২১ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চীনে শি চিন্তাধারায় মগজ ধোলাই

চীনে একটি প্রতিষ্ঠান আছে যার নাম শি জিনপিং চিন্তাধারা ইনস্টিটিউট। এর কাজ হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ও কমিউনিস্ট পার্টি প্রধান শি জিনপিংয়ের চৈনিক বৈশিষ্ট্যযুক্ত সমাজতন্ত্র সম্পর্কিত চিন্তাধারা নিয়ে গবেষণা চালানো এবং নীতিনির্ধারকদের পরামর্শ দেয়া ও সেমিনারের আয়োজন করা।

এক বছর হলো মি. শি কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেসে ঘোষণা করেছেন যে চীন এক ‘নতুন যুগে’ প্রবেশ করেছে এবং এই বিষয়টিকে পার্টি কিভাবে সামাল দেবে তার রূপরেখাও তিনি তুলে ধরেছিলেন। কংগ্রেস তার সেই রূপরেখা অনুমোদনও করে এবং পার্টি সনদ সংশোধন করে দলের অন্যতম পথ নির্দেশক মতাদর্শ হিসেবে শি জিনপিং চিন্তাধারাকে বিষয়সূচীর অন্তর্ভুক্ত করে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে শুধুমাত্র মাও সেতুং ও শি জিনপিংয়ের নামের সঙ্গেই চিন্তাধারা শব্দটা যুক্ত হয়েছে।

ছয় বছর আগে শি ক্ষমতা গ্রহণ করার পর থেকে তাঁর লক্ষ্য হচ্ছে যথেষ্ট পরিষ্কারÑ চীনের দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজের উওপর দলের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং বিশ্বব্যাপী চীনের প্রভাব বাড়িয়ে তোলা। কিন্তু তার চিন্তাধারা হিসেবে যা বলা হচ্ছে তা আসলে মাও সেতুং ও দেং জিয়াও পিংয়ের ব্যবহৃত শব্দাবলীর জগাখিচুড়ি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীনের বিশ্বমানের সেনাবাহিনী গঠন ও পরিবেশ রক্ষা সম্পর্কিত কিছু কথামালা।

প্রায় চল্লিশ বছর আগে দেং জিয়াও পিং তাঁর সংস্কার ও মুক্তদ্বার নীতি চালু করার পর থেকে যত ধরনের তত্ত্বকথা ও ধ্যান-ধারণা প্রচারিত হয়েছে তার চেয়ে অনেক জোরেশোরে ও সরবে প্রচারিত হচ্ছে শি চিন্তাধারা। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে সব চীনা ছাত্রকে মৌলিক পর্যায়ের যেসব মতাদর্শ কোর্স নিতে হয় সেগুলোতে এই বিষয়ের ওপর বক্তৃতামালা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডারগ্রাজুয়েটদের জন্য অতিরিক্ত নির্বাচনী কোর্স সৃষ্টি করা হয়েছে। এবারের শিক্ষাবর্ষে হাইস্কুলগুলোতে নতুন পাঠ্যসামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে, যাতে এ বিষয়ে তাদের শিক্ষা দেয়া যায়।

এই যে মতাদর্শে দীক্ষাদান তথা মগজ ধোলাই সেটা শিক্ষাঙ্গনের বাইরেও বিস্তৃত। গত মে মাসে পার্টির প্রচার বিভাগ ৩৫৫ পৃষ্ঠার ৩০টি অধ্যায় সংবলিত একটি বই প্রকাশ করে। বলা হয় ওতে শি চিন্তাধারার অনুপুঙ্খ ধারণা প্রদান করা হয়েছে। পার্টির প্রত্যেক সেলকে এই বই পাঠ করতে হবে। গত মাসের পার্টির মুখপত্র পিপলস ডেলিতে সামাজিক মাধ্যমের ওপর গোলকধাঁধার মতো মানচিত্র ছাপা হয়। ওটা ধ্যান-ধারণা ও উদ্ধৃতিতে এত বেশি ভরপুর যে তা বুঝে উঠতে পারা রীতিমতো শ্রমসাধ্য ব্যাপার। মানচিত্রের জটিলতাই জানিয়ে দেয় যে যারা শি চিন্তাধারা আয়ত্ত করার চেষ্টা করছে তাদের কি প্রচ- ধকলই না পোহাতে হচ্ছে। এদের সাহায্য করার জন্য বড় বড় কয়েকটি ফার্ম শি চিন্তাধারা গবেষণা কক্ষ খুলেছে। তেমনি করেছে লাইব্রেরি ও কমিউনিটি সেন্টারগুলো। গত জুলাই মাসে পিপলস ডেলি মালিকানাধীন ট্যাবলয়েড পত্রিকা গ্লোবাল টাইমসের শীর্ষ খবরে বলা হয় যে স্থানীয় সরকার থেকে মিডিয়া আউটলেট, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে রাস্তার ঝাড়ুদার পর্যন্ত সমাজের সর্বস্তরে শিং চিন্তাধারা অধ্যয়ন করা হচ্ছে।

এসব কিছুর একটা উদ্দেশ্য সম্ভবত হচ্ছে শি জিন পিংকে মাওয়ের ক্ষমতার সঙ্গে তুলনীয় একজন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। দেং জিয়াও পিংয়ের তত্ত্বের উল্লেখ ইদানীং বেশ কমই করা হয়। গত এপ্রিল মাসে পার্টির সাময়িকী কিয়ান জিয়ানে বলা হয় ‘চৈনিক বৈশিষ্ট্যযুক্ত সমাজতন্ত্রের’ অর্থ নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিতর্ক চলছে। শি চিন্তাধারাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পার্টির সমষ্টিগত প্রজ্ঞার সংক্ষিপ্ত করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কতকাংশে ব্যাপারটা তাই। পূর্বসূরিদের কাছ থেকে ধার করা ছাড়াও প্রেসিডেন্ট শি সম্ভবত ওয়াং লুনিংয়ের আত্মিক কর্মের ওপর বহুলাংশে নির্ভর করেছে। সাবেক এই একাডেমিক চলতি শতাব্দীর প্রথম দিক থেকে পার্টির চিন্তাধারার উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ নেপথ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। গত বছর মি. ওয়াং পার্টির ক্ষমতার শীর্ষ কিছু সাত সদস্যের পলিটগুলো স্থায়ী কমিটিতে যোগদান করেন।

সূত্র : দ্য ইকোনমিস্ট