২১ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আরও একটি বিজয়ের মাস ॥ ভরসা তরুণ প্রজন্ম

  • মিলু শামস

গত শতকের নব্বই দশকে শোনা গেল, এক মুক্তিযোদ্ধার মা মাঠে নেমেছেন নতুন যুদ্ধ নিয়ে। তার টগবগে তরুণ সন্তান যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। হাজার হাজার শহীদের মায়ের প্রতীক হয়ে তিনি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করলেন। একুশ বছর পর দেশ যেন আবার জেগে উঠল। আবার আন্দোলন। আলোচনা। সভা-সেমিনার। অতঃপর বিরানব্বইয়ের ছাব্বিশে মার্চ গণআদালতে গোলাম আযমের প্রতীকী ফাঁসি । সে আরেক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

এ ঘটনার একুশ বছর পর প্রতীকী নয়, আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল সত্যিই ঘাতক দালাল রাজাকারের ফাঁসির রায় ঘোষণা করল। নির্বাচনী অঙ্গীকার রক্ষা করলেন শেখ হাসিনা এখানেই বাংলাদেশ, এ দেশের মানুষ অনন্য। তারা বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম বাধ্য করেছে যুদ্ধাপরাধীর বিচার করতে। এ প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম ইস্যু করেছিল যুদ্ধাপরাধী বিচার। নানা সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত বিচারের রায় ঘোষণার প্রক্রিয়া শুরু হয়। দু’হাজার তেরোর বাইশ জানুয়ারি তাই এ দেশের ইতিহাসে আরেকটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের উদ্যোগে ভিয়েতনামে মার্কিন সেনাদের মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল। সেখানে মার্কিন সেনাদের নৃশংসতার নানা দিক সম্পর্কে বিশ্ববাসী জানতে পেরেছিল। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে অপরাধীদের সাজা দেয়া যায়নি। প্রতীকী সাজা হওয়ার একুশ বছর পর হলেও বাংলাদেশ তা পেরেছে এবং যুদ্ধপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকরও করেছে।

॥ দুই ॥

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অবদান রাখার জন্য আজও সম্মান ও ভালবাসার সঙ্গে উচ্চারিত হয় জর্জ হ্যারিসনের নাম। দু’হাজার চৌদ্দয় জানা গেল, তিনি বাদ পড়েছেন পাঠ্যক্রম থেকে। রবীন্দ্রনাথও এক সময় বাতিল হয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ‘হিন্দু’ এবং ‘ভারতীয়’ সুতরাং পূর্ব পাকিস্তানে বর্জনীয়। এ তত্ত্ব অনুযায়ী বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্তসহ আরও অনেকেই বাতিল হন। অর্থাৎ রবীন্দ্রবিরোধিতার ছলে ওই তত্ত্ববাগীশরা আসলে চেয়েছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে পঙ্গু করে দিতে। ষাট দশকে পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রবিরোধী আন্দোলন ছিল আসলে বাংলাভাষা ও সাহিত্যচর্চা বিরোধী আন্দোলন। সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে স্বাধীন দেশে তেতাল্লিশ বছর পর মাদ্রাসা শিক্ষার উপযোগী হতে পাঠ্যবই থেকে বিদায় নিতে হয় জ্ঞানদাশ, লালন, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, বিপ্রদাশ বড়ুয়াকে। তাঁদের জায়গায় প্রতিস্থাপিত হন ফররুখ আহমদ, মুহাম্মদ সগীর, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী। ‘মংডুর পথে’ হয়ে যায় ‘মদিনার পথে।’ ‘তৈল চিত্রের ভূত’ ‘তৈল চিত্রের আছর’ হতে হতে অল্পের জন্য রক্ষা পায়।

॥ তিন ॥

প্রবীর ঘোষ ঢাকায় এসেছিলেন ব্যক্তিগত সফরে। তিনি ‘ভারতীয় যুক্তিবাদী আন্দোলন’-এর প্রতিষ্ঠাতা। সম্ভবত সে কারণে ঢাকায় এসে নিজ উদ্যোগে যোগাযোগ করেন এখানকার যুক্তিবাদী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত তরুণদের সঙ্গে। যারা যুক্তির আলোকে পথ চলতে চায়। সঙ্কীর্ণতা, ভাবালুতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে তাদের সোচ্চার কণ্ঠ সমাজের মূল ধারাকে স্পর্শ করতে না পারলেও তরুণদের একাংশের চেতনাকে তারা শাণিত করার চেষ্টা করছে। সে সময় প্রবীর ঘোষের সঙ্গে তাদের মতবিনিময় অনুষ্ঠানে গিয়ে সে কথাই মনে হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তন উপচে পড়ছে। আগতদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই তরুণ। প্রাণপ্রাচুর্যে টগবগ করছে। প্রশ্ন, যুক্তি, পাল্টা যুক্তিতে প্রবীর ঘোষকে ব্যতিব্যস্ত রাখছিল তারা। প্রবীর ঘোষ তার অভিজ্ঞতা থেকে একের পর এক উদাহরণ দিয়ে বলছিলেন জ্যোতিষী, ভাগ্য গণনাকারী, যোগ-তান্ত্রিক সাধকদের যুক্তি দিয়ে মোকাবেলা করার কথা।

যুক্তি আর বিজ্ঞানের এই আবহ দারুণ আশাবাদী করে। এই তরুণদের মতো আরও অসংখ্য তরুণ নিশ্চয়ই ছড়িয়ে আছে সারাদেশে। যারা চিন্তা করতে পারে। যুক্তির পরম্পরা দিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারে চারপাশের ঘটনাবলী। ভাবালুতায় ভরা সমাজ ও রাজনীতির জায়গায় এরাই প্রতিষ্ঠা করবে যুক্তিনির্ভর সমাজ ও মননশীল রাজনীতি এমন এমন ভাবনা আশাবাদী করে। সমাজের বিন্যাস এখন সামন্ত উৎপাদন কাঠামো ঘিরে না হলেও আমাদের মতো দেশে মনোজগতে সামন্ত আধিপত্যই বেশি। আর তাই রয়েছে কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, ভাবাবেগ ও মতান্ধতার নিয়ন্ত্রক ভূমিকা। এর বিপরীতে অনিবার্য হয়েছে যুক্তি ও বিজ্ঞান মনস্কতা। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে যা তরুণরাই প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

সাধারণ মানুষ সব সয়ে ‘সঙ্কটই সমাধানের পথ দেখায়’ এই সান্ত¡না নিয়ে আছেন। যদিও রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘নৈরাশ্যের মধ্যেই এই কথাও মনে আসে যে, দুর্গতি যতই উদ্ধতভাবে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠুক, তবু তাকে মাথা তুলে বিচার করতে পারি, ঘোষণা করতে পারি, তুমি অশ্রদ্ধেয়, অভিসম্পাত দিয়ে বলতে পারি, ‘বিনিপাত’ বলবার জন্য পণ করতে পারে প্রাণ এমন লোকও দুর্দিনের মধ্যে দেখা দেয়, এই তো সকল দুঃখের সকল ভয়ের উপরের কথা’Ñ (কালান্তর)। এখনকার প্রশ্ন হচ্ছে কি পদ্ধতিতে বলতে হবে এ কথা? বহুদলীয় গণতন্ত্রের অবস্থা ব্যাখ্যা করে বলার দরকার নেই। যে ক’জন বামপন্থী রাজনীতিক সরকারে আছেন, তারা কীভাবে কোন্ পদ্ধতিতে সমাজ পরিবর্তনে অবদান রাখছেন, বাম রাজনীতির চর্চা ও বিকাশ ঘটাচ্ছেন তা সাধারণ মানুষের বোধের বাইরে। রাজনীতিতে এরা বর্জ্য। তবে যে আদর্শের নাম ভাঙ্গিয়ে এরা নেতার তকমা ধারণ করেছেন সে আদর্শ যে বর্জ্য নয় সচেতন তরুণরা তা বোঝে। দেশকে ভালবাসার নামে যে ভ-ামি তার স্বরূপও তারা চেনে। তাদের শুধু জানতে হবে কোন্ পদ্ধতি প্রয়োগ করলে রাজনীতি দূষণমুক্ত হবে। প্রয়োগের রূপরেখা তারাই বের করে নেবে। যুক্তির পেছনে যারা ছুটতে পারে নিজস্ব বিচার-বুদ্ধি খাটিয়ে চলার ক্ষমতা তারা রাখে।

তরুণদেরই তৃতীয় শক্তি হতে হবে। আঠারো শতকে ইউরোপে সামন্তবাদমুক্ত হয়ে স্বাধীন বুর্জোয়ার পথ চলা শুরু হয়েছিল। আমাদের এখানে তখন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফসল হিসেবে যে ভূস্বামী ও জমিদার শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল তারা স্বাধীন ছিল না। রাজনৈতিক ক্ষমতাও তাদের ছিল না। যারা ব্যবসায়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তাদের স্বার্থও ছিল শাসক ব্রিটিশের সঙ্গে যুক্ত। সুতরাং তারাও স্বাধীন ছিলেন না। মধ্য শ্রেণী এখানে এসেছিল মূলত মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী ও ভূস্বামী শ্রেণী থেকে। পাকিস্তান আমলেও সে অবস্থা প্রায় একই ছিল। অর্থাৎ যাদের মধ্য থেকে শাসক গোষ্ঠী বেরিয়ে আসছিল তাদের জন্ম ও বিকাশের প্রক্রিয়ায় শুরু থেকেই গলদ ছিল। হয়ত সে জন্যই বুর্জোয়া বিকাশের সঙ্গে সামন্ত ধ্যান-ধারণা আগাগোড়া জড়িয়ে রয়েছে। এই মিশ্রণের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তার চরম প্রকাশ বার বার আমরা দেখছি। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে রাজনীতি স্বাভাবিক ছন্দে এগুতে পারবে না।

অনেক পথ পেরিয়ে এসেও সেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময়ের ভূমি মালিক ও ব্যবসায়ী বিকাশের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে আছে রাজনৈতিক ক্ষমতার ধারক মধ্য শ্রেণী। তাদের সামন্ত মানসিকতা ভাঙতে তরুণদের আগমন অপরিহার্য। পচে যাওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূলে প্রচ- ঝাঁকুনি দিতে নিশ্চয়ই তারা আসবে।