১৯ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রয়াত আমজাদ হোসেন

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব আমজাদ হোসেনের প্রস্থানে আজ শোকগ্রস্ত চলচ্চিত্র জগত। ছিয়াত্তর বছর বয়স চিরবিদায়ের জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে তাঁর মতো গুণী এক সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য। গত মাসেই ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বিদেশের আরোগ্যসদনে তাঁর চিকিৎসার জন্য অর্থায়নও করেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। তাঁকে চলে যেতে হলো। জীবনের লয় আছে। বাস্তবতা এটাই। মৃত্যুতে তার সমাপ্তি। যদিও সত্যিকারের সৃষ্টি কালজয়ী হয়, অসামান্য সৃষ্টি চিরঞ্জীব। আমজাদ হোসেনের এমন কিছু কীর্তি আছে যা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে। এদেশের হাতে গোনা সেরা ক’জন চলচ্চিত্র নির্মাতার মধ্যে তাঁর নাম উপরের দিকেই থাকবে। দেশের সবচেয়ে আলোচিত ও মহান চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হানের সহকারী ছিলেন আমজাদ হোসেন। ফলে তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণপাঠ ও চর্চা শুরু থেকেই উন্নত স্তরেই ছিল। ষাটের দশকের গণআন্দোলনকালে পাকিস্তানী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে নির্মিত জহির রায়হানের প্রতীকধর্মী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’র চিত্রনাট্য রচনার দায়িত্ব পান তিনি। শিক্ষাগুরুর মতো আমজাদ হোসেনও ছিলেন একজন কথাসাহিত্যিক। স্বাধীনতা-উত্তরকালে নিজের লেখা উপন্যাস ‘নিরক্ষর স্বর্গে’ অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘নয়নমনি’ চলচ্চিত্র। ছবিটি জিতে নেয় তিনটি শাখায় জাতীয় পুরস্কার। এরপর একে একে নির্মাণ করেন গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী, কসাই, জন্ম থেকে জ্বলছি, দুই পয়সার আলতা, ‘ভাত দে’সহ বেশ কিছু ছবি। এগুলোর ভেতর কোন কোনটি অর্জন করে নিয়েছে একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তবে যে কোন চলচ্চিত্র নির্মাতার জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো অগণিত দর্শকের আস্থা অর্জন। সেটি তিনি পেয়েছিলেন। তার প্রায় সব সিনেমাই দর্শকনন্দিত হয়েছে। একই সঙ্গে মানসম্পন্ন এবং বাণিজ্যিকভাবে সফল এমন চলচ্চিত্রের দৃষ্টান্ত দিতে গেলে তাঁর নাম আসবেই।

নিজের তৈরি সিনেমার জন্য বেশ কিছু গানও লিখেছেন আমজাদ হোসেন। আমজাদ হোসেন নিজে গায়ক ছিলেন না বটে তবে অভিনয় করতেন। দেশে প্রাইভেট চ্যানেলের যাত্রা শুরুর আগে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিতে ঈদ উপলক্ষে সমাজবাস্তবতা ও বিনোদনের মিশেলে তিনি নতুন ধরনের দর্শনযোগ্য নাট্যধারার সূচনা করেন। দেশের কোটি দর্শক রাত জেগে বসে থাকত কখন তার নাটক শুরু হবে। কেন্দ্রীয় চরিত্র জব্বার আলী বা ‘জবা কুসুম রোকন দুলালের’ বাবার চরিত্রে অভিনয় করে একজন অভিনেতা হিসেবেও দারুণ খ্যাতিমান হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তাঁর টিভি নাটক দেখা ছাড়া ঈদের আনন্দ যেন অসম্পূর্ণ থাকত। হাস্যকৌতুকের ভেতর দিয়ে সমসাময়িক সমাজের প্রবণতা তুলে ধরা এবং একই সঙ্গে সূক্ষ্ম বিদ্রুপ। এমন কৌশলী উপস্থাপনার জন্য তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিনোদনমূলক টিভি নাটকের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাট্যকার। অন্যদিকে সাহিত্য ছিল তাঁর প্রিয় প্রাঙ্গণ। বেশ কিছু উপন্যাস আছে তাঁর। সাহিত্যের জন্য অর্জন করেছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার।

আমজাদ হোসেনের চলে যাওয়ার ভেতর দিয়ে দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের একটি যুগেরও যে অবসান হলো সেটি বলাই বাহুল্য। চলচ্চিত্র শিল্প কালে কালে পরিবর্তিত হবে, কারিগরি দিক দিয়েও তাতে যুক্ত হবে নব নব আধুনিকতা। তবে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আমজাদ হোসেনের নাম যে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, এতে কোন সন্দেহ নেই।