২১ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ॥ সত্যের জোর কমে আসছে

  • সুশান্ত মজুমদার

জল-স্থল-অন্তরীক্ষে প্রবল সশস্ত্র যুদ্ধের কারণে রক্তভেজা মাটি ও চড়া মূল্যে অর্জিত এই দেশের স্বাধীনতার সময় সাড়ে চার দশকেরও বেশি পার হয়ে গেছে। কালের কেশর ঝাপটে ধরে আমরা পেরিয়ে এসেছি সোজা-বাঁকা, সরল-জটিল, আলো-অন্ধকারের পথ। ক্রমশ অগ্রগতির ছোঁয়ায় সমাজের উপরিভাগে বহুমুখী উন্নতি দৃশ্যমান। গ্রাম-শহর একাকার হয়ে মানুষের নাগালের মধ্যে এসেছে বিভিন্ন সুবিধা। সরকারীভাবে গ্রহণ করা হয়েছে ফলপ্রসূ উদ্যোগ। কিন্তু যাঁদের বলা হয় জাতীয় বীর, যাঁদের ত্যাগ ও লড়াইয়ের বিনিময়ে বিজয়, সেই মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা নিরূপনে সুষ্ঠু, নির্ভুল কোন ব্যবস্থা আজ অবধি নেয়া হয়নি। এতদিনে অনেক মুক্তিযোদ্ধার জীবনাবসান হয়েছে। পাড়াগাঁ-র অনেক মুক্তিযোদ্ধার পরিবার তাঁদের ছটাকখানেক ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে গেছেন। শূন্য দুই হাত সম্বল করে জনারণ্যে হারিয়ে গেছেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। কোন কোন বয়োবৃদ্ধ অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধা আয়ুর শেষাংশ নিংড়ে ধুঁকে ধুঁকে শ^াস নিচ্ছেন। এ-সবের খোঁজ কেউ রাখেন না। সাময়িকভাবে কথার ফুলঝুরি দিয়ে তাঁদের কীর্তির কথা বছরে দুই-একবার নেতা ও প্রশাসনের মানুষরা উচ্চারণ করেন। বাতাসে ওই সব বাক্য নিঃসীম শূন্যে উড়ে যায়। তালিকায় নতুন মুক্তিযোদ্ধাদের যে সংখ্যা বেড়েছে সেখানে নকলদের সংখ্যাই বেশি। যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছেন তাঁদের শাসনামলে কৌশলে, ভুয়া কাগজপত্র দাখিল করে নিজেদের দলীয় সদস্যদের মুক্তিযোদ্ধা বানানো হয়েছে। সবই সম্ভবের এই দেশে মুক্তিযোদ্ধাও বানানো যায়! মফস্বলের এক নেতার মুখে আমি শুনেছি, পার্টি কর্মীদের তো কিছুই দিতে পারি না, তাঁদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে মাসে মাসে ভাতা বাবদ দশ হাজার টাকা করে বরাদ্দ ভালই। প্রকাশ্যে মানুষ উদ্ধারের এমন স্বীকারোক্তি শুনে তাজ্জব হইনি। অন্যায় দেখে, শুনে, সহে আমাদের ভিড়ের হৃদয় ও বোধোদয়ে গুণগত পরিবর্তন নেই। নিজেই তো আপোস করতে করতে এখন চলতি হাওয়ারপন্থী।

বছরব্যাপী মুক্তিযোদ্ধাদের চরম দুরবস্থার প্রতিবেদন পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। আমাদের চারপাশে, বিশেষ করে গ্রামের বিরাজমান বাস্তবতায় নজর দিয়ে প্রায়শই দেখতে পাইÑ বিত্তশূন্য, কায়ক্লেশে জীবনযাপন করা মুক্তিযোদ্ধাদের উপর নেমে আসছে উপর্যুপরি বঞ্চনা। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের কর্তা থেকে উপজেলা প্রশাসনের সাহেব-সুবোÑ কেউই মুক্তিযোদ্ধার ফরিয়াদ শোনেন না। আইনী মারপ্যাঁচে জায়গা জমির দখল ছাড়াও কোন না কোন অছিলায় মুক্তিযোদ্ধার পরিবারকে ইচ্ছামতো পীড়ন ও লাঞ্ছিত করা হচ্ছে। দ-দানের সম্মানীয় জনরা ন্যায় বিবেচনা করে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা করেন না। এমন অভিযোগ ঢালাওভাবে করছি নাÑ সামান্য ব্যতিক্রম কখনও কখনও আছে। তাঁরা পরিষ্কার জানেন, বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে দামী চাকরির সুযোগ কিছুতেই তাঁদের হতো না। মুক্তিযোদ্ধাদের মরণপণ যুদ্ধ করে স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার সুবাদে মহাশয়রা সুপিরিয়র সার্ভিসে আছেন। আমার শহর বাগেরহাটের প্রত্যক্ষদর্শী সজ্ঞান এক যুবক দুঃখিত কণ্ঠে বিবরণ দিয়েছেন: জীবন-জীবিকার তাগিদে নিরূপায় বয়সী মুক্তিযোদ্ধা ইট বিছানো ভাঙচুর রাস্তায় রিক্সা চালাচ্ছেন, যাত্রী একাত্তরের এক রাজাকার, যে এখন দম্ভ করে ছড়ি ঘুরায়, সে আরও জোরে মুক্তিযোদ্ধাকে রিক্সা চালাতে হুকুম করছে। শুনে, অপমানে-গ্লানিতে বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ হয়েছে। সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই করে তালিকাভুক্তির এক গোঁজামিলের তৎপরতায় নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছি: নবম সেক্টরের বাগেরহাট সাব-সেক্টরে একাত্তরের এক বীর মুক্তিযোদ্ধা পথ দুর্ঘটনায় আহত শরীর নিয়ে উপজেলা অফিসের প্রাঙ্গণে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যান্ডেজ বাঁধা পায়ের যন্ত্রণা সহ্য করে বসে আছেন। একাত্তরে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার হাতে যুদ্ধে আহত ভয়ঙ্কর এক রাজাকার এখন শহরতলির পাকাপোক্ত মসজিদে দিব্যি মুসুল্লি সেজে আয়েশে আছে। দেখে শুনে মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নস্যাৎ বিরুদ্ধ পরিবেশের সুযোগ নিয়ে পরাজিত শত্রু ও তাদের বংশধররা প্রতিটি ক্ষেত্র দখল করে এখনও জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের উপর শোধ তুলছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মাননীয় মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক গত তিন ডিসেম্বর ‘একাত্তরে সুন্দরবন’ বিষয়ক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে স্বপ্রণোদিত হয়ে একটা সঠিক কথা বলেছেনÑ প্রকৃত অর্থে মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ। এ-যুদ্ধে দেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। অথচ জনযোদ্ধাদের সঠিক মূল্যায়ন করা হয়নি। এমন ব্যর্থতা নিয়ে তিনি আফসোসও করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছাত্র-যুবক, শ্রমিক, বাঙালী সেনাসদস্য থাকলেও বেশিরভাগ ছিলেন গ্রামের কৃষক। মুক্তিকামী শহুরে শিক্ষিত মানুষের চেয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ছিল বেশি। মাটি ও গাছপালা জগতের মানুষেরা অস্ত্র গোলাবারুদ দিয়ে সাহসের সঙ্গে শত্রুর মোকাবেলা করেছেন। দেশ স্বাধীনের পর গ্রাম জনপদের যোদ্ধারা কোন কিছু প্রত্যাশা না করে স্ব স্ব ঘর-সংসার, কৃষি কাজে ফিরে গেছেন। কেউ তাঁদের খোঁজ রাখেনি, তাঁরাও সেই সময় মুক্তিযোদ্ধাদের কোন গেজেট বা তালিকায় নাম থাকার বিষয়টি নিয়ে অবগত ছিলেন না। যখন জেনেছেন, দেরি হয়ে গেছে। সরকারের পছন্দের ও নেতাদের পকেটের মানুষ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃত্বে থাকায় তাঁরাও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহে বা তাঁদের সংঘবদ্ধ করতে গ্রহণযোগ্য কোন ব্যবস্থা করেননি। বরং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সৃষ্টিতে সংসদের আছে অপপ্রয়াস। আজ মুক্তিযোদ্ধার কোটায় চাকরিরত অনেকে কার্যসিদ্ধির ফাঁকফোকরে ধরা পড়ছেন। এদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির প্রাথমিক কাগজপত্র তৈরি করেছে কারা? থানা (এখন উপজেলা) থেকে জেলা সংসদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শনাক্ত করে প্রত্যয়নপত্র দেয়ার পর তাঁরা মন্ত্রণালয়কে হাত করে তৎকালীন সরকারী গেজেট বা লাল মুক্তিবার্তার তালিকা ছাড়াই সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে পারছেন। খোদ মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা তাঁর শ^শুরকে মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সার্টিফিকেট জোগাড় করে দিয়ে ধরা পড়েন। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ফলাও করে এটা প্রচারিত হয়। অথচ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য সংসদের কার্যনির্বাহী সদস্যদের কাছে যেতে যেতে তাঁদের অচল ঝাঁঝরা শরীর ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়। সংসদ সংশ্লিষ্টরা সুপারিশপ্রাপ্ত, কে কার আত্মীয়বান্ধব, ঘনিষ্ঠ, তাঁদের মুক্তিযোদ্ধার সিল-ছাপ্পর মারতে বিলম্ব করেন না। একাত্তরে পাকিস্তানী দালালের বাসায় নিরাপদে নয় মাস কাটিয়েছে এমন এক আত্মীয়কে আমার জেলার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রাক্তন কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তাঁর নাম মধ্যস্থিত করে ভুল কর্মকা-ের জন্য এই লেখকের কাছে আফসোস করেছেন।

একাত্তরে গ্রাম-গঞ্জ, শহরের বিভিন্ন প্রান্তের ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে মানুষ দেশের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তখন পরস্পর চেনা-জানা-পরিচয় না থাকলেও আমরা ছিলাম ঐক্যবদ্ধ। সম্মিলিতভাবে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র চালনা, গেরিলা পদ্ধতি বা রণাঙ্গনে মুখোমুখি যুদ্ধে একাত্ম হয়েছি। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পরবর্তীকালে জীবন-জীবিকার তাগিদে আমরা যে যার ছাউনিতে ফিরেছি। দিনবদলের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে আমাদের অবস্থান, নীতি-আদর্শ-বিশ^াস। কোন কোন মুক্তিযোদ্ধা একাত্তরের চেতনা ও তেজোদীপ্ত আপোসহীন চরিত্র বজায় রাখতে পারেননি। একাধিকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদল, উপর কাঠামোর নষ্ট-ভ্রষ্ট মেরুকরণ, স্বার্থান্বেষী নেতৃত্বের ভ্রান্ত, অন্যায়, অসিদ্ধ কর্মের প্রভাবে মুক্তিযোদ্ধাদেরও মধ্যে রচিত হয়েছে বিভক্তি। নিজের পাতে ঝোল টানার অভ্যাসে নেতৃত্ব মুক্তিযোদ্ধাদের যে যার ভাগে টেনে নিতে চেয়েছেন। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসসহ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ের কোন অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক উপস্থিতি তাই দেখা যায় না। তাঁরাও মনের দিক থেকে অংশগ্রহণে আন্তরিক ও দায়িত্বের টান অনুভব করেন না।

বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আবশ্যক, অবশ্যই মহৎ একটা উদ্যোগ নিয়ত আমাদের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মনে রাখা দরকার। অবস্থাপন্ন, মধ্যবিত্ত, হতদরিদ্র সব মুক্তিযোদ্ধার জন্য প্রতি মাসে দশ হাজার টাকা, বিশেষ দিন ধর্মীয় উৎসবে বাড়তি ভাতার ব্যবস্থা হয়েছে। এতে দুস্থ মুক্তিযোদ্ধার জন্য আর্থিক অনটন কিছু হলেও লাঘব হচ্ছে। জনান্তিকে, এমনকি মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীর মুখে শোনা গেছে, বাংলা নববর্ষ, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রতি মুক্তিযোদ্ধার জন্য বরাদ্দ হবে আরও পাঁচ হাজার টাকা। কার্যক্রম দেখে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়, মুক্তিযুদ্ধ পক্ষের সরকার আগামীতেও শাসন ক্ষমতায় থাকলে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য থাকবে বিভিন্ন সহযোগিতা। এখন, প্রতি মাসের ভাতা একত্রে তিন মাস পর পর জেলা, উপজেলা প্রশাসন ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের যৌথশ্রমে সম্পন্ন হচ্ছে। আকস্মিকভাবে ই-পেমেন্টের নামে কেবল ব্যাংক নয়, অধুনা সারা রাজ্যপাটে চালু বিবিধ ডিজিটাল মাধ্যমেও মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত দোদুল্যমান আছে। এ-জন্য প্রতি মুক্তিযোদ্ধা ফরম পূরণ করেছেন। বিগত দুই-তিন বছরে মুক্তিযোদ্ধারা পূরণ করেছেন একাধিক নতুন ফরম। এর কোন ইতিবাচক ফলাফল আজ পর্যন্ত নেই। আমার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কথোপকথনে মনে হয়েছে, ভাতা গ্রহণে সবাই ব্যাংকিং সিস্টেমকে সহজ, নিরাপদ, অনায়াসলভ্য মনে করছেন। বিকাশ/রকেট/ই-ক্যাশ লেনদেনে প্রয়োজন একটা মোবাইল ফোন। এই ফোন যদি হারিয়ে যায় তখন ভাতা উদ্ধারে দেখা দেবে জটিলতা। খরচও আছে। ই-ব্যাংকিং-এর ব্যয় কে নির্বাহ করবে? মুক্তিযোদ্ধাদের দিতে হলে ত্রৈমাসিক ভাতা থেকে খরচ বাবদ প্রায় ছয়শ’ টাকা চলে যাবে। বিষয়টি মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যথেষ্ট বিভ্রান্তি, অস্বস্তি, আপত্তির কারণ হয়েছে। আবার পূর্বাপর বিবেচনা না করে কোন কোন মুক্তিযোদ্ধা ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য মৃদু স্বরে নিজেদের মধ্যে কথা চালাচালি করেন। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, কোন সার্টিফিকেট বা ভাতার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা একাত্তরে যুদ্ধ করেননি। দেশপ্রেমই ছিল প্রধান। মৃত্যুর সম্ভাবনা জেনেও জীবনদানে তাঁরা দ্বিধান্বিত ছিলেন না। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান এই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার নামে বিগত দিনে বার বার ভুল করা হয়েছে। প্রয়োজন সঠিক কোন সিদ্ধান্ত।