেযায় !এ কী , কবর থেকে কথা আসছে !

‘আমরা ময়না তদন্ত করব। ময়না তদন্ত...’ টেনে টেনে কিছুটা উচ্চস্বরে বলেন পুলিশ সুপার।

‘বললাম... না। তোরা আরকতবার অপমান করবি আমায়? ’ গাছের পাতা পর্যন্ত ঝরে পড়ে।

‘না, আমরা কাজগুলো সারতে চাই।’ সিভিল সার্জন এগিয়ে আসেন।

‘সেটা পরে!’ তখনও কণ্ঠে আগুন।

‘এজন্য যে ডক্যুমেন্ট প্রয়োজন।’ তথ্যপূর্ণ প্রমাণের ওপর জোর দেন পুলিশ কর্মকর্তা। সঠিকভাবে প্রতিবেদনটি তৈরি করতে পারলেই আমরা এগোতে পারব।

‘তোমরা ঘরে যাও!’ সুরেলা কণ্ঠ। যেন ঘুরে শুলেন বিশাখা।

সেদিন কী ঘটেছিল! মজিদ মাতবর অতর্কিতে আক্রমণ চালায় বাড়িটাতে। বিশাখার সপ্তদশী কন্যা বাড়িতে ছিল না। অবস্থা আঁচ করতে পেরে তাকে তার মামাবাড়িতে পাঠানো হয়। ওরা জ্বলে ওঠে। শিকার না পেয়ে হন্যে হয়ে যায় মাতবরের লোকেরা। তারা হামলে পরে চল্লিশ বছর বয়সী তরুণী মায়ের ওপর।

ওই যে বলেছিলাম, বিশাখা জল হতে চেয়েছিলেন। না, তিনি সেই ইচ্ছে পূরণে ততটা এগোতে পারেননি। তবে তাঁর চোখের জল সামলানো সম্ভব হয়নি। ওই যে যারা এসেছে তারা কেউ অচেনা নয়। পরিবার পরিকল্পনা’র গ্রামকর্মীর জন্য এই অর্জনটুকু একেবারে কম না। সেদিন রাগে ক্ষোভে অভিমানে অশ্রুজলে নেয়ে ওঠেন বিশাখা। সে জলে বুক ভিজে যায় । তবে চুপচাপ থাকতে পারেন না। মুহূর্তে বাঁক ঘুরে যায়। তিনি অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন । তরুণী ঘর থেকে রামদা বের করে আনেন ।

আর এক বিশাখার সাথে তাঁর এই চরিত্রের মিল আছে। দক্ষের সাতাশ কন্যার মধ্যে অনন্য সুন্দরী ছিলেন তিনি। খরতাপময় মেজাজের জন্য তাঁর নাম সবাই জানতো। এই বিশাখার নাম হয়তো কেউ জানেনা। কিন্তু তাঁর দহন, জ্বালার সাথে পরিচিত অনেকে। এ যন্ত্রণা একজন থেকে আরেকজন, এক কাল থেকে আরেক কালের সঙ্গে করেছে জটিল বন্ধন।

জোছনা রাত ছিল সেটি। চন্দ্র ছিল সাক্ষী। মজিদ মাতবরের লোক, যারা তাঁর দেহ নিয়ে হোলিখেলা খেলতে চেয়েছিলো, তারা আজও আছে এখানে। বিষয়টি বিশাখার কাছে অসহ্য। এরা সব সময় সব কালে আছে, থাকে। মুক্তিযুদ্ধের একাত্তরে ওদের ভূমিকা তাঁর কাছে অজানা নয়। তবে চরম সত্য এটাই, বিশাখা নষ্ট কালের নষ্ট মানুষদের কাছ থেকে কখনো ছাড় পাননি।

শ্রাবণী ফ্রক ছেড়ে কাপড় ধরেছে। এই বয়সে এই সময়ে তার এক বাড়ি থেকে অন্যবাড়ি ঘুরে বেড়ানোর কথা। জ্যৈষ্ঠের এই খরতাপে বাড়িতে বসে কাঁচাপাকা আম কেটে, লবণ ধনের গুঁড়ো মাখানোর মৌসুম তার। বেণী ঝুলিয়ে মাথায় ফুল দিয়ে আনন্দ-দৌড়ের কাল এটা। “ফকির লালন মরল জল পিপাসায়/ কাছে থাকতে নদী মেঘনা...” গেয়ে মাঝেমধ্যে রাস্তায় চলে আসবে সে। এইতো কৈশোর, এইতো তারুণ্য। কিন্তু তা কি আর হচ্ছে ? উত্তর-সোজাসাপ্টা না।

কাল মহারাজপুর থেকে চারটা ছেলেকে ধরে নিয়ে গেছে।

আজ কেউ নেই ও-বাড়িতে। কেবলমাত্র বাবা কন্যাকে নিয়ে আছেন। তবে ঘর বা বাড়ি বললে ঠিক হবে না, ওটা বাড়ির পাশের জঙ্গল।

তখনো রাজাকার হয়ে ওঠেনি, শান্তিবাহিনী নাম তাদের । তারা শনশন করে গ্রামে ঢোকে। গ্রামের নারী পুরুষ আবাল বৃদ্ধ বনিতা যে যার মতো করে পালায়। সতীশ রায় মেয়েকে নিয়ে ধরা পড়েন অতর্কিতে ।

‘কাফের মিলগিয়া!’ ... সেনা সদস্যরা উল্লাস করে। এর একজন বন্দুকের নল ঘুরিয়ে আনে তাঁর পেটের কাছ থেকে। অন্যরা শিকার ধরে এক লাইনে দাঁড় করায় সবাইকে।

‘না না।’ কিছু একটা বলতে চান। কীইবা বলবেন! ‘না আ আ...’

অনেক মানুষ। কিলবিল করে ওঠে। এতক্ষণ বোঝা যায়নি জঙ্গলের এতটুকু আড়ার মধ্যে এত মানুষ বসে আছে। পুরুষ, নারী, শিশু, প্রমত্তা মেয়ে- সবাই নিরাপদ ভেবে আশ্রয় নেয় এখানে।

অন্য এক সেনা আর দেরি করে না। ঝড়ের বেগে সামনে আসে। প্রচণ্ড এক শব্দে আকাশ বাতাস কেঁপে ওঠে। পাখিরা দৌড়ে পালায়। আম পড়ে মাটিতে। কিন্তু সেসব ছুঁয়ে দেখারও কেউ নেই। সতীশ রায় মাটিতে পড়ে যান।

তরুণী ছুটে আসে বাবার কাছে। বাবার বুক থেকে দরদর করে রক্ত ঝরে। সে পড়ে যায় রক্তাক্ত শরীরের ওপর।

‘বাবা...বাবা!’ বাতাস ভারী হয়। কিন্তু পাক সেনাদের মধ্যে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না ।

‘ইধার আও।’ খান সেনা শ্রাবণীকে ঝটকা টান দেয়। সুপারির ডালের খোলের মতো হালকা মেয়েটিকে বাগে নিতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। কিন্তু ও সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ‘না না...’ দাঁতে দাঁত চেপে সে পেছনের দিকে টানে। কিন্তু কতক্ষণ আর পারে! কীভাবেই বা সম্ভব! কিশোরী ধস্তাধস্তি করে। নিষ্ফল এ চেষ্টা। বড় লোভাতুর হয়ে ওঠে প্রথম খান সেনা। সেই বুঝি দলের প্রধান।

‘খামোশ!’ লম্ফ দিয়ে সে মেয়েটির সামনে দাঁড়ায়। অতঃপর তাকে জড়িয়ে ধরে, তার মুখের কাছে মুখ নেয়।

‘না-না!’ ও থুথু দেয়। খান সেনা একটু দূরে সরে যায়। বিস্মিত চোখে তাকায় সে। শেষতক রহস্যময় একটি হাসি দিয়ে সে তরুণীকে আবার জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে। ‘প্যায়ার করুঙ্গা তেরে সাথ। মুঝে প্যায়ার চাইয়ে।’ খান সেনা জোর খাটায়। শ্রাবণী এবার কামড় দেয় ।

জাফর মিয়া শান্তি বাহিনীর কমান্ডার। সে-ই খান সেনাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে হিন্দু প্রধান এই গ্রামে।

এতক্ষণ এই দৃশ্য উপভোগ করে সে। শ্রাবণী অবলম্বন চায়। ‘চাচা... চাচা...’ মুখ ঘুরিয়ে উল্টা দিকে সরে পরে তার জাফর চাচা। একাত্তুরে এ তাঁর নিজের গ্রামের ঘটনা।

গোর খোদক হুরমুজ আলী এবার জোরে কোপ মারে। সমান বেগ নিয়ে বাতাসের একটি কুণ্ডলি তার ফুসফুসের নিম্ন ভাগ থেকে ওপরে আসে। অতঃপর কোদালের শব্দের সাথে উচ্চারিত হয়। হ্যাৃক... কো...। দ্বিতীয়বার কোদাল মাটিতে পড়তে না পড়তে শাসনের কণ্ঠ। ‘থামো, আর একটি বারের জন্যও কোপ দেবে না। থামো বলছি!’

এবার ওপাশ ফেরেন বিশাখা।

তরুণী মা শুয়ে আছেন কাত হয়ে। কিন্তু আত্মীয়ের ব্যথার জ্বালায় তাঁর শরীর কাঁপে! বিশাখা জল হতে চান । কিন্তু শিউলি কী হতে চেয়েছিলো! এতদিন নিরুদ্দেশইবা রইলো কী করে!

সে-ও কি জল হতে চেয়েছিলো, নাকি অন্য কিছু! বিশাখার চোখ বেয়ে নেমে আসে অশ্রু।

বিশু সর্দার তখন থানার দালাল। এরই মধ্যে হিন্দুদের পল্লি নয় কেবল, জ্বালানো হয়েছে ইসলাম ধর্মের মানুষের বাড়িও। শিউলিরা পালিয়েছিলো নদীর ওপারে। ঈসা দেওয়ান আশ্রয় দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষকুল রক্ষা হয়নি। বাড়ি থেকে টেনে তাঁদের ওপর গুলি চালানো হয় ।

‘ইয়ে আওরাত তুম হারা কিয়া লাগতি হ্যায়?’

‘আমার মেয়ে। হামারা বেটি...’ আধো বাংলা আধো উর্দুতে বলেন ঈসা দেওয়ান। পবন দেওয়ান তাঁর ভাই। তাঁরও বোঝানোর চেষ্টা। ‘উনকি বেটি হ্যায়, হুজুর!’ কোনো কথা কাজে লাগেনি। বিশু সর্দার উসকে দিয়েছে। শিউলিকে নেয়া হয় সদরে।

বিশাখারই দূর সম্পর্কীয় মাসি। বড় বাড়ির মেয়ে। অষ্টাদশী হতে না হতে বিয়ে হয়েছিল। দুর্বিপাকে স্বামী মারা যায়। ফিরে আসে বাবার বাড়িতে। স্বামীর বিয়োগ ব্যথা তার তখনো কাটেনি। এরই মধ্যে দেশে নামে ইয়াহিয়ার ঝটিকা বাহিনী। তারা প্রবেশ করে গোপালগঞ্জের গ্রামে। শিউলি ধরা পড়ে যায় । তারা হত্যা করে অনেককে। কিন্তু শিউলিকে মারে না। কিংবা মারতে পারে না। দেহ লাবণ্যই ওর কাল হয়ে দাঁড়ায়।

শিউলি ওর হাত ছাড়াতে চেষ্টা করে।

‘হা হা হা।’ ওদের মুখে অট্টহাসি !

‘না না...’ ও নিজেকে রক্ষার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে।

‘হা হা হা...!’ বেপরোয়া পাক সেনা। ওর কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে জীবনে যে শব্দটি ব্যবহার করেনি।

‘শুয়োরের বাচ্চা।’ ও কিচ্ছু করতে পারে না।

অন্য জন ধমক দেয়, ‘চোপড়াও লেড়কি।’

ওরা টানতে টানতে নিয়ে আসে ট্রাকে। তারপর ক্যাম্পে। ‘তেরে সাথ দোস্তি করুঙ্গা। ‘তুম হামারা প্যায়ার হ্যায়...’

‘অসভ্য ! চড় কষে দেয়।

আত্মহত্যাই একমাত্র পরিত্রাণের পথ, ভাবে শিউলি । কিন্তু সফল হয় না। এক সময় মনে করে, মৃত্যুই যদি হয় আরাধ্য তাহলে এত সহজে কেন! তরুণী ওদের সন্তুষ্ট করার কাজে মনোযোগ দেয়। কয়েক দিনের মধ্যে সে ওদের আস্থা অর্জন করে নেয়। শিউলি এর পর গ্রামে যায় আবার সেখান থেকে ফিরেও আসে। মুক্তিবাহিনীর সাথে গড়ে তোলে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ।

এক পর্যায়ে নিমন্ত্রণ করে আনে খান সেনাদের। সেদিন পাঁচজন ফিরে এসেছিলো ক্যাম্পে, তাও বুলেটের ক্ষত নিয়ে। চল্লিশজন হয়েছিল ওই গ্রামের শিয়াল-কুকুরের খোরাক।

তারপর কয়েক মাসে আর কোনো খোঁজ ছিল না শিউলির ।

আজ বিশু সর্দারই তাকে পাক সেনাদের হাতে তুলে দিলো ।

আবার সেই বন্দি শিবির। আবার সেই অত্যাচার নির্যাতন। একজন নয়, দুজন নয়- পালাক্রমে খাবলে খায় তারা ।

শিউলি মরেও মরে না। কিন্তু ওরা ভাবে মরেছে। বিশু সর্দারের লোকেরা নিয়ে ফেলে মধুমতির পারে ।

জোছনা রাতে মরার মতোই পড়েছিল সে। এর মধ্যে সে সুখ খুঁজে নেয়। নীল সে জল, জোছনায় সমুজ্জ্বল। ঢেউ তার বুকে, কেউ কি থাকে এমন সুখে! সে আপস করেনি। প্রতিবাদের মধ্যেই সুখ। তরুণী প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিল। না, নিষ্ফল সে প্রয়াস। তাকে ওরা হত্যার আগে হত্যা করে। আগের হত্যাই আসল। শেষটা করা না করা সমান কথা। তার চোখ বেয়ে নেমে আসে অশ্রু।

পরের দিন সূর্য সকালে তাঁর চোখ দুটো খুলে যায়। শিউলি দেখে এক কিশোর চলছে পার বেয়ে।

সে-ও বুঝি জল পছন্দ করে! সে জন্য কি জলপার দিয়ে তার চলা? জলের সঙ্গে তার বন্ধুতা! তার চোখ দুটো বুজে আসে।

‘তোমাকে কোথায় নিই আমি দিদি!’ কিশোর উপায় খুঁজে পায় না।

‘তোর কে আছে রে?’মুখে গালে রক্তের ছাপ। মাছি ভনভন করে।

‘আছে আমার মা, আছে বাবা, আছে দুই বোন।’

‘ওখানেই যাব।’ কাঁপা দুর্বল কণ্ঠ শিউলির। শরীর নড়ে না। তবে কথাগুলো বেরোয়।

কিন্তু ঘর যে নেই। যা আছে তা ভাঙা।

কিশোর হয়তো ভাবে নিতে পারি তাকে। কিন্তু তার জন্য আশ্রয়টি কোথায়! যোগ্য জায়গাটিতো নেই।

এত কিছু হিসাব কষে লাভ কী! অতঃপর ভাইকে ডেকে এনে প্রায় কাঁধে করে ডিঙিতে তোলে তাকে।

ঘর বলতে ভাঙা দোচালা। বাড়ি বলতে জঙ্গল। ওর মধ্যেই জায়গা হয় শিউলির। তার চোখ বেয়ে জল নেমে আসে । বলে, ‘বিপুল, একটু কাছে আয়।’ ওর কপালটা কাছে এনে চুমু খায়।

মা তাকে পরিয়ে দেয় তারই আটপৌরে শাড়ি। নরম কাপড় ভিজিয়ে মুছে দেয় তরুণীর শরীর। রান্না করা হয় জাউ। কিন্তু তার শরীরে কি খাওয়ার সেই শক্তি আছে! কিছুক্ষণ পরপর ঘুম নেমে আসে চোখে।

প্রচণ্ড ব্যথা শিউলির শরীরে।

বাগানে বাতাস বয়। ডালগুলো দোলে। গাছের পাতারা চিকচিক করে সূর্যের আলোয়। পাখিরা ডালে এসে বসে। কোদালের কোপ পড়ে আবার।হ্যাৃক... কো...।

‘না, আর সহ্য হয় না!’ এবার করুণ কণ্ঠ বিশাখার। ‘তোমরা মুক্তিযুদ্ধের শত্রু। পশ্চিমাদের পক্ষের। থামাও কোদাল।’ এবার মাটি থেকে নির্দেশ আসে। বিশাখা বিশাখা হয়ে ওঠে।

‘আমরা তোমারই বোন।’ পুলিশ অফিসার বলে।

‘তুমি আমাদেরই প্রিয় এক কন্যা।’ সিভিল সার্জন এগিয়ে আসেন।

‘হা হা হা!’ বিশাখার এ স্বগত সংলাপ। রাজবাড়ি থেকে গোপনে আমগাছ কেটে নেয়া হয়। সেটা কীভাবে হলো! জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলেও রাজকন্যার ইচ্ছে, তার ভালোবাসার সংগ্রহ অযতœ পেতে পারে না। রূপার ফ্রেমে বাঁধানো একটা ছবি, এর রক্ষায় তোমরা যতœবান নও। কার ছবি, সেই নাম খোঁজার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লে! হায়রে কী বাতুলতা! জানোনা! এ যে চন্দ্রপ্রভা। তোমরা তারই চিঠিগুলো পড়লে। এরইসাথেছবি। সে আমারই। কিন্তু এটা প্রমাণ করতে এতটা ডলাডলি কেন!

হ্যাঁ, ও আমারই সংগ্রহ । সে সময় ধনীর দুলালীরা সুন্দরের কবিতা লিখতো। আজও লেখে। কী মধুর সে পংক্তিমালা! নিসর্গ ডেকে বলে, জানাই ভালোবাসা। পাখিরা বলে , এসো গান করি । পাহাড় আকুলতা জানায় , বন্ধুত্ব তোমার সাথে। কিন্তু এসব তোমাদের টানে না।

চিঠিতে চন্দ্রপ্রভার উত্তর সুন্দরে ঠাসা। সেখানে প্রিয়তম শব্দটি ছিল। লেখাটি প্রকাশের সময় শব্দটি বাদ পড়েছে। রাজকন্যা বলেন, তোমরা বাগান উজাড় করে ছাড়ো , বন দখল করে নাও , ভালোবাসা বোঝ না।

আরওএকটা চিঠি ছিল সেখানে। আমি ভালোবাসি দেশকে, আমার প্রিয় বাংলাদেশকে। অক্সফোর্ডে পড়া তরুণ আমাকে পেতে চেয়েছিল। সে ছিল এক বর্ষা রজনী। বৃষ্টি নামে তখন হাওয়ার তালে গাছের ডালে। কখনো টাপুর-টুপুর। গাছপালা বাতাসে দুলছিল। একবার এদিক একবার ওদিক। অদ্ভুত শিহরণ তখন আমার!

ঘরের বাইরে মন টানে । আমি বলি, ধরো হাত। না, সে এগোয়নি। কোনো ব্যাকরণ মানেনা আমার জলের ভালোবাসা। আমি একা বেরোই। বলতে পারো, জল হওয়ার ইচ্ছা থেকেই বৃষ্টির ধারায় সিক্ত হয়েছি।

এরপর আসে এক বাঁশি ওয়ালা। ও বাঁশি বাজায়। কৃষ্ণের বাঁশির সুরে রাধা কি ঘরে থাকতে পারে! সুতরাং তাই হলো। হৃদয়তন্ত্রীতে টান দেয়। যখন তখন বাইরে বেরিয়ে আসি।

কিন্তু আমার যে জল হওয়ার ইচ্ছে! প্রত্যাশার কাছাকাছি এসে যায় অনেকটা। রাখালি বাঁশি বাজে ভর দুপুরে। জেগে ওঠা ধানের চারারা আহ্বান জানায় বাতাসকে। গ্রীষ্মের গায়ের ওপর দিয়ে শিরশির করে বাতাস বয়ে যায়।

চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে। চক্ষে আমার তৃষ্ণা। আমি বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন, সন্তাপে প্রাণ যায় যে পুড়ে। ঝড় উঠেছে তপ্ত হাওয়ায় হাওয়ায়, মনকে সুদূর শূন্যে ধাওয়ায়- অবগুণ্ঠন যায় যে উড়ে। গানের সুরে সুরে প্রকৃতি প্রাণ-প্রত্যাশী হয়ে ওঠে। আমার অবস্থাও তথৈবচ। বিশাখা দম নেন।

এক সময় আকাশ কালো হয়ে ওঠে। মেঘেরা প্রচণ্ড বেগে ধাক্কা খায় পরস্পরের। বৃষ্টি নামে। রাখাল ছেলে ডেকেছে দুপুরে। এবার বিকেলের ঝড়-ঝঞ্ঝায় আমিই ডাকি। সে মান রেখেছে।

এরপর আমরা কাছাকাছি না থাকলেও যোগাযোগ থাকে। পত্রালাপ হয়। লিখি, প্রিয়তম ভালো থেকো তুমি। সেও জবাব দেয়। তোমরা চিঠিটি নিজেদের থলেতে ভরেছো। কিন্তু এর কোনো মূল্য দাওনি। মর্যাদা দাওনি। না মানুষটির, না ভালোবাসার।

জরির জামা, রাজার মুকুট, হাতির দাঁতের হাতল লাগানো ছুরি, পাথর কাটা থালা এসবের গুরুত্ব দাওনি তোমরা। এখানেও তার সাবলীল উচ্চারণ। ঐতিহ্য ঐতিহ্য কর, ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাও না।

দোয়াত-কলম ওগুলো রাখতে আপত্তি কেন বলো!

রাজবাড়ির সিন্দুক, পরিধেয় বস্ত্র ঠিকঠাক করে রাখার ইচ্ছে তোমাদের নেই ।

বিশাখা কেঁদে ফেলেন। তাঁর চোখ দিয়ে অঝরে জল পড়ে।

পুলিশ অফিসার বলে, ‘কোদাল মারো!’

হুরমুজ আলী দেহের সব শক্তি দিয়ে গোর খোড়া শুরু করে। হ্যাৃক... কো...। এদিকে মুহূর্তে আকাশের চেহারা বদলে যায়। পাখিরা দৌড়ে পালায়। একই সময় মাটিতে সেই কান্নার সুর। উম... উম...।

এক তরুণী হিমালয় থেকে বরফগলা নদী হয়ে নামে। ভাসায় দেশ । দুকুল বেয়ে ওঠে গ্রামে। নালিপথে ঢোকে। বেড়ি বাঁধ মানে না। জলকপাট ভেঙে সামনে চলে। ফুলেল কচুরিকে সঙ্গে পায়। প্রত্যন্ত ভেতরের ধান খেতে আশ্রয় নেয়। টলটল করা জল ধারণ করে নিজের বুকে। তার মধ্য দিয়ে মাছের অবাধ বিচরণ। নৌকা নিয়ে মাঝি যায়। নায়রির মুখ দেখে সে নিজেকে খুঁজে পায়। জলের ভালোবাসায় স্নিগ্ধ হয়, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। করবেই, কারণ, তরুণী যে প্রকৃত অর্থেই বিশাখা।

বাতাস আসে, বৃষ্টি পড়ে। ভরে যায় মাটির গর্ত। ভেঙে পড়ে চারপাশ। বিদ্যুৎ চমকায়। এরপর ঢল, মহাঢল।

গোর খোদক গর্ত থেকে উঠে আসে। বিশাখা এবার বুঝি সত্যি সত্যিই জল হয়ে যান। মজিদ মাতবরও নিশ্বাস ছেড়ে বাঁচে। তবে তখনো মাটির গভীর থেকে আসে কান্নার সুর। উম... উম...।