১৬ ডিসেম্বর ২০১৮

বিজয়ের আনন্দে রঙিন নগরীর সংস্কৃতি ভুবন

 বিজয়ের আনন্দে  রঙিন নগরীর  সংস্কৃতি ভুবন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বিজয় দিবসের সকাল থেকেই যেন রঙিন ক্যানভাসে পরিণত হয় শহর ঢাকা। নগরের চারপাশে দেখা গেছে বর্ণময়তার দৃশ্যকাব্য। নগরবাসী পথিকের সূত্র ধরে পথে পথে বয়ে গেছে আনন্দের ফল্গুধারা। বাঙালীর জাতিসত্তার প্রকাশের দিনটিতে দারুণ সরব ছিল নগরের সংস্কৃতি ভুবন। সেসব আয়োজনে স্মরণ করা হয়েছে স্বাধীনতার জন্য প্রাণ সঁপে দেয়া শহীদদের। ভালবাসা জানানো হয়েছে পূর্ব দিগন্তে সূর্য ওঠানো নতুন দেশের স্বপ্ন আঁকা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। দিনভর উচ্চারিত হয়েছে জয় বাংলার গান। বিশেষ দিনটিতে যেন নতুন করে খোঁজা হয়েছে স্বাধীনতা শব্দটির তাৎপর্য। স্বদেশের প্রতি ভালবাসায় বর্ণিল হয়েছে ঢাকার পথ-প্রান্তরসহ নানা মঞ্চ কিংবা মিলনায়তন। এসব আয়োজনে বিশিষ্টজনদের আলোচনা, নৃত্য, গীত ও কবিতার ছন্দে, নাটকের সংলাপে কিংবা শিল্পীর মনন আশ্রিত চিত্রকর্মের মাধ্যমে জানানো হয়েছে জাতির সূর্য সন্তানদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। রবিবার বিজয় দিবসে নগরের রাজধানীর মঞ্চে মঞ্চে অনুষ্ঠিত সেসব আয়োজনের কথা তুলে ধরা হলো এ প্রতিবেদনে।

বিজয় দিবস উপলক্ষে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজন করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা জাদুঘর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ নাসির উদ্দিন আহমেদ। আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদ, মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নিজাম উদ্দিন ও আব্দুল মান্নান ইলিয়াস প্রমুখ।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী নন্দিতা ও ইউসুফ। ইউসুফ গেয়ে শোনান ‘যে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে লক্ষ মুক্তিসেনা’, ‘সূর্যোদয়ে তুমি, সূর্যাস্তেও তুমি’, ‘এক তাজমহল গড়ে হৃদয়ে তোমার’ ও ‘আমাকে পোড়াতে যদি এত লাগে ভালো’। নন্দিতা গেয়ে শোনান ‘এ সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়’, ‘কিছুক্ষণ আর না হয় রহিতে কাছে’ ও ‘আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাব’। এরপর সম্মেলক নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পকলা একাডেুিমর নৃত্যশিল্পীরা। অনুষ্ঠানে আরও সঙ্গীত পরিবেশন করেন রেজওয়ান ও সমীর দেওয়ান।

পৌষের সন্ধ্যায় রঙিন হয়ে ওঠে শিল্পকলা একাডেমির নন্দন মঞ্চ। একাডেমির নন্দন মঞ্চে অনুষ্ঠিত ‘বিজয় নিশান ঊড়ছে ঐ’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী আয়োজনের শেষ দিন ছিল রবিবার। নৃত্য-গীত ও কবিতাপাঠের সঙ্গে পরিবেশিত হয়েছে মনোমুগ্ধকর এ্যাক্রোবেটিক। ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা’ গানের সুরে একাডেমির শিল্পীদের নাচের আশ্রয়ে শুরু হয় আয়োজন। এরপর ‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য’ গানের তালে নাচ করে সোহেল রহমানের পরিচালনায় এক ঝাঁক নৃত্যশিল্পী। এম আর ওয়াসেকের পরিচালনায় ‘এগিয়ে যাব বাধা মানি না’ গানের সুরে পরিবেশিত হয় সমবেত নৃত্য। এয়াড়াও ‘বুকের ভিতর আকাশ নিয়ে’ গানের সুরে বৃন্দ নাচ করে একাডেমির শিল্পীরা। সম্মেলক কণ্ঠে ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’ ও ‘এ মাটি নয় জঙ্গীবাদের’ শিরোনামের সঙ্গীত পরিবেশন করে একাডেমির কল্কশিল্পীরা। ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীরা গেয়ে শোনায় ‘ভয় নেই কোন ভয় জয় বাংলার জয়’ ও ‘ভয় কি মরণে’। এয়াড়াও সম্মেলক সঙ্গীত পরিবেশন করে সতেন্য সেন শিল্পীগোষ্ঠী। স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন বরেণ্য কবি নির্মলেন্দু গুণ। একক কণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদায়ী গান শুনিয়েছেন প্রিয়াঙ্কা প্রিয়া, বর্ণালী সরকার, আরিফুর রহমান পলাশ, কৃষ্ণকলি ও মিরাজুল জান্নাত সোনিয়া। শারীরিক কৌশলের নান্দনিকতা উপস্থাপনায় এ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শন করেন একাডেমির এ্যাক্রোবেটিক দল।

বিজয় দিবসের বিকেলে শহীদ মিনার আঙিনায় বয়ে যায় প্রাণের স্পন্দন। সংস্কৃতিকে ভালবাসা সেই মানুষের স্পন্দনে মুখরিত হয়ে ওঠে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত বিজয় উৎসব। ‘স্বাধীনতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের দিন শেষ/ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে যাবেই বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে এদিন রাজধানীর সাত মঞ্চে চলছে জোটের বিজয় উৎসব। কচিকণ্ঠে সুকুমার রায়ের লেখা কবিতার শিল্পিত উচ্চারণে শুরু হয় শহীদ মিনার মঞ্চের আয়োজন। শিশু সংগঠন শিল্পবৃত্তের খুদে শিল্পীরা সম্মেলক কণ্ঠে পাঠ করে ‘কাছের লোক’ শিরোনামের কবিতা। এরপর মঞ্চে আসে স্বভূমি লেখক কেন্দ্রের শিল্পীরা। সম্মেলক কণ্ঠে পরিবেশিত হয় ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রীস্টান, বাংলার মুসলমান-আমরা সবাই বাঙালী’ ও ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে’। একক কণ্ঠে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী মনোরঞ্জন ঘোষণা শুনিয়েছেন ‘সোনায় মোড়ানো বাংলা মোদের শ্মশান করেছে কে’।

বিকেল থেকে রাত অবধি চলা জোটের উৎসবে দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, স্বভূমি লেখক শিল্পী কেন্দ্র, আনন্দ ও ভিন্নধারার শিল্পীরা। একক কণ্ঠে সুর ছড়িয়েছেন রিনা ফেরদৌসী, রত্না সরকার, আসিফ ইকবাল সৌরভ ও সারোয়ার হোসেন পাপ্প। কবিতার শিল্পিত উচ্চারণে দলীয় আবৃত্তি পরিবেশন করে শ্রুতিঘর, স্বরশ্রুতি ও ঢাকা স্বরকল্পনের বাচিকশিল্পীরা। একক কণ্ঠের আবৃত্তি পরিবেশন করেন বেলায়েত হোসেন, হাসান আরিফ, শিমূল মুস্তাফা, ফয়জুল্লাহ সাঈদ ও মীর মাসরুর জামান রনি। শিশু সংগঠনের পরিবেশনায় অংশ নেয় মৈত্রী চিলড্রেন থিয়েটার ও রঙ্গপীঠ শিশুদল। সমবেত নাচ করে নৃত্যাক্ষ ও কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের নৃত্যশিল্পীরা। সব শেষে ছিল নাট্যদল উৎস ও মৈত্রী থিয়েটারের পথনাটক পরিবেশনা।

বিজয় দিবসের বিকেলে বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে ছিল একক বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। ‘বিজয় কথা’ শীর্ষক একক বক্তৃতা করেন অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন।

একক বক্তৃতায় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধ কোন আকস্মিকতার ফল নয় বরং ইতিহাসের এক অনিবার্য ধারবাহিকতার নাম। ১৯৪৭ সালেই ১৯৭১-এর বীজ রোপিত হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রে তাৎপর্যের দিক হচ্ছে পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে আমরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনা করেছি। এর মধ্য দিয়ে আমরা বিবেকী বিশ্বের সমর্থন অর্জন করেছি। ষাটের দশকের বিশ্বব্যাপ্ত বুদ্ধির মুক্তি ও জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের আভায় আমরা স্নাত হয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল গণতান্ত্রিক এবং আলোক-অভিসারী।

তিনি বলেন, একাত্তরে বিজয়ী বাংলাদেশ আজ নানাক্ষেত্রেই বিস্ময়কর অগ্রগতির অধিকারী। তবু আমাদের আত্মসমালোচনার জায়গাও রয়েছে। এখনও শ্রেণীবৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়নি, এখনও আমরা মানববান্ধব আইন ও বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি, এখনও শিক্ষার যথাযথ মান নিশ্চিত করতে পারিনি। এ অবস্থার অবসানকল্পে আমাদের সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের সত্যের মধ্য দিয়ে আত্মশক্তিতে জাগ্রত হয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

আনিসুজ্জামান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদকে স্মরণের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক পরিম-লকেও স্মরণে রাখতে হবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পোল্যান্ডের আন্তরিক সহযোগিতার কথা কোনদিনই বিস্মৃত হবার নয়। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ যেমন মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয়কে সম্ভব করে তুলেছে তেমনি আজ দেশকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষের ভূমিকাই সর্বাগ্রে স্মরণীয়।

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী অনামিকা ত্রিপুরা, এ এম এম মহিউজ্জামান চৌধুরী, মোঃ রেজওয়ান আহমেদ এবং ফারহানা শিরিন।

‘তরুণের হাতে মুক্তির দায়ভার : স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী হোক স্বদেশের সুবর্ণ সময়’ প্রতিপাদ্যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আয়োজনে সপ্তাহব্যাপী মানবাধিকার দিবস থেকে বিজয় দিবস শীর্ষক সপ্তাহব্যাপী বিজয় উৎসবের শেষ দিন ছিল রবিবার। সকালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে শিশু-কিশোর আনন্দানুষ্ঠান পরিবেশন করে সোসাইটি ফর দি ওয়েলফেয়ার অব অটিস্টিক চিল্ডড্রেন, কল্পরেখা, খেলাঘর, মৈত্রী শিশুদল, বাড্ডা আলাতুন্নেসা স্কুল এ্যান্ড কলেজ, নৃত্যজন, ইউসেপ স্কুল ও বধ্যভূমির সন্তানদল। সন্ধ্যায় মানিকগঞ্জের চারণিক অপেরা পরিবেশন করে যাত্রাপালা ‘গঙ্গা থেকে বুড়িগঙ্গা’।

এর পাশাপাশি মিরপুরে জল্লাদখানা বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠ প্রাঙ্গণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে চারুলতা একাডেমি, কোমল কুঁড়ি সঙ্গীত একাডেমি, মিথস্ক্রিয়া আবৃত্তি পরিষদ, বধ্যভূমির সন্তানদল, তরঙ্গ একাডেমি, যুব বান্ধব কেন্দ্র (বাপসা) ও মিরপুর সাংস্কৃতিক ঐক্য ফোরাম।

বিজয় দিবসে চ্যানেল আই চত্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘বিজয় মেলা’। মেলায় দেশের গান পরিবেশন করেন ফকির আলমগীর, ফরিদা পারভীন, নীলু বিলাহ, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, দিনাত জামান মুন্নী, ড. অরূপ রতন চৌধুরী, অনিমা রায়, কোনাল প্রমুখ। সম্মেলক সঙ্গীত পরিবেশন করে সুর বিহার ও সুরের ধারা। গাজী আবদুল হাকিম বাঁশিতে বাজিয়ে শোনান দেশের গানের সুর। মঞ্চস্থ হয় রেজানুর রহমান পরিচালিত নাটক ‘পোস্ট মাস্টার’। কবিতা আবৃত্তি করেন মাহিদুল ইসলাম। ছিল চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে শিশু কিশোরদের অংশগ্রহণে বিজয় দিবসের চিত্রাঙ্কন পর্ব। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেছেন মেলায় আগত বিভিন্ন শ্রেণীপেশার বিশিষ্টজনরা।

বিজয় দিবসে কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা নিজস্ব মিলনায়তনে আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ ও আনন্দানুষ্ঠানের। অনুুষ্ঠানে শিশু-কিশোরদের মুক্তিযুদ্ধের কথা শোনান অধ্যাপক ড. মেঘনা গুহ ঠাকুরতা, মেলার সহ-সভাপতি কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন, মেলার সভাপতি খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এবং শিশু বক্তা ফাহরিন শাহান ছড়া। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করে মেলার ছোট্ট বোন ফারমিহা আহমেদ শ্রেষ্ঠা।