২৩ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দেশটা তোদের বাপের না!

  • মোহাম্মদ ফায়েকউজ্জামান

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচার-প্রচারণায় মুখর ছিল সমগ্র দেশ। ২০০৮-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করলে বিএনপি-জামায়াত এটিকে বিভিন্নভাবে ব্যঙ্গ করে। রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটলে বলে ডিজিটাল দুর্ঘটনা, দুর্নীতির খবর শুনে বলে ডিজিটাল দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেলে বলত ডিজিটাল মূল্যস্ফীতি প্রভৃতি। তাদের ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামগুলো পর্যন্ত ডিজিটালাইজ্ড হতে থাকে। গত ক’বছরে সবকিছুই চলে এসেছে মোবাইল ফোনের মধ্যে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়ার নিয়মাবলী, ব্যাংকিং লেনদেন, অর্থ প্রেরণ-গ্রহণ সবই সম্পন্ন হয় অনলাইনে। অনলাইনে লেখাপড়ার বিষয়টিও এখন চলছে পূর্ণোদ্যমে। অনলাইনে বইপত্রসহ বিভিন্ন কেনাকাটা এখন যথেষ্ট জনপ্রিয়। আমরা জানি না ওইসব নিন্দুক এখন কি বলবেন? তবে এতটুকু বলতে পারি ডিজিটাল সুবিধা সমালোচনাকারীরাই বেশি ব্যবহার করছে। ফাঁকে কিছু মুক্তমনা লেখক বুদ্ধিজীবীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। ওইসব লেখকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল- তাঁরা ব্লগার। যারা এই ব্লগারদের হত্যা করেছে তারা জানেও না যে, ব্লগার কি? তাদের শেখানো হয়েছিল যে, ব্লগার মানে নাস্তিক। কিন্তু এখন মনে হয় তারা অনুধাবন করছে যে, ব্লগার যারা ব্লগে লেখালেখি করে। অনলাইন মাধ্যমে এটি সারা পৃথিবীতেই জনপ্রিয়। বরং যারা এই হত্যাকা-ের সমর্থক বা মদদদাতা তারাই ব্লগে বেশি সোচ্চার। বিগত নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ এই দেশের প্রতি অবিশ্বাসীদের ব্লগ ব্যবহার দেখেছে। ব্লগে তারা যে কত ধরনের মিথ্যাচার করেছে তা এখনও মুছে যায়নি। ভাল করে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে যে, ফেসবুকে বা অনলাইনে জামায়াত-শিবিরই বেশি সক্রিয় ছিল এবং এখনও আছে। তারা যে বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বাসী নয় তা গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদ ও সাকা চৌধুরীর ফাঁসির পর পরিলক্ষিত হয়েছে। পাকিস্তানের পার্লামেন্টে এ বিষয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

ইমানদার মুসলমান হতে গেলে কিছু বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়। ঠিক রাষ্ট্রীয় আচারেও এমন অনেক বিষয় আছে যেগুলোকে ধারণ না করলে প্রকৃত নাগিরক হওয়া যাবে না। যেমন- বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বাস। বাংলাদেশের রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে ৩০ লাখ মানুষের আত্মাহুতি ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে। সত্যিকার অর্থে শহীদের সংখ্যা ৩০ লাখের কম হতে পারে আবার বেশিও হতে পারে। নির্যাতিত নারীর সংখ্যার ক্ষেত্রেও একই কথা। এখানে বিশ্বাসটি বড়। গুনে গুনে বের করার প্রয়োজন নেই যে, কতজন আত্মাহুতি দিয়েছে বা কতজন নির্যাতিত হয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের আবেগ জড়িত। কারণ, অসংখ্য মানুষের রক্ত ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের এই রাষ্ট্র। এখানে সংখ্যা বড় নয়- বরং রক্ত দিয়ে কেনা রাষ্ট্র সেটি অনুধাবনই বড় কথা। যারা নির্বাচনী ইশতেহারে বলে যে, তারা প্রকৃত শহীদকে গুনে বের করবে; তাদের আবেগের ঘাটতি রয়েছে। সত্যিকার অর্থে তারা বাংলাদেশকে ধারণ করে না। পত্পত্ করে ওড়া জাতীয় পতাকা তাদের মধ্যে কোন অনুভূতি সৃষ্টি করে না। তারা বরং বারংবার বলার চেষ্টা করে যে, একজন হিন্দুর লেখা জাতীয় সঙ্গীত মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে থাকবে কেন? কিন্তু ওই শিক্ষিত মূর্খরা বিবেচনা করে না যে, বাংলাদেশ ধর্মের ভিত্তিতে সৃষ্টি হয়নি, সৃষ্টি হয়েছে বাঙালী জাতীয়তার ভিত্তিতে। বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনা সৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা অপরিমেয়। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ এটি আপামর বাংলাভাষী মানুষের হৃদয়কে আন্দোলিত করে। রবীন্দ্রনাথ বাংলাকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আর এই মাকে রক্ষার জন্যই বাঙালীরা ব্রিটিশ ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। ‘আমার সোনার বাংলা’কে আবেগ দিয়ে অনুধাবন করলে রবীন্দ্রনাথ কোন্্ ধর্মের সে বিষয়টি বিবেচনায় আসত না। আবেগ ও বিশ্বাসের ব্যাপারে ঘাটতি আছে বলে রবীন্দ্রনাথ শ্রেষ্ঠ বাঙালী কবির পরিবর্তে অবিশ্বাসীদের কাছে হিন্দু রবীন্দ্রনাথ। ঠিক একইভাবে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালী জাতিকে ধীরে ধীরে স্বাধীনতার জন্য তৈরি করেন এবং চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যান। ’৪৮ থেকে ’৭১ পর্যন্ত বিশ্লেষণ করলে মনে হবে সবই কবিতার পঙ্ক্তির মতো সাজানো। অবশেষে চূড়ান্ত ঘোষণা ৭ মার্চ ১৯৭১। এর মধ্যে বাঙালীরা তাঁকে বঙ্গবন্ধু এবং পরবর্তী সময়ে জাতির পিতার আসনে অধিষ্ঠিত করে। বাংলাদেশে বিশ্বাসী বাঙালীর কাছে শেখ মুজিবও এক আবেগের নাম। বাংলাদেশের সুনাগরিক পরিচয় দিতে চাইলে এই বিশ্বাস অটুট থাকা দরকার যে, বঙ্গবন্ধুই অবিচল নিষ্ঠায় বাঙালীকে স্বাধীনতার জন্য তৈরি করেন। যাদের এই বিশ্বাস নেই তারা প্রকৃতপক্ষে সংগ্রাম ও যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট বাংলাদেশে বিশ্বাসী নয়। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। কিন্তু তাঁর নামেই যুদ্ধ চলেছে। যুদ্ধের শুরুতে ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’, একইভাবে যুদ্ধের শেষে ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হতো। বিজয়েও ‘জয় বাংলা’ পরাজয়েও ‘জয় বাংলা’। এমনকি মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও ‘জয় বাংলা’। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় এই ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের গুরুত্ব অপরিসীম। যার ‘জয় বাংলা’য় বিশ্বাস নেই তাদেরই বাংলাদেশের প্রতি আস্থার অভাব। অর্থাৎ সে আবেগ দিয়ে বাংলাদেশকে দেখে না। শুধু আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে কোন সম্পর্ক টিকে থাকে না। যেমন মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে আবেগও প্রবল। মনে রাখা দরকার, আবেগের অপর নাম প্রেম ও ভালবাসা। বাংলাদেশে যাবতীয় সুবিধা ভোগ করব অথচ বাংলাদেশকে আবেগ দিয়ে ভালবাসব না এটা হতে পারে না। যদি আবেগ থাকে তাহলে শহীদের সংখ্যা গোনার প্রয়োজন পড়ে না। বাংলাদেশের প্রতি অনেকের আবেগ নেই বলে তারা ’৭১-এর ঘাতক পাকিস্তানী জেনারেলের মৃত্যুতে শোকবার্তা পাঠায়।

বিগত নির্বাচনেও অবাক বিস্ময়ে দেখলাম একই ঘটনার অবতারণা হলো। অবিশ্বাসীরা ডিজিটাল মাধ্যমে অনেক অপপ্রচারের পাশাপাশি উস্কানিমূলক বক্তব্য ছেড়েছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি বিষয় ছিল ‘দেশটা কারও বাপের না’। এ বিষয়টি নিয়ে অনেকেই লিখেছেন। লুৎফর রহমান রিটন ছড়া লিখে বলেছেন, ‘দেশটা অবশ্যই কারও না কারও বাপের’। দেশটা কারও বাপের না বলতে সরাসরি শেখ হাসিনাকে এবং বাংলাদেশে বিশ্বাসী মানুষকে আঘাত করা হয়েছে। এখানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অবদানকে অস্বীকার করার চেষ্টা করা হয়েছে; যার শুরু করেছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ও ১৯৭১-এর শান্তি কমিটির সদস্য সুরেন্দ্র কুমার সিন্হা। সেটিই পাকিস্তানী ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের মাধ্যমে বাংলাদেশে অবিশ্বাসী রাজাকার, আলবদরদের পুত্র-কন্যাদের মুখ দিয়ে স্লোগানের সুরে প্রচারিত হয়েছে। এই প্রচারে বাংলাদেশে বিশ্বাসী ভোটাররা বিভ্রান্ত হয়নি। দেশটা যে বঙ্গবন্ধুর ঐন্দ্রজালিক অনুপ্রেরণায় লাখ লাখ মানুষের রক্ত ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮-এ। আর প্রকৃতপক্ষে যারা এদেশে বিশ্বাস করে না তারা পরাজিত হয়েছে। এ জন্য অবিশ্বাসীদের এই দেশে থাকাটা বঞ্ছনীয় নয়। তাদের উচিত তাদের চিন্তার শেকড় যেখানে গ্রোথিত সেখানে অর্থাৎ পাকিস্তানে চলে যাওয়া। অবিশ্বাসীরা বঙ্গবন্ধুকে মানে না। তার অর্থ তারা বাংলাদেশকে মানে না। অতএব, বাংলাদেশটি তাদের নয়। তাদের পূর্ব পুরুষ রাজাকার-আলবদররা যেভাবে খুন, ধর্ষণ ও রাহাজানির সঙ্গে যুক্ত ছিল, তারাও সুযোগ পেলে তা-ই করে এবং ভবিষ্যতেও করবে। এজন্য তাদের বারংবার হারানো প্রয়োজন।

লেখক : উপাচার্য, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়