২১ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভোটযুদ্ধে প্রচারে সোশ্যাল মিডিয়া এবার বড় হাতিয়ার

  • ভোটারদের কাছে পৌঁছার সহজ উপায়

ফিরোজ মান্না ॥ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভোটের প্রচার এখন মূল হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব দলের প্রার্থীরাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেসবুক, টুইটার, ভাইবার, হোয়াটসএ্যাপ, স্কাইপে, ইমো ব্যবহার করে প্রচারে অংশ নিচ্ছেন। কোন কোন প্রার্থী এসব মাধ্যমে ভয়েস মেইল ও ভিডিও পাঠিয়ে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচনী প্রচারে এটি এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। এ সব মাধ্যম ব্যবহার করতে খুব একটা টাকাও খরচ হচ্ছে না। শুধু ইন্টারনেট বিল গুনতে হচ্ছে। তাছাড়া মাধ্যমগুলো ব্যবহারে নিরাপত্তা রয়েছে। দীর্র্ঘদিন ‘কনটেন্ট’ গুলো দীর্ঘস্থায়ী। সহজে চলে যায় না। যদি কোন অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র না থাকে তাহলে প্রার্থীরা মাধ্যমগুলো সহজেই ব্যবহার করতে পারছেন।

প্রথমদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের উদ্যোগ প্রার্থী এককভাবে নিলেও এখন দলীয়ভাবে প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এজন্য আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণও দেয়া হয় দলীয় নেতাকর্মীদের। সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে প্রচারযুদ্ধে সবার দৃষ্টি থাকবে সোশ্যাল মিডিয়ার দিকেই। এই মিডিয়াই হবে এবারের ভোটে মানুষের কাছে পৌঁছানোর বড় সুযোগ।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রার্থীদের সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছিল। তাছাড়া প্রার্থীর কর্মী সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নিজ প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগের যে কোন মাধ্যম খুললেই চোখে পড়বে বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের প্রচার। কোন কোন প্রার্থী নির্বাচনী সভা সরাসরি ফেসবুকে ‘লাইভ’ করছেন। আবার কোন কোন প্রার্থী জনগণের কাছে আবেদনময়ী বক্তব্য দিয়ে ভিডিও পোস্ট করছেন।

বিএনপি-জামায়াতও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে প্রচারের বড় হাতিয়ার মনে করছে। কারণ তারা নির্বাচনের মাঠে খুব একটা নেই। অনেক এলাকায় বিএনপির পোস্টার ও মাইক নিয়ে প্রচার নেই বললেই চলে। ফলে তারা সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর বেশি ভর করেছেন। এভাবেই নির্বাচন সামনে রেখে সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারযুদ্ধের মহাসড়কে পরিণত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগাচ্ছে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছে শুধু নির্বাচনকে টার্গেট করে নয়। তারা যে দীর্ঘদিন ধরে কোণ্ঠাসা অবস্থায় ছিল- সেই দশা থেকে বের হওয়ার জন্য তাদের একটি বড় সাইবার গ্রুপ তৈরি করেছে। এই গ্রুপ দিনরাত তাদের নির্বাচনী প্রচারসহ তাদের আদর্শের কথাও জানান দিচ্ছে।

তবে একটি ব্যতিক্রমী ধারাও রয়েছে, জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের তেমন কোন উদ্যোগ নেই। খুব কম প্রার্থীই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার কাজ করছেন। দলটির কয়েকজন নেতা বলেছেন, তারাও সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হবেন। কারণ নির্বাচনী প্রচারে এই মাধ্যমগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

তথ্যপ্রযুক্তিবিদরা বলেছেন, এবারের নির্বাচনের মতো আগামীতে আরও যে সব নির্বাচন হবে তাতেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব বেশি থাকবে। কারণ মানুষ এখন আর গতানুগতিক প্রচার চায় না। কিছুটা ভিন্ন মাত্রায় নির্বাচনী প্রচার হলে মানুষ তা গ্রহণ করবে। পথে ঘাটে হাটে বাজারে মাইকে বিকট শব্দ ব্যবহার এখন আর মানুষ পচ্ছন্দ করে না। মানুষের রুচির সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই প্রার্থীদের প্রচার কাজ চালাতে হবে। তাছাড়া সামাজিক যোগাযোগের কার্যকারিতা, সহজলভ্যতা এবং বিশ্বনেতাদের নির্বাচনী জয়ে এর ভূমিকা নিয়ে গবেষণার ফল বিবেচনা করে ডিজিটাল মিডিয়াকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। খুব নিকটেই ঘটে যাওয়া আমেরিকার নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের ভূমিকার উদাহরণ টেনে তারা বলেন, সময় অনেক বদলে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থী ও ভোটারও পরিবর্তন হয়েছে। তাই পরিবর্তন হতে বাধ্য। এই মিডিয়া ব্যবহার করে অপপ্রচারও চলবে সমান তালে। তা মোকাবেলা করার জন্য সংশ্লিষ্ট দফতর ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সচেতন থাকতে হবে।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন প্রচার চালানোর ওপর জোর দেয়ার পর এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন ১৩৪ এমপি। আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ এ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) এক কর্মশালায় সংসদ সদস্যদের এ প্রশিক্ষণ দেয়। এতে ‘সরকারবিরোধী অপপ্রচারের’ জবাব দিতে আওয়ামী লীগের এমপিদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। কর্মশালায় এমপিদের নামে খোলা অবৈধ ফেসবুক পেজ বা এ্যাকাউন্ট বন্ধ করা, ব্যক্তিগত এ্যাকাউন্ট সঠিকভাবে পরিচালনা করা, এ্যাকাউন্ট ব্যবহারের নিয়মাবলি, এ্যাকাউন্ট ভেরিফাইড করার পদ্ধতি এবং নিয়মিত উন্নয়নমূলক কাজের কথা প্রচার করার বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছিল।

ওই সময়ের প্রশিক্ষণই এখন নির্বাচনী প্রচারে দলটির প্রার্থীরা ব্যবহার করছেন। একই সঙ্গে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভোট প্রার্থনা করছেন, আবার গত ১০ বছরে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- তুলে ধরছেন। কর্মশালায় এমপিদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কার্যকর ব্যবহার সম্পর্কে শেখানো হয়। এই মাধ্যম ব্যবহার করে কিভাবে সরকারের গ্রহণ করা গত ১০ বছরের উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের কথা ছড়িয়ে দেয়া যায়, সে বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। আওয়ামী লীগ প্রার্র্থীরা বিএনপি-জামায়াতের ক্ষমতার সময়কার চিত্র তুলে ধরছেন। একই সঙ্গে নির্বাচনে নিজেদের ভোট প্রার্থনা করে যাচ্ছেন।

তথ্যপ্রযুক্তিবিদরা জানিয়েছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প, বারাক ওবামা, জাস্টিন ট্রুডো, নরেন্দ্র মোদিসহ বিশ্বনেতাদের নির্বাচনে জয়লাভে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে সোশ্যাল মিডিয়া। বিপুলসংখ্যক মানুষ ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছেন। বড় একটা সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যস্ত থাকছেন। অনলাইনে পত্রিকা পড়ছেন, টিভি দেখছেন। নির্বাচনে এ সুযোগটাকে কাজে লাগানো হচ্ছে। অনলাইন কনটেন্ট টেকসই। এটি হারিয়ে যায় না। অনলাইন কনটেন্ট শক্তিশালী, এটি মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এটি ছড়িয়ে দেয়া যায় সহজে। পত্রিকা বা টেলিভিশনে যা থাকে না। অবশ্য এখন পত্রিকা বা টেলিভিশনগুলোরও অনলাইন ভার্সন রয়েছে। তারপরও নির্বাচনী প্রচারে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।