২২ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পোশাক শ্রমিকদের মজুরি

মজুরি নিয়ে পোশাক শ্রমিকদের ভেতর অসন্তোষ বিরাজ করছে। গত কয়েকদিন ঢাকার পোশাক-শিল্পাঞ্চলের সামগ্রিক পরিবেশ অশান্ত হয়ে ওঠে। শ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করেন। শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে একজন শ্রমিকের মৃত্যুর মতো দুঃখজনক ঘটনাও ঘটেছে। এটি ছিল অনাকাক্সিক্ষত। সদ্যগঠিত সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ত্রিপক্ষ বৈঠকে পোশাক শিল্পের বিরাজমান সমস্যা এক মাসের মধ্যেই সমাধান করা হবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করতে পারি। সবারই প্রত্যাশা শ্রমিকপক্ষ সহনশীলতার পরিচয় দেবেন।

আগে রফতানিমুখী পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ছিল ৫ হাজার ৩০০ টাকা। গত বছর ২ হাজার ৭০০ টাকা বাড়িয়ে করা হয়েছিল আট হাজার টাকা। শ্রম আইন অনুযায়ী, প্রতি ৫ বছর পর পর মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা করতে হয়। সর্বশেষ ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে মজুরি কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। সে হিসেবে, গত মাস অর্থাৎ বিদায় নেয়া ডিসেম্বরে নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন করা মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন করার আইনী বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কাঠামোতে পোশাক শ্রমিকদের মজুরি পাওয়ার কথা। কিন্তু শ্রমিকরা এখন মজুরি বৈষম্য নিরসন এবং মজুরি বৃদ্ধির দাবি তুলে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করছে।

উল্লেখ্য. দেশের পণ্য রফতানির আয়ের ৮৪ শতাংশ পোশাক খাত থেকে আসে। এ খাতে কাজ করেন প্রায় ৩৬ লাখ শ্রমিক। ১৯৯৪ সালে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ছিল ৯৩০ টাকা। ২০০৬ সালে সেটি বৃদ্ধি করে ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা করা হয়। ২০১০ সালের মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩ হাজার টাকা করা হয়। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ৫ হাজার ৩০০ টাকা মজুরি কার্যকর হয়েছিল।

চলতি বাজারদরের সঙ্গে সরকার-নির্ধারিত মজুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে খাতসংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি মত দিয়েছেন। ১৬ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে তাদের বক্তব্য হচ্ছে, আইএলও কনভেনশন অনুসারে বর্তমান বাজারদর, মুদ্রাস্ফীতি, আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং শ্রমিকের জীবনমান বিবেচনায় এর চেয়ে কম মজুরি গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে মালিকপক্ষের দাবি, মজুরি কাঠামোতে ভারসাম্য রাখতে হবে। অন্যথায় বেতন বাড়িয়ে কোন লাভ হবে না। শিল্প বন্ধ হয়ে গেলে সেটা হবে বড় ক্ষতি। সাবেক শ্রম প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর কথা বলে অথচ দাম বাড়ানোর কথা বললে এড়িয়ে যায়। এই বাস্তবতায় আবার অর্থনীতিবিদরা বলে থকেন, প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প একটি বিশ্বশিল্পের অংশ। এর মধ্য দিয়ে যে উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরি হয়, তার বিতরণ হয় বিশ্বব্যাপী। বিশ্ববাজারের বিভিন্ন পক্ষ সম্পর্কে সংগৃহীত তথ্য থেকে একটা গড় হিসাব দেয়া যায়। বাংলাদেশের যে তৈরি পোশাক কারখানা মালিক বিক্রি করছেন ১৫-২০ ডলারে, তা ইউরোপে বা যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হচ্ছে ১০০ ডলারে; গড়ে তার মধ্যে ২৫-৩০ ডলার নিচ্ছে সেই রাষ্ট্র, ৫০-৬০ ডলার নিচ্ছে বিদেশী কোম্পানিগুলো আর শ্রমিক পাচ্ছে অনেক কম। আমরা মনে করি এ অবস্থা আর চলতে দেয়া যায় না। শ্রমিকদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করতে হবে। বিদেশী ক্রেতাদের পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব বাস্তবায়নে কৌশলী হতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সক্রিয়তা ও বিচক্ষণতাই কাম্য।

একইসঙ্গে এ কথাও স্মরণে রাখতে হবে যে, মালিকপক্ষেরও ছাড় দেয়ার সময় এসেছে। ব্যবসার লক্ষ্যই হচ্ছে মুনাফা অর্জন। কিন্তু সেক্ষেত্রে মানবিকতার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। সরকার পোশাক শিল্পে ব্যবসায়ীদের বেশ কিছু ছাড় দিয়েছে। এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে বর্তমান সরকার ব্যবসায়ীবান্ধব। এখন ব্যবসায়ীদেরও শ্রমিকদের মজুরি বিষয়ে অনড় অবস্থা থেকে সরে আসতে হবে। কোন পরিস্থিতিতেই দেশের পোশাক শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না।