১৯ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এগিয়ে বাংলাদেশ

এটা কোন নতুন কথা নয় এবং বিস্ময়েরও বটে যে, বাংলাদেশ প্রায় সব সূচকে এগিয়ে আছে পাকিস্তান থেকে। অথচ ৪৭ বছর আগেও বাংলাদেশ তথা পূর্ব পাকিস্তান ছিল পাকিস্তানের শাসিত একটি প্রদেশ। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলে তথাকথিত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও দেশটিতে সুশাসন, সমতা ও ন্যায়বিচার কখনই প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী জাতির ইতিহাস ছিল ক্রমাগত শোষণ-বঞ্চনা, অপশাসন ও দুঃশাসনের ইতিবৃত্ত। বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতির এই আত্মপোলব্ধি হতে খুব বেশি সময় লাগেনি এবং অচিরেই তারা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তানের স্বৈরাচারী ও সামরিক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গড়ে তোলে দুর্বার আন্দোলন। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে বাঙালীর স্বাধীনতা অর্জনেও তেমন সময় লাগেনি। অতঃপর বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতির শুধুই সামনে এগিয়ে যাবার পালা এবং একইসঙ্গে ইতিবাচক সব অর্জন উন্নয়নের নানা সূচকে।

অকপটে স্বীকার করতে হবে যে, বাঙালীর এই অর্জন কোন অংশেই কম নয়, বরং নিয়মিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানব উন্নয়ন, গড় আয়ু বৃদ্ধি, খাদ্য উৎপাদন, মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, শান্তি-শৃঙ্খলা সব কিছুতেই এবং সব সূচকেই বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে পাকিস্তানের চেয়ে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ভাষায়, দেশটি এখন বৈশ্বিক মানচিত্রে উন্নয়নের রোল মডেল। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো এমনকি পাকিস্তানও এখন অনুসরণ ও অনুকরণ করতে পারে বাংলাদেশকে। বিশ্বখ্যাত সাপ্তাহিক দ্য ইকোনমিস্ট ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছে, মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ছাড়িয়ে গেছে পাকিস্তানকে। ২০১৭-এর জুনে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল এক হাজার ৫৩৮ মার্কিন ডলার। পাকিস্তানের এক হাজার ৪৭০ ডরার। বাংলাদেশের চেয়ে ৬৮ ডলার কম। উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় আরও বেড়েছে। বাংলাদেশ গত এক দশক ধরে ৬ শতাংশের বেশি হারে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। গত তিন বছরে তা ছাড়িয়ে গেছে ৭ শতাংশের ওপরে। অচিরেই তা ৮ ও ততোধিক হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা ২০২১ সাল নাগাদ তা ১০ শতাংশে উন্নীত করা। আর পাকিস্তানের জাতীয় প্রবৃদ্ধি আটকে আছে ৬-৭ শতাংশের নিচে। তৈরি পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য আসলেই ঈর্ষণীয়। পাকিস্তান ও ভারত মিলে বিশ্ববাজারে যে পরিমাণ গার্মেন্টস সামগ্রী রফতানি করে, বাংলাদেশ একাই রফতানি করে থাকে তার চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৪ শতাংশ। পাকিস্তানে ২.৪ শতাংশ। আর্থ-সামাজিক প্রায় সব সূচকেই বাংলাদেশ এগিয়ে পাকিস্তানের চেয়ে। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২.৬ বছর। পাকিস্তানের ৬৬ বছর। বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৩১, পাকিস্তানে ৬৬। বাংলাদেশে মাধ্যমিক শিক্ষার হার ৪২ শতাংশ। পাকিস্তানে তা অর্ধেকেরও কম ২০ শতাংশ। শান্তিপূর্ণ দেশের তালিকায় পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে বাংলাদেশ। এই তালিকায় ১৬৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৩তম, পাকিস্তানের অবস্থান ১৫৩তম। আর ভারতের ১৪১তম। তদুপরি পাকিস্তান বর্তমানে জর্জরিত ধর্মীয় মৌলবাদ, কূপম-ূকতা, জাতিগত বিদ্বেষ, তালেবান, আইএস, জইশ-ই মোহাম্মদসহ অসংখ্য জঙ্গীগোষ্ঠী ও উপজাতি দ্বন্দ্ব-সংঘাত-হানাহানি ও রক্তক্ষয়ী ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে। বিশ্বে পাকিস্তান একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে সুপরিচিত।

তথাকথিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক আর্থিক ঋণ প্রত্যাহৃত হওয়ার পর বাংলাদেশ চীনের সহায়তায় পদ্মা সেতু নির্মাণ করছে স্ব-উদ্যোগে ও স্ব-অর্থায়নে। রূপপুরে রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মাণ করছে পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র। অন্যদিকে ক্রমাগত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে পাকিস্তানের অর্থনীতি ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, ভগ্নদশাপ্রাপ্ত, দেউলিয়া। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ঘোষণা করেছে তারা পাকিস্তানকে আর এক ডলারও সাহায্য দেবে না। চীনের ঋণেও পাকিস্তান আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। আর তাই সেনাবাহিনীর সহায়তায় নবনির্বাচিত সরকারপ্রধানকে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ছুটতে হয়েছে সৌদি আরবে। সে অবস্থায় পাকিস্তান যদি অচিরেই একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ও পরিগণিত হয় বিশ্ব মানচিত্রে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।