১৯ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

খামোশ হোসেন জামায়াত হোসেন এবং বনোগ্রাম রোডের কামালউদ্দিন

  • আলমগীর সাত্তার

১৯৬৪ সাল

তখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান গণতন্ত্রের নতুন সংজ্ঞা বা পদ্ধতি উদ্ভাবন করলেন। নাম দেয়া হলো বেসিক ডেমোক্রেসি বা বুনিয়াদি গণতন্ত্র।

এই সময় আমার আবাসস্থান ছিল পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে। চাকরি করতাম তখনকার মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকে। আমার আবাসস্থানটি ছিল, পুরান ঢাকা রেডিও স্টেশনের উল্টো দিকে যে একটি মিষ্টির দোকান ছিল তারই পেছনে। আমার টিনশেডের বাসার বেড়া ছিল বাঁশের চাটাইয়ের। আর এই বাসার লাগোয়া ছিল ইটের দেয়াল দেয়া টিনশেডের ছোট একখানা ঘর। ওই ইটের দেয়াল দেয়া ছোট ঘরখানায় বাস করতেন সুলতান মাহমুদ নামের একজন সাংবাদিক।

সুলতান মাহমুদ দৈনিক আজাদ পত্রিকায় চাকরি করতেন। তিনি আমার চেয়ে প্রায় দশ বছরের বড় ছিলেন। কবি ফররুখ আহমেদ ছিলেন তাঁর মামা। আমার বাসাটা বাঁশের ছাপড়া ঘর হলেও আয়তনে খানিকটা বড় ছিল। তাই আমার ঘরে একটা আলাদা চৌকি পেতে আনোয়ার হোসেন নামে আমার এক আত্মীয় বাস করতেন। তিনি চাকরি করতেন এজিবিতে। আমার একটা কেরোসিনের স্টোভ ছিল। ওই স্টোভে চা তৈরি করা হতো এবং আনোয়ার হোসেন, সুলতান ভাই এবং আমি তিনজন মিলে জমিয়ে আড্ডা দিতাম।

সুলতান ভাই আজাদ পত্রিকায় চাকরি করা ছাড়া রেডিও বাংলাদেশে প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। এ ব্যাপারে তিনি বিভিন্ন জনের সাক্ষাতকার গ্রহণ করতে যেতেন। তখনকার দিনে মোবাইল ফোন ছিল না। তাই সুলতান ভাই লোকজনের সাক্ষাতকার গ্রহণের নিমিত্তে একটি রেকর্ড প্লেয়ার সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। ওইসব সাক্ষাতকার গ্রহণের সময় মাঝে মধ্যে আমি সুলতান ভাইর সঙ্গী হতাম।

আমি আইয়ুব খানের বুনিয়াদি গণতন্ত্রের কথা বলছিলাম। আইয়ুব খান ঘোষণা দিলেন, পাকিস্তানে তিনি নির্বাচন দিবেন। কিন্তু সে নির্বাচন হবে একটু ভিন্ন ধরনের। পাকিস্তানের উভয় অংশের সাধারণ জনগণ চল্লিশ হাজার করে কাউন্সিলর নির্বাচন করবে।

এই কাউন্সিলররা ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করবে কে হবেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। এই পদ্ধতির নির্বাচনের নামকরণ করা হলো বেসিক ডেমোক্রেসি বা বুনিয়াদি গণতন্ত্র।

পাকিস্তানের দুই অংশের আশি হাজার কাউন্সিলরকে নির্বাচিত করা হলো। এরপর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদের জন্য দু’জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নাম ঘোষণা করলেন। একজন হলেন স্বয়ং আইয়ুব খান, দ্বিতীয়জন হলেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ আলী জিন্নহর বোন মিস ফাতেমা জিন্নাহ। আরও দু’জন অখ্যাত প্রার্থীও ছিলেন। এদের একজন করাচীর উটপালক মহম্মদ বশীর এবং পূর্ব পাকিস্তান থেকে কামালউদ্দিন নামের এক ভদ্রলোক।

যখন নির্বাচন সম্পন্ন হলো তখন দেখা গেল, আইয়ুব খান পঞ্চান্ন হাজার ভোট পেয়ে পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। মিস ফাতেমা জিন্নাহ পেয়েছিলেন পঁচিশ হাজারের মতো ভোট। কামালউদ্দিন সাহেব পেয়েছিলেন কমবেশি চার শ’ এবং মহম্মদ বশীর পেয়েছিলেন কমবেশি তিন শ’ ভোট। এসব ঘটনা প্রায় পঞ্চান্ন বছর আগের। আর সবকিছু আমি লিখছি আমার স্মৃতির ওপর নির্ভর করে। তাই পরিসংখ্যানে কিছু ভুলত্রুটি থাকলেও থাকতে পারে।

বেসিক ডেমোক্রেসির নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার তিন-চারদিন পর সুলতান ভাই বললেন, চলো, কামালউদ্দিনের একটি সাক্ষাত নিয়ে আসি। দিনটা ছিল রবিবার, তা এখনও মনে আছে। আমার অফিস ছুটি ছিল। সুলতান ভাইয়েরও ডে অফ ছিল। তাই বিকেল বেলায় আমরা দু’জনে কামাল সাহেবের বাসার উদ্দেশে বেরুলাম। অনেক কষ্টে পুরান ঢাকার বনোগ্রাম রোডে গিয়ে কামালউদ্দিন সাহেবের বাসা খুঁজে বের করলাম।

ইটের দেয়াল দেয়া টিন শেডের বাসার বারান্দায় একটি হাতল ভাঙ্গা চেয়ারে বসে সামনে রাখা একটি বেঞ্চের ওপর পা দু’খানা তুলে দিয়ে খুব প্রশান্তি সহকারে তিনি টে-ু পাতা দিয়ে তৈরি বিড়ি ফুঁকছিলেন। আমরা তাঁকে সালাম দিয়ে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমরা তাঁকে আমাদের অভিপ্রায় জানালাম। তিনি বেঞ্চ থেকে পা দু’খানা নামিয়ে আমাদের বসতে বললেন।

কামাল সাহেব বেশ ভাল মুডেই ছিলেন। বাসার সামনের দোকান থেকে এক আনা (ছয় পয়সা) করে দামের দুকাপ চা আনার ব্যবস্থা করলেন। এরপর জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার? সুলতান ভাই তাঁর সাক্ষাতকার নেয়ার কথা বললেন। তিনি বেশ হাসিমুখেই রাজি হলেন।

আমিই প্রশ্ন করলাম : বললাম, কামাল ভাই, আপনি তো জানতেন এই নির্বাচনে আপনি কোনক্রমেই জয়ী হতে পারবেন না। অল্প কয়েকটা ভোট পেতে পারেন, তাও যদি কেউ কেউ ভুল করে দেয়! তবু আপনি এই নির্বাচনে প্রার্থী হলেন কেন?

কামাল সাহেব উত্তর দিলেন, ‘কৈ, আমি তো হারিনি? আমি অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। ভাবলাম, লোকটা কি পাগল? মাত্র চার শ’ ভোট পেয়েছেন! তারপরও বলছেন, তিনি তো হারেননি! দেখে তো তাকে সুস্থ এবং স্বাভাবিক মানুষ বলেই মনে হয়।

আমি আবার প্রশ্ন করলাম, কামাল ভাই আপনি যদি না হেরে থাকেন, অর্থাৎ বিজয়ী হয়ে থাকেন, তবে আপনি তো এখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট!

সাক্ষাতকার নেয়ার কথা ছিল সুলতান ভাইর। তার বদলে কামালউদ্দিন সাহেবকে আমিই কেবল প্রশ্ন করছিলাম। সুলতান ভাই ব্যস্ত ছিলেন রেকর্ডিং করার কাজে।

কামালউদ্দিন সাহেব আবার একটি বিড়ি ধরালেন। তারপর বললেন, দ্যাখেন, আইয়ুব খানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন মিস ফাতেমা জিন্নাহ আর আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি মহম্মদ বশীরের সঙ্গে। সে পেয়েছে তিন শ’ ভোট, আর আমি পেয়েছি চার শ’ ভোট। তাই বশীর হেরেছে এবং আমি জয়ী হয়েছি।

এবার আমরা তিনজনেই খুব একচোট হাসলাম। বুঝলাম, কামালউদ্দিন সাহেব যথেষ্ট বুদ্ধিমান এবং রসিক লোক।

ওইবার নির্বাচনের আগে চার প্রার্থীর মধ্যে দুটো করে প্রজেকশন মিটিং হয়েছিল। ওই প্রজেকশন মিটিংয়ের জন্য প্রত্যেক প্রার্থীকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দেয়া হয়েছিল। অর্থের পরিমাণ এখন আর আমার মনে নেই। তবে অঙ্কটা বিশ হাজার টাকার মতোই হবে বলে আমার মনে পড়ছে।

কামাল সাহেব অকপটে স্বীকার করলেন, প্রজেকশন মিটিংয়ে দেয় অর্থের জন্যই তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন।

(২)

এবার ২০১৮ সালে বাংলাদেশে যে নির্বাচন হলো তাতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অনেকেই ভোটের শতাংশ হিসাব করলে কামাল উদ্দিন এবং মহম্মদ বশীরের একই গোত্রভুক্ত বলে বিবেচিত হবেন, এ কথা অস্বীকার করা যায় না। এদের মধ্যে কারা কারা আছেন সে কথা আমার উল্লেখ করার কোন প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।

বছরের প্রথম দিনটায় অর্থাৎ ১ জানুয়ারি সন্ধ্যা বেলায় আমরা কয়েক বন্ধু একত্রিত হয়ে আড্ডায় বসেছিলাম। আমাদের মূল বিষয় ছিল এবারের জাতীয় নির্বাচন।

প্রথমেই কথা উঠল, ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে। বেশ কয়েকদিন আগে টেলিভিশনের এক টক শোতে ড. মুনতাসীর মামুন তাঁর নতুন নামকরণ করেছেন, ‘জামায়াত হোসেন’। অবশ্য তাকে এখন কেউ কেউ বলেন, ‘খামোশ’ হোসেন।

আমি আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসির নির্বাচনের কাহিনীর কথা বলে বললাম, তিনি এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি এই ভেবে যে, তিনি যে কয়টা ভোট পাবেন, তাতে তিনি বনোগ্রাম রোডের কামালউদ্দিন হয়ে যাবেন এই কথা ভেবে।

আমরা যে ক’জন আড্ডা দিচ্ছিলাম, তাদের মধ্য থেকে একজন বললেন, খামোশ রহমানের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান নেতা একজন আছেন, যিনি খামোশ হোসেনের চেয়ে অনেক ধূর্ত। তাঁর নামটা উল্লেখ না করলেও বুদ্ধিমান পাঠক ঠিকই বুঝতে পারবেন, ওই নেতা-ব্যক্তি কে? ওই ব্যক্তি নিশ্চয়ই বিএনপি দলীয় নেতা।

বিএনপি দলটির চেয়ারপার্সন দুর্নীতির দায়ে দ-িত হয়ে কারাগারে বন্দী আছেন এবং মনে হয় আরও অনেকদিন থাকবেন। বিএনপির অতিশয় ধূর্ত ব্যক্তি (এক সময় এভিয়েশন ও ট্যুরিজমের মন্ত্রী ছিলেন) আরও দু’তিনজন উচ্চাভিলাষী নেতাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে ম্যাডামকে বোঝালেন, তাকে অবশ্যই ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। ওখানকার চিকিৎসকরা তাঁর খুব অনুগত। ম্যাডামের স্বাস্থ্য তখন অতিশয় খারাপ। তাঁর বাম হাত অবশ হয়ে যাচ্ছিল। কোমরে এবং ঘারে ব্যথা। হাঁটুর পুরনো ব্যথা তো ছিলই। ডায়াবেটিস এবং রক্তির উচ্চচাপ ছিল সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

একরোখা-অল্পশিক্ষিত ম্যাডাম জেদ ধরলেন, ইউনাইটেড হাসপাতাল ছাড়া অন্যত্র তিনি চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করবেন না। পিজি (বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল) হাসপাতালে কোন অবস্থায়ই না। কিন্তু জেলকোড অনুযায়ী দ-িত কোন আসামিকে প্রাইভেট মেডিক্যাল হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেয়া যায় না। জেদি ম্যাডাম তা মানতে রাজি ছিলেন না। অতিশয় ধূর্ত বিএনপি নেতা এমনটাই চাচ্ছিলেন যে, ম্যাডাম পঙ্গু হয়ে যাক। তারপর নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট বিজয়ী হলে তিনিই হবেন দেশের প্রধানমন্ত্রী ম্যাডামের পুত্রধন ও দ-িত আসামি হিসেবে রয়েছেন লন্ডনে। তিনি দেশে ফিরতে পারছেন না।

ঐক্যফ্রন্ট বিজয়ী হলে তারেক রহমান চটজলদি ঢাকায় ফিরে আসার ঘোষণা দিয়ে ঢাকায় তাঁর দলীয় লোকদের অবশ্যই জানিয়ে দিতেন। আর এখানে বসে অতিশয় ধূর্ত রাজনীতিবিদ তারেক রহমানকে জানিয়ে দিতেন, বাংলাদেশে তাঁর ফিরে আসার আইনী জটিলতাগুলো অতিদ্রুত সমাধান করে তাকে ঢাকায় বিপুল জনসমাবেশের মাধ্যমে সংবর্ধনা জানানো হবে। কিন্তু তারেক রহমানের ঢাকায় ফিরে আসার আইনী জটিলতার সমাধান আর হতো না। তারেক রহমান ঢাকায় ফিরে এসে বিশাল সংবর্ধনার আশায় আশায় দিন কাটিয়ে দিতেন।

ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে গোহারা হেরে যাওয়ায় বিএনপি দলটির অতিশয় ধূর্ত রাজনীতিবিদকে মনে করে অনেক পুরনো দিনের একটি গানের কথা আমার মনে পড়ে যায় :

‘আমার সাধ না মিটিল,

আশা না পুরিল...।’

লেখক : বীরপ্রতীক, সাবেক বৈমানিক