১৯ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হাওড়ে শেখ হাসিনার উন্নয়নের ছোঁয়া

  • সোহেল রানা

শেখ হাসিনার সরকারের আঞ্চলিক উন্নয়নের পথ ধরে উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা এখন অতীত। দলিল-দস্তাবেজ ছাড়া এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। অবসান ঘটেছে ‘মঙ্গা’ অপবাদের। সরকারের নানা উদ্যোগে ওই অঞ্চলে এখন ফসল ও কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। নানা কারণে সুবিধাবঞ্চিত দেশের হাওড়বেষ্টিত অঞ্চলের মানুষও। সেই লক্ষ্যে মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। এই মহাপরিকল্পনা এনে দিয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদিচ্ছায় হাওড়বাসীর অকাল বন্যায় ফসলহানির অনিশ্চয়তাও ঘোচানো সম্ভব হয়েছে। কম সময়ে উচ্চফলনশীল ধান ও হাওড়ের উপযোগী রবিশস্য হতে পারে এখানে। বাংলাদেশ হাওড় ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড হাওড়ের উন্নয়ন সম্ভাবনা বিষয়ে কাজ করছে। সমন্বিত ও পরিকল্পিত উপায়ে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে অচিরেই পাল্টে যাবে হাওড়ের চেহারা। বলা যায়, বহুমাত্রিক সম্ভাবনায় এগিয়ে যাচ্ছে হাওড়।

প্রাকৃতিক কারণেই হাওড় অঞ্চলের মানুষ আধুনিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দরিদ্রতা,কুসংস্কার,শিক্ষার অভাব,সচেতনতার অভাব প্রভৃতি এই এলাকার মানুষের উন্নয়নের অন্তরায়। এখানকার মানুষ স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ মৌলিক অধিকারগুলো সহজে ভোগ করতে পারে না। যদিও সরকার এবং জনপ্রতিনিধিরা এই বিষয়ে কাজ করছে। ইতোমধ্যে হাওড় এলাকার মানুষের বাড়ি ঢেউয়ের কবল থেকে রক্ষা, উন্নত যোগাযোগের জন্য হাওড়ের উপযোগী করে রাস্তাঘাট নির্মাণসহ নানা বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। হাওর এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় সেই সত্তরের দশকে প্রথমে হাওড় বোর্ড গঠন হয়েছিল। ১৯৮২ সালে সেটি বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর ২০০১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় আবার ‘হাওড় ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড’ গঠন করা হয়। ২০১৪ সালের ১৭ নম্বেবর মন্ত্রিসভায় এই বোর্ডকে ‘অধিদফতর’-এ রূপান্তর করা হয়। এসব উদ্যোগে হাওড় অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য শেখ হাসিনার আন্তরিকতার বিষয়টি সহজেই বোঝা যায়। শুধু সহায়তার মধ্যেই সরকারের উদ্যোগ থেমে নেই। এর চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনী দলিল সংবিধানেও হাওড় ও জলাভূমি উন্নয়নের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনে ১৮(ক) অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যত নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন।’

হাওড়াঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদের ভা-ার। বাংলাদেশের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্ত সেই হারে বাড়ছে না সম্পদ। এই সমস্যা সমাধানে হাওর এলাকা বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শেখ হানিার সরকার হাওড়ের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা এই ছয়টি জেলার সংশ্লিষ্ট হাওরের ভূগর্ভস্থ ও ভূউপরস্থ পানির বর্তমান অবস্থা নিরূপণ এবং গাণিতিক মডেল প্রস্তুতে একটি প্রকল্প চলছে। প্রকল্পটি শেষ হওয়ার পথে। এতে সুপারিশ অনুযায়ী এলাকাভেদে প্রাকৃতিক পানির যুক্তিযুক্ত ব্যবহার সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত দেশের হাওড় ও নদীর জীববৈচিত্র্য ও এদের পারস্পরিক কাঠামো সম্পর্কিত একটি সমীক্ষা চলছে। এটি শেষ হবে ২০১৯ সালে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সকল জলাভূমির একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হবে। সেই লক্ষ্যে দেশের সাতটি জেলা- সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার দুই কোটি জনগণের উন্নয়ন চাহিদার ভিত্তিতে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। হাওড় এলাকার প্রয়োজন অনুযায়ী ১৭টি খাতে ১৫৪টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৬টি মন্ত্রণালয়ের ৩৮টি সংস্থা মহাপরিকল্পনায় বর্ণিত প্রকল্পগুলো তিন ধাপে- যথা : স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ২০১২ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। ইতোমধ্যে অর্ধেকের মতো প্রকল্পের কাজ চলছে।

আমি হাওড় এলাকার সন্তান। আমার জন্মস্থান কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলায়। উপজেলাটি দেশের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি ছিল। বিদ্যুত, যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ আধুনিকতার কোন উপকরণ স্পর্শ করেনি এই এলাকার মানুষকে। এক সময় মনে হতো এ যেন এক অন্য জগত। কিন্তু গত দশ বছরে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ডে এই উপজেলাটির চেহারাই পাল্টে গিয়েছে। আমূল পরিবর্তন এসেছে নদীবেষ্টিত নিকলী উপজেলায়। শেখ হাসিনা সরকারের ঐকান্তিক কল্যাণে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের এমপি আফজাল হোসেনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আজকের এই নিকলী-বাজিতপুর। এই অঞ্চলে আগাম বন্যা প্রতিরোধ এবং নিষ্কাশন উন্নয়ন প্রকল্পে হাওড়ের একমাত্র ফসল বোরো ধান রক্ষার্থে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার কাজ হয়েছে। এ ছাড়া Haor Flood Management and Livelihood Improvement Project-এর ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ, খাল খনন ও রেগুলেটরের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কাজ হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত, নদী ও খাল পুনর্খননেরও।

হাওড় মহাপরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে হাওড়ের সম্পদ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সম্ভব। হাওড় এলাকায় যাতায়াতের জন্য যে সকল ব্রিজ ও কালভার্ট রয়েছে তা দ্রুত সংস্কার এবং যে সব স্থানে নৌ-যাতায়াতের ব্যবস্থা রয়েছে তা আরও সমৃদ্ধ করা জরুরী। হাওড় এলাকার মানুষকে হাওড়ের মূল্যবোধ ও এর অস্তিত্ব রক্ষায় শিক্ষা ও মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকারকে কাজ করতে হবে। স্থানীয়ভাবে যুব সমাজকে সঙ্গে নিয়ে হাওড় ও জলাশয় রক্ষায় সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। শেখ হাসিনা যে ছোঁয়া রেখেছেন হাওড়কে কেন্দ্র করে তা প্রাণময় হয়ে উঠবেই।

লেখক : সাংবাদিক