২১ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা-ভাবনা ও শিক্ষাক্ষেত্রে অর্জন

  • ড. হারুন-অর-রশিদ

শিক্ষা আলোকবর্তিকাস্বরূপ। শিক্ষা উন্নয়নের সোপান। শিক্ষা জাতির মেরুদ-। শিক্ষিত কোন জাতি অনুন্নত বা পশ্চাৎপদ থেকেছে এমন নজির কোথাও নেই। শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীর নিজেকে, তার পরিবেশ-প্রতিবেশ, মানুষ, সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি, শিল্পকলা, দেশ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, মানুষের জীবন সংগ্রাম, মানব সভ্যতা ইত্যাদি সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেয়। শিক্ষা একজন মানুষকে সচেতন, সংবেদনশীল, নৈতিক, সৃষ্টিশীল, আত্মপ্রত্যয়ী ও মানবিক গুণে গুণান্বিত করে তোলে। তবে এর জন্য থাকা চাই সুশিক্ষা বা সত্যিকার শিক্ষা। আর সুশিক্ষার মূলে থাকে দেশ, মানুষ ও মানবকল্যাণ। অন্য কথায়, ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য’-এ আদর্শ। এ সকল ব্যতীত যে শিক্ষা তা শিক্ষার নামে কুশিক্ষা বা খ-িত শিক্ষা। তেমন শিক্ষা কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা এমনকি জঙ্গীবাদের পথ খুলে দেয়। পাকিস্তানী শাসন আমলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালীর জাতীয় মুক্তির সংগ্রামের মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালীদের জন্য একটি গণতান্ত্রিক, মানবকল্যাণকামী, অসাম্প্রদায়িক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। শাসকগোষ্ঠীর ঔপনিবেশিক ধাঁচের প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষানীতিবিরোধী বাংলার ছাত্র-সমাজের শিক্ষা আন্দোলন জাতীয় মুক্তির বৃহত্তর আন্দোলনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু শুধু স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নই দেখেননি, তিনি একটি উন্নত-সমৃদ্ধ সুখী বাংলাদেশ, তাঁর কথায়, ‘সোনার বাংলার’ স্বপ্নও দেখেছিলেন। তিনি বলতেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই।’ অর্থাৎ দক্ষ, যোগ্য, অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক, আধুনিক, শিক্ষিত সন্তান বা মানবসম্পদ। আর তা সৃষ্টির জন্য থাকা চাই সত্যিকার মানুষ গড়ার শিক্ষা বা সুশিক্ষা।

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা-ভাবনা

বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নকালে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ’৭২-এর সংবিধানে ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ অংশে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা-ভাবনা অন্তর্ভুক্ত করে ঐ সংবিধান প্রণীত হয়। এতে বলা হয়:

‘১৭। রাষ্ট্র

(ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য, (খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য, (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।’

পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষে দেশবাসীর উদ্দেশে বঙ্গবন্ধুর দেয়া বেতার-টেলিভিশন ভাষণ থেকে আমরা তাঁর শিক্ষা-ভাবনা সম্বন্ধে সম্যক ধারণা পাই। ভাষণে তিনি বলেছিলেন, সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষাখাতে পুঁজি বিনিয়োগের চাইতে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর কিছু হতে পারে না।... নিরক্ষরতা অবশ্যই দূর করতে হবে। ৫ বছর বয়স্ক শিশুদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষাদানের জন্য একটা ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ চালু করতে হবে। মাধ্যমিক শিক্ষার দ্বার সকল শ্রেণীর জন্য খোলা রাখতে হবে। দ্রুত মেডিক্যাল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়সহ নয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দারিদ্র্য যাতে উচ্চশিক্ষার জন্য মেধাবী ছাত্রদের অভিশাপ হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের প্রথম বার্ষিক সম্মেলন উদ্বোধনকালে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও নারী শিক্ষা সম্বন্ধে বলেন, ‘শতকরা ২০ জন শিক্ষিতের দেশে নারীর সংখ্যা আরও নগণ্য। ... ক, খ, শিখলেই শিক্ষিত হয় না, সত্যিকারের আলোক প্রাপ্ত হইতে হইবে।’

এ-সব উৎস থেকে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা-ভাবনার যে মৌলিক বিষয়গুলো জানা যায়, তা হচ্ছেÑ

* সুষ্ঠু দেশ-জাতি-সমাজ গড়তে শিক্ষার অপরিহার্যতা; * শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যয় ভবিষ্যতের জন্য শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ; * নারীশিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ; * শিক্ষা হবে অভিন্ন, গণমুখী ও সর্বজনীন বা সবার জন্য শিক্ষা; * কেউ নিরক্ষর থাকবে না, সকলেই হবে সাক্ষর; নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূরীকরণ; * নির্দিষ্ট শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা হবে অবৈতনিক ও সকলের জন্য বাধ্যতামূলক; * পাঁচ বছর বয়সী সকল শিশুর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গমন নিশ্চিত করতে ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ গ্রহণ; * স্বাধীন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হবে সমাজ চাহিদা ও জাতীয় প্রয়োজন পূরণে সক্ষম আলোকিত মানুষ তৈরি করা; * সবার জন্য অন্তত মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত রাখা; * নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা; মেডিক্যাল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ; * অর্থাভাবে কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষা লাভ যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখা; এবং * শিক্ষা ক্ষেত্রে মেধার লালন ও পৃষ্ঠপোষকতা দান করা।

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ আর ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি সত্ত্বেও স্বাধীনতার পরপর শিক্ষাক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু সরকার অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে:

* ৪০ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ ও কয়েক লাখ শিক্ষককে সরকারী কর্মচারীর মর্যাদা দান; * ১১ হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বহু স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা; * বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ওপর সরকারী নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ১৯৬২ সালে আইয়ুব সরকার প্রণীত অধ্যাদেশ (যা ‘কালো আইন’ নামে অভিহিত) বাতিল করে ১৯৭৩ সালের গণতান্ত্রিক আদেশ জারি; এবং * সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত নীতির আলোকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিজ্ঞানভিত্তিক, গণমুখী ও যুগোপযোগী করে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে ড. খুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন।

বঙ্গবন্ধু তাঁর চিন্তা ও আদর্শের আলোকে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে গড়ে তোলার সুযোগ বেশিদিন পাননি। তিনি সরকার ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনেক কিছু শুরু করেছিলেন এবং সেসবের ভিত্তিও রচনা করেছিলেন। এরই মধ্যে সংঘটিত হয় আগস্টের ট্র্যাজেডি। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত দেশী-বিদেশী শত্রুদের গভীর ষড়যন্ত্রের ফলে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের উপস্থিত সকল সদস্যসহ অত্যন্ত নির্মম-নিষ্ঠুরভাবে তাঁকে জীবন দিতে হয়।

শেখ হাসিনা সরকারের অর্জন

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ৬ বছর বিদেশের মাটিতে নির্বাসিত জীবন-যাপনে বাধ্য হয়ে অতঃপর ১৯৮১ সালে চরম প্রতিকূল অবস্থা ও নিজ জীবনের প্রতি হুমকি উপেক্ষা করে দেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। তখন জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন। নির্বাসনে থাকাকালে তিনি বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। দেশে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি সংগঠনের নেতৃত্বের গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

মুখ্যত তাঁরই নেতৃত্বে দেশ দীর্ঘ সেনাশাসনের কবল থেকে মুক্ত হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম শেষে তাঁর নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠনে সক্ষম হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ তিন দফায় (১৯৯৬-২০০১, ২০০৯-২০১৪ ও ২০১৪-২০১৮) মোট ১৫ বছর দেশ পরিচালনার সুযোগ পায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের রয়েছে যুগান্তকারী অর্জন। সে সবের মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার, সংসদীয় ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণে বিভিন্ন পদক্ষেপ, কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ (২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫) বাতিল (১২ নবেম্বর ১৯৯৬) করে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচার অনুষ্ঠান ও রায় কার্যকর করা, ৭১-এর স্বাধীনতা ও মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকর করা, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে তাঁর সন্ত্রাসবিরোধী শান্তি সমাবেশে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসী-জঙ্গীগোষ্ঠীর গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত ও কয়েকশ’ লোক আহত হওয়ার ঘটনায় জড়িতদের আইনের আশ্রয় এনে বিচারের ব্যবস্থা, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি (১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬), পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি (২ ডিসেম্বর ১৯৯৭), খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, অক্ষম-দুস্থদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বিধান, গ্রামীণ জনগণের স্বাস্থ্যসেবার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, বয়স্ক, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তাদের জন্য মাসিক ভাতা, ছিন্নমূল ও গৃহহীনদের জন্য ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’, ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ কর্মসূচী, বস্তিবাসীদের জন্য ঘরে ফেরার কর্মসূচী, অসহায় বৃদ্ধদের বসবাসের জন্য ‘শান্তি নিবাস’ তৈরি, হতদরিদ্রদের জন্য ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে বিনামূল্যে খাদ্য সাহায্য, মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ, নারীর ক্ষমতায়ন, ২১ ফেব্রুয়ারিকে ইউনেস্কো কর্তৃক ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান (১৭ নবেম্বর ১৯৯৯), ইউনেস্কো কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের বিশ্ব-ঐতিহ্য সম্পদ হিসেবে ‘ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার’-এ অন্তর্ভুক্তি (৩০ অক্টোবর ২০১৭), অগণতান্ত্রিক ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা’ রহিতকরণ (পঞ্চদশ সংশোধনী, ৩ জুলাই ২০১১), নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু (৬.১৫ কিমি দীর্ঘ) নির্মাণ, মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি (১৪ মার্চ ২০১২), ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি (৭ জুলাই ২০১৪), ভারতের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময় (৩১ জুলাই ২০১৬), কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ, দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্প, ঢাকা শহরে মেট্রো রেল প্রকল্প, রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, মহাশূন্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ (১২ মে ২০১৮), জঙ্গীগোষ্ঠীর উত্থান কঠোর হস্তে দমন, সরকারী, আধা-সরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সর্বোচ্চ শতকরা ১২৩ ভাগ বেতন বৃদ্ধিসহ নতুন পে-স্কেল ২০১৫ ঘোষণা, প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার থেকে নারী-শিশু-বৃদ্ধসহ ১১ লাখ জীবনবিপন্ন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয়দান, বিদ্যুত উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধি (২০ হাজার মেগাওয়াট), গড় আয়ু বৃদ্ধি (৭২ বছর), প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি (৭.৮৬%), মানুষের মাথাপিছু আয়বৃদ্ধি (১৭৫২ মার্কিন ডলার), দারিদ্র্যের হার হ্রাস (৪৪ থেকে ২২ শতাংশ), অতিদারিদ্র্য হার হ্রাস (২২ থেকে ১২ শতাংশ), বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘের উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি অর্জন (১৫ মার্চ ২০১৭) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

শেখ হাসিনা সরকারের শিক্ষানীতি ও অর্জন

অর্জনের দিক থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় হচ্ছে শেখ হাসিনা সরকারের সফল মন্ত্রণালয়ের মধ্যে অন্যতম। এ সাফল্যের মূলে রয়েছে তাঁর সার্বিক নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধায়ন এবং শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপির লক্ষ্য অর্জনে আত্মনিবেদন, অক্লান্ত পরিশ্রম ও কর্তব্যনিষ্ঠা। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনাই শেখ হাসিনা সরকারের শিক্ষানীতি ও আদর্শ। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, তাঁর সরকারের আমলে বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে নীরব বিপ্লব সাধিত হয়েছে। এর উল্লেখযোগ্য দিকসমূহ নিম্নরূপ।

জাতীয় শিক্ষানীতি

দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশে জাতীয় শিক্ষানীতি বলতে কিছু ছিল না। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতাউত্তর বহুবার ব্যর্থ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ২০১০ সালে সর্বমহলের মতামতের ভিত্তিতে বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতা, যুগের চাহিদা ও দেশের প্রয়োজন উপযোগী একটি সর্বজনগ্রাহ্য জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণীত হয়, যা এখন বাস্তবায়নও প্রক্রিয়াধীন।

প্রাক প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর

নিরক্ষরতা দূরীকরণ : এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ও লক্ষণীয় অর্জন উল্লেখযোগ্য। পাকিস্তান আমলের শতকরা ১৭ ভাগ ও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের (২০০১-২০০৬) ৫২ শতাংশ থেকে বর্তমানে বাংলাদেশে সাক্ষরতা ৭৩ শতাংশের উর্ধে। উল্লেখ্য, ভারতে সাক্ষরতার হার ৬৯.৩০ ভাগ, নেপালে ৫৯.৬৩, ভুটানে ৫৭.০৩, পাকিস্তানে ৫৬.৯৮ ভাগ। একমাত্র শ্রীলঙ্কা ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের সাক্ষরতার হার সর্বোচ্চ। সরকারের টার্গেট শতভাগ সাক্ষরতা অর্জন;

শিশুভর্তি : স্কুলগামী প্রায় শতভাগ শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিতকরণ। ১০ বছর পূর্বে তা ছিল ৬১ শতাংশ;

ঝরে পড়া রোধ: ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার হ্রাস। ২০০৫ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ হার ছিল ৪৭.২ শতাংশ, ২০১৫ সালে বর্তমান সরকারের সময় তা হ্রাস পেয়ে ১৮.৮ শতাংশে দাঁড়ায়। ঝরে পড়া রোধে অঞ্চলভেদে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যালয়ে দুপুরে টিফিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের বৃত্তি, উপবৃত্তি ও মেধাবৃত্তি শিক্ষায় ঝরে পড়া রোধে সহায়ক হচ্ছে;

পাঠ্যপুস্তক বিতরণ : শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথম দিন বিনামূল্যে নতুন পাঠ্যবই বিতরণ। ২০১৮ শিক্ষাবর্ষে প্রাক প্রাথমিক, প্রাথমিক, এবতেদায়ী, মাধ্যমিক, দাখিল স্তরের ৪ কোটি ৩৭ লাখ ৬ হাজার ৮৯৫ শিক্ষার্থীর হাতে ৩৫ কোটি ৪২ লাখ ৯০ হাজার ১৬২ বই তুলে দেয়া হয়। ২০১০ সাল থেকে এ ব্যবস্থা চলে আসছে, যা বিশ্বে নজিরবিহীন;

নারীশিক্ষা : নারীশিক্ষার প্রসারে বিশেষ গুরুত্বারোপ। বর্তমানে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত মেয়ে শিক্ষার্থীদের হার ছেলেদের তুলনায় অধিক। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মেয়েদের হার গড়ে শতকরা ৩৫ ভাগ। মাধ্যমিক পর্যন্ত ছাত্রছাত্রী সমতা অর্জনের মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) ২০১৫ সালের লক্ষ্যসীমার ৩ বছর পূর্বেই শুধু অর্জনই নয়, ছাত্রী হার এখন বিশ্ব স্ট্যান্ডার্ড (৪৯%)-এর অধিক। মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত নারীশিক্ষা অবৈতনিক এবং কয়েক লাখ নারী শিক্ষার্থীর জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। নারী শিক্ষা প্রসারের ফলে বাল্যবিবাহ রোধ হচ্ছে। নারী সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর রোকেয়া দিবস উদযাপন করা হয়;

একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রবর্তন : শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়মিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে ১ জানুয়ারি স্কুল ও মাদ্রাসায় এবং ১ জুলাই কলেজে ক্লাস শুরু, ১ নবেম্বর জুনিয়র সেকেন্ডারি সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষা, ১ ফেব্রুয়ারি এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশ করা হয়। ১০ বছর ধরে বিরতিহীনভাবে এটি চলে আসছে;

ব্রেইল পদ্ধতির পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ : ২০১৭ সাল থেকে এটি প্রবর্তিত হয়। এ পর্যন্ত মোট ৩ হাজার ২৫ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর মাঝে বিনামূল্যে ২৭ হাজার ৮১১ এরূপ পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হয়েছে;

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য নিজ ভাষায় পাঠ্যবই : ২০১৭ সাল থেকে প্রবর্তিত এ ব্যবস্থায় প্রাক প্রাথমিক স্তরে চাকমা, মারমা, সাদরি, ত্রিপুরা ও গারো এ ৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৮২ হাজার ৮৯৬ শিক্ষার্থীর জন্য নিজ নিজ মাতৃভাষায় রচিত ২ লাখ ২৬ হাজার ৫৫৮ পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে;

পাঠ্যপুস্তক যুগোপযোগী করা : প্রাক প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সকল শিক্ষাকার্যক্রম প্রণয়ন, পরিমার্জন এবং সে অনুযায়ী বিভিন্ন বিষয়ে ৩৪০ নতুন পাঠ্যপুস্তক রচনা করা হয়েছে;

নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ : ষষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত সকল ধর্মশিক্ষা বইয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ করা এবং সে অনুযায়ী বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে;

মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা : শিক্ষার্থীদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরতে পাঠ্যপুস্তক সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জন করা হয়েছে। এখন শিক্ষার্থীরা আমাদের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও জীবন আদর্শ, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, স্বাধীনতার ঘোষণা, পাকহানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের কর্তৃক গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি, মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় ৪ নেতার ভূমিকা, মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর ভূমিকা, পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণ, জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ইত্যাদি বিষয়ে সঠিক ইতিহাস জানতে পারছে; এবং

শিক্ষা বৃত্তি : স্নাতক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, উপবৃত্তি ও মেধাবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে এবং এর টাকার পরিমাণ ও সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, নৃগোষ্ঠী, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা প্রেরণ করা হচ্ছে। ২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত শুধু উপবৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা খাতে ২ কোটি ৮৯ লাখ ৮ হাজার ৯২১ জনকে ৫৩১৩ কোটি ৩০ লাখ ৯০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে।

কারিগরি শিক্ষা

কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ : ২০০৯ সালের পূর্বে এ কোর্সে ভর্তির হার ছিল শতকরা ১ ভাগেরও কম। বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে ১৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে শতকরা ২০ ভাগ ভর্তির লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে; * সরকারী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ডাবল শিফট চালু করা হয়েছে; * দেশের ১০০টি উপজেলায় ১০০টি টেকনিক্যাল স্কুল স্থাপন একনেকে অনুমোদন লাভ করেছে; * ৪টি বিভাগীয় শহর (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা)-এ ৪টি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে; এবং * ৪টি বিভাগ (ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ ও বরিশাল)-এ ৪টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন করা হবে।

আইসিটি শিক্ষা

আইসিটি শিক্ষা বাধ্যতামূলককরণ : দক্ষ ও তথ্য-প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে নিম্ন মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত আইসিটি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে; * আইসিটি ইন এডুকেশন মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে; * সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ওয়েবসাইট চালু করা হবে;

* ৩২ হাজার ৬৬৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে। আরও ৪৮ হাজার মাল্টিমিডিয়া ও স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে; * ৩ হাজার ১৭২টি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে; * প্রথম পর্যায়ে ১২৫টি উপজেলায় আইসিটি ট্রেনিং এন্ড রিসার্চ সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরো ১৬০টি উপজেলায় এর নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে; এবং * প্রতিটি সরকারী কলেজে আইসিটি শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষা

* বর্তমানে দেশে অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৫১টি (৪৮টি পাবলিক ও ১০৩টি প্রাইভেট)। এর মধ্যে ক্রিয়াশীল ১৩৪টি (৪২টি পাবলিক ও ৯২টি প্রাইভেট)। সরকারী-বেসরকারী মিলে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩.৮ মিলিয়ন। উল্লেখ্য, স্বাধীনতা-উত্তর দেশে মাত্র ৬টি (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১২ হাজার। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সময়ে ২২টি পাবলিক ও ৫৫টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে; * দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে ১৪টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে; * ২০০৯-২০১৮ সময়ে ৫টি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়Ñ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি (চট্টগ্রাম), ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, (বিইউপি), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি (গাজীপুর), বিজিএমইএ ইউভিার্সিটি অব ফ্যাশন এ্যান্ড টেকনোলজি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে; * ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৯৮) এবং চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে আরো ২টি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা; * বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মৌলিক গবেষণাকর্মে উৎসাহ ও সহায়তা দানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০০৯-২০১৮ সময়ে ২০৫৪ কোটি ৩২ লাখ টাকার ঐরমযবৎ ঊফঁপধঃরড়হ ছঁধষরঃু ঊহযধহপবসবহঃ চৎড়লবপঃ (ঐঊছঊচ) গ্রহণ হয়েছে। এর আওতায় ৫৩২টি উপপ্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে ক্যান্সার শনাক্তকরণের সাশ্রয়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবনসহ পেটেন্টযোগ্য বেশ কয়েকটি মৌলিক গবেষণাকর্ম অন্তর্ভুক্ত; * দেশের উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণে অপপৎবফরঃধঃরড়হ ঈড়ঁহপরষ অপঃ ২০১৭ পাস করা হয়েছে; * জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে দেশের সকল কলেজ (ঢাকা শহরের ৭টি সরকারী কলেজ ব্যতীত)-এর (সংখ্যা ২২৬০টি, শিক্ষার্থী সংখ্যা ২.৮ মিলিয়ন) ছাত্র ভর্তিসহ সকল একাডেমিক কার্যক্রম অনলাইনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে; * ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ নামে বিশেষ একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন ও তা কার্যকর করায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত সারা দেশের কলেজসমূহের লাখ-লাখ শিক্ষার্থীর সেশনজটের দীর্ঘ অভিশাপ থেকে মুক্তি ঘটেছে; * মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে তুলে ধরার জন্য ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ শিরোনামে ১০০ নম্বরের (৪ ক্রেডিট) একটি কোর্স স্নাতক (পাস) ও স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষের কলা, সামাজিক বিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য শাখা নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীর জন্য অবশ্য পাঠ্য করা হয়েছে; * জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজসমূহের ১৬ হাজার ৫০০ শিক্ষককে নটিংহাম ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া ক্যাম্পাস ও বাংলাদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রদানে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৫ বছর মেয়াদী (২০১৬-২০২১) ১ হাজার ৪০ কোটি টাকার কলেজ শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প (সিইডিপি) গ্রহণ করা হয়েছে, যা দেশে এই প্রথম; * বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের পরিচালন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা আনয়নে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ পাস করা হয়েছে; এবং * আলোচ্য সময়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ক্যাম্পাসের পরিবেশ তুলনামূলক শান্ত থাকা এবং নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া।

মাদ্রাসা শিক্ষা

* মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন ও মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পাঠ্যক্রম পুনর্বিন্যস্ত এবং নতুন পাঠ্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; * আলাদা অধিদফতর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে; * ইবতেদায়ী পর্যায়ে প্রতিবছর ১৫ হাজার শিক্ষার্থীকে সাধারণ বৃত্তি এবং ৭ হাজার ৫০০ জনকে মেধা বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে; * মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়নে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম প্রতিষ্ঠা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে; * ২৮১টি মাদ্রাসায় কারিগরি শিক্ষা কোর্স চালু করা হয়েছে; * ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে; এবং * কওমি মাদ্রাসার জন্য শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দাওরায়ে হাদিস-এর সনদকে ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি বিষয়ের মাস্টার ডিগ্রীর সমতুল্য করে ২০১৮ সালে সংসদে আইন পাস করা হয়েছে।

বেসরকারী শিক্ষক নিয়োগ

মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারী কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা আনয়নে বেসরকারী শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট

২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে ১ হাজার কোটি টাকার প্রারম্ভিক অর্থ নিয়ে ‘প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অসচ্ছল, সুবিধা বঞ্চিত, মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে আর্থিক সহায়তা দানে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এমফিল-পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণাকর্মে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা দানে সম্প্রতি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে এ তহবিল থেকে ১ কোটি ২৮ লাখ শিক্ষার্থী বৃত্তি পাচ্ছে।

ভৌত অবকাঠামো ও নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

* ২০০৯ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত ১০ হাজার ১১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে; * ঢাকা শহরে ১১টি সরকারি স্কুল ও ৬টি সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে; ২৬ হাজারেরও অধিক বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ; প্রতি উপজেলায় একটি মাধ্যমিক স্কুল ও একটি ডিগ্রী কলেজ সরকারীকরণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। ২০০৯-২০১৮ এ এক দশক ধরে বাংলাদেশের সর্বক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, তা আজ বিশ্ববাসীর কাছে বিস্ময় ও রোল মডেল। এর মূলে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃষ্টিশীল নেতৃত্ব এবং নেতৃত্বের সততা, বলিষ্ঠতা ও দেশের প্রতি শতভাগ অঙ্গীকার। তাঁর নেতৃত্ব অদ্বিতীয়। শেখ হাসিনা জাতির পিতার কন্যা। তিনি শুধু পিতার রক্তের উত্তরাধিকারীই নন, তাঁর আদর্শেরও ধারক ও নিবেদিতপ্রাণ।

জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল ‘সোনার বাংলা’ গড়ার। পিতার সে স্বপ্ন বাস্তবায়নই তাঁর একমাত্র ব্রত। তাই তিনি ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ, আর ২০৪১ সালে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়েই থেমে নেই। তাঁর দৃষ্টি বহুদূর। ২০১৮ সালে বসেই তিনি ২১০০ সালের বাংলাদেশের স্বপ্ন এঁকেছেন তাঁর ডেল্টা প্লানে। এমন কন্যাসন্তানের হাতে দেশের নেতৃত্ব ন্যস্ত থাকলে দেশের উন্নয়ন-সমৃদ্ধি ঘটবেই। শিক্ষাক্ষেত্রে যেখানে দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ (এবং বয়সে সবাই তরুণ) জড়িত, সেখানে সঠিক নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা পেলে শিক্ষাই পূরণ করবে বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্ন।

লেখক : প্রফেসর, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়