২১ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুখে বাংলাদেশ অন্তরে পাকিস্তান

  • এএইচএম শহীদুল ইসলাম (ছুট্টু)

গত ৩০ মে ’১৮ ‘প্রথম আলো’ পত্রিকার ১১ পৃষ্ঠায় খন্দকার মাহবুব হোসেন কর্তৃক লিখিত ‘জিয়াউর রহমান...জাতীয়তাবাদের প্রেরণা’ শীর্ষক লেখা পড়ে আমার বক্তব্যগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আমার বক্তব্য অবশ্যই ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’, এই প্রেক্ষিতে দেখতে হবে, কারণ এই দুটি ধ্বনিই হলো ‘বাংলাদেশ’-এর মূলমন্ত্র। ১০ প্যারায় রচিত ঐ স্মূতিচারণের, প্যারাওয়ারী আমার বক্তব্যগুলো :

২৭ মার্চ ’৭১ মেজর জিয়ার ভাগ্যে যা জুটেছিল তা হলো ‘ঘটনাক্রমে’, ইংরেজীতে যাকে বলে By default. অন্য কোন মেজর সাহেব থাকলে তারও একই ভূমিকা পালন করতে হতো। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান ও অন্যদের সঙ্গে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে (যদিও প্রথমবার I hereby declare proclamation of independant Bangladesh বলে শুরু করছিলেন, কিছুক্ষণ পরই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতিবাদে ও চাপে ‘I on behalf of our great leader Sheikh Mujibur Rahman, hereby declare proclamation of independant Bangladesh বলতে বাধ্য হয়েছিলেন) স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করতেন। এখানে কোন মেজর সাহেবের ‘আবির্ভূত’ হওয়ার কিছু নেই। আর যদি কেউ বা কারা ভাবেন ‘আবির্ভাব’ হয়েছিল, তাহলে দেশের আনাচে-কানাচে আরও যত শত-সহস্র সামরিক-আধাসামরিক-বেসামরিক কর্মচারী-কর্মকর্তাদের যেমন ‘আবির্ভাব’ হয়েছিল, মেজর জিয়ারও তেমনি হয়েছিল।

প্যারা ২-এ উল্লেখ করেছেন- ‘সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে তিনি ফিরে যান নিজ পেশা সামরিক বাহিনীতে।’ এখানে গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের কোনকিছু নেই। এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। মেজর জিয়া ইচ্ছে করলে পদত্যাগ করে ব্যবসা-বাণিজ্য বা বেসরকারী চাকরিও করতে পারতেন। অনেকেই করেছেন। তারা কী অগণতান্ত্রিক কিছু করেছেন? তবে একজন সেক্টর কমা ার সামরিক বাহিনীতেই থেকে যাবেন এটিই প্রত্যাশিত ছিল। মেজর জিয়া তাই করছিলেন এবং ১৯৭২ সালেই সেনাবাহিনীর উপপ্রধান পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন।

প্যারা ৩-৬ এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৭৫ খ্রিঃ এর বঙ্গবন্ধু পরিবার ও অন্যান্যদের নির্মম হত্যাকাে র পর থেকে ’৭৬ খ্রিঃ এর নবেম্বর মাসে লেঃ জেঃ জিয়া কর্তৃক প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হওয়া এবং অবশেষে ’৭৭ খ্রিঃ এর এপ্রিল মাসে রাষ্ট্রপতি হওয়ার ঘটনা বিবৃত হয়েছে।

প্যারা ৭-এ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘বিধ্বস্ত গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইতিপূর্বে নিষিদ্ধ হওয়া সব রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি করার অনুমতি দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা’, ‘সংবাদমাধ্যম ও বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া’, ‘দেশে সুন্দর গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য জিয়ার ’৭৮ খ্রিঃ এর ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) গঠন করা এবং ঐ বছরই ১ সেপ্টেম্বর নতুন দল- বাংলাদেশ জাতীয়তাবদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করা’ বিষয়ে বর্ণনা করেছেন। লক্ষণীয়, তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠাকারীর দল গঠনের ৬ মাসের মধ্যেই দলের নাম থেকে ‘গণতান্ত্রিক’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়। এবার দেখা যাক, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়াটি কী ছিল। উনার উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হওয়া এবং অবশেষে ’৭৭ খ্রিঃ এর এপ্রিল মাসে রাষ্ট্রপতি হওয়ার ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, উনার অন্তরে ‘রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ’ ছিল তাও আবার ‘পাকিস্তান প্রীতি’র ভাবধারায়। ইতিমধ্যে সামরিক বাহিনীতে শত শত সৈনিক ও অফিসারদের বিরুদ্ধে ‘ক্যু’ সংঘটিত করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ফাঁসি ও ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদ কার্যকর করা হচ্ছিল। স্বয়ং রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং সেনা প্রধান হয়ে, প্রশাসনের কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিভিন্ন এজেন্সিকে নিয়োজিত করে রাজনৈতিক দল গঠন করা আইনসম্মত কিনা সেটিই এক বিরাট প্রশ্ন!

আমার তো মনে হয়, একটি Writ Petition এর মাধ্যমে এটি Challenge করা যায়। তাছাড়া ১৫ দশ সংশোধনীতে, জিয়াউর রহমানের সামরিক আইনের বলে কৃত সব কর্মকা অবৈধ ঘোষিত হওয়ায়, বিএনপি নামক দলের সৃষ্টি অবৈধ! রাজনৈতিক দল কিভাবে গঠন করা হয়? গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে, যে কেউ উদ্যোগী হয়ে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে উৎসাহীজনদের নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে। এতে যা খরচাপাতি হয় তা উদ্যোগীরা নিজ পকেট থেকে এবং জনগণ, প্রধানত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দল গঠনের খায়েশ, তা উনি পদত্যাগ করে আহ্বায়ক হয়ে করে দেখালে বোঝা যেত। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে, জাতীয় কোষাগারের কোটি কোটি অপচয় করে রাজনৈতিক দল গঠনের মধ্যে কৃতিত্বের কিছু নেই। এবার আসি উনার ‘ইতিপূর্বে নিষিদ্ধ হওয়া সব রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি করার অনুমতি দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা’ প্রসঙ্গে। অন্তরে ‘পাকিস্তানপ্রীতি’র ফলে, স্বাধীনতাবিরোধী মহলকে রাজনীতি করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য। আইন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেয়া, জেলে থাকা যুদ্ধাপরাধীদের মুক্ত করে দিয়ে, দেশকে পাকিস্তানী ভাবধারায় ফিরিয়ে নেয়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনারই অংশবিশেষ।

জিয়াউর রহমানের প্রতিটি কার্যকলাপ মুখে বাংলাদেশ অন্তরে ‘পাকিস্তান প্রীতি’র নমুনা। ভাবখানা ছিল আমি তো বঙ্গবন্ধু হত্যাকাে র সঙ্গে জড়িত নই, পরিস্থিতির কল্যাণে ক্ষমতায় আসতে হয়েছে।

এটা কিছুটা হলেও ধর্তব্যের মধ্যে আনা যেত যদি রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ‘৫ম সংশোধনী’ জারি করার পূর্বে, নিম্নলিখিত কাজগুলো করে নিতেন:

১. ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ কালরাতে বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবার ও অন্যান্যদের নির্মমভাবে হত্যাকারী আত্মস্বীকৃত খুনীদের কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ বাতিল করে খুনীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা;

২. বেতার-টিভিতে নিষিদ্ধ হওয়া বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ পুনঃপ্রচার শুরু করা;

৩. বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতির পিতা’ ও ‘জয় বাংলা’ কে রণধ্বনি হিসেবে পুনর্জীবিত করে, বেতার-টিভিতে পুনঃপ্রচার শুরু করা;

৪. ‘রেডিও বাংলাদেশ’ কে ‘বাংলাদেশ বেতার’ নামে পুনর্জীবিত করা;

৫. বিমানের ‘ঢাকা-করাচী-ঢাকা’ রুট বাতিল করে, পাকিস্তানের কাছে ওদের সামরিক বাহিনীকৃত ঘৃণ্য মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি করা;

৬. পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা সম্পদ দাবি করা;

উপরের ঘটনাগুলোকে জিয়ার দল, ‘খুনী মোশতাক’ সরকারের কৃতকর্ম বলে চালানোর অপচেষ্টা করে। মাধ্যমিকের গি পেরনো একটি কিশোর/কিশোরীও বুঝে যে, হৃদয়ে ‘প্যায়ারে পাকিস্তান’ থাকার ফলে, তার দলের প্রতিষ্ঠাতার পক্ষে ওসব কিছুই করা সম্ভব ছিল না। বরং, রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ‘৫ম সংশোধনী’ জারি করার সময়, কারাগারে থাকা ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল’-এর আওতায় দ প্রাপ্ত ও বিচারাধীন ‘যুদ্ধাপরাধীদের’ মুক্তি দিয়ে ও বিচারের পথ রুদ্ধ করে দিয়ে এবং স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যাতে আবার রাজনীতি করার সুযোগ পায়, সেই ব্যবস্থা করে, অন্তরের গভীরে লালিত ‘প্যায়ারে পাকিস্তান’ মনষ্কামনা বাস্তবায়িত করেছেন। ফলে, তার স্ত্রী, পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে, ‘যুদ্ধাপরাধীদের’ নেতাদের ‘মন্ত্রী’ বানিয়ে, ওদের গাড়িতে ও বাসভবনে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে, পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তার (Maj Gen Iftikhar Khan Janjua) মৃত্যুতে সরকারী ‘শোকবার্তা’ পাঠিয়ে ‘দেশদ্রোহে’র (Sedition) মতো অপকর্ম করেছেন। এ জন্য একটি বা দুটি ‘দেশদ্রোহে’র মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

ahmshahidul@gmail.com