১৯ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি

পাকিস্তান পর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা ঘোষণার পরবর্তী সময়ে পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলেন, ‘পূর্ব বাংলা শ্মশান কেন’ শিরোনামে। অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার বাংলার মানুষ উপলব্ধি করতে থাকে তার দুরবস্থার মূলে রয়েছে পাকিস্তানী সামরিক শাসকগোষ্ঠীর শোষণের অভিযাত্রা। সেই বৈষম্য বাঙালীকে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার পথে ধাবিত করেছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সহায়তা তেমন পাওয়া না গেলেও জনগণের মনোবল আর সাহস পরিস্থিতিকে বদলে দিতে থাকে। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক জান্তা শাসকরা উন্নয়নের গতিকে থামিয়ে দিয়ে বিদেশী সাহায্য লুটপাট আর দুর্নীতর এমনই বিস্তার ঘটায় যে, দেশের অর্থনীতির অবস্থা হয় ভঙ্গুর। দাতা দেশ ও বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের কাছে নতজানু হয়ে ঋণ, অনুদান, সাহায্য পেতে হয়। দুর্বল অর্থনীতির কারণে উত্তরবঙ্গে অনাহারে অর্ধাহারে অনেক মানুষ মারা যায়। সেই সময় বাংলাদেশকে বলা হতো ‘তলাবিহীন ঝুড়ি।’ কিন্তু একুশ শতকের প্রথম আট বছর শেষে অর্থনীতির অবস্থা পরিবর্তন হতে থাকে দক্ষ শাসন আর বাস্তব পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়নে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে এক অনন্য অবস্থানের দিকে ধাবিত হতে থাকে। টানা দশ বছরের শাসনে দেশ আজ উন্নত দেশের পথে যাত্রা করেছে। মধ্যম আয়ের দেশ বাংলাদেশ থেকে মঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, ভিক্ষা, দারিদ্র্য নামক শব্দগুলো ক্রমশ অপসৃয়মাণ হয়ে গেছে। তাই দেখা যাচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে আরও দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। চলতি মূল্যের ভিত্তিতে ১৯৩ দেশের বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বের মধ্যে ৪১তম। আগের বছর যা ছিল ৪৩তম। তবে ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান ৩০তম। আশার কথা যে, ২০৩২ সালের মধ্যে বিশ্বের বড় ২৫ অর্থনীতির দেশের একটি হবে বাংলাদেশ। তখন বাংলাদেশ হবে ২৪তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ ১২ দেশকে টপকে গেছে। আগামী ১৫ বছরে টপকে যাবে আরও ১৭ দেশ। এই যাত্রার প্রথম পাঁচ বছরে পাঁচ দেশকে টপকে যাবে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ হবে ৩৬তম অর্থনীতির দেশ। পরের পাঁচ বছর আরও নয় দেশকে পেরিয়ে ২০২৮ সালে হবে ২৭তম বড় অর্থনীতির দেশ। পরের পাঁচ বছরে টপকাবে আরও তিন দেশ। এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে। বিশ্বের যে কোন দেশের অর্থনীতিকে মূল্যায়নের মাপকাঠি হলো মোট দেশের উৎপাদন বা জিডিপি। এর আকার মূল্যায়ন করা হয় চলতি মূল্যের ভিত্তিতে এবং ক্রয় ক্ষমতার পদ্ধতিতে।

লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিক এ্যান্ড বিজনেস রিসার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮-২০৩৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ গড়ে সাত শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা। এর ফলে দেশটি ১৯ ধাপ এগিয়ে যাবে। প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণে বলা হয়, তৈরি পোশাক রফতানি, শক্তিশালী রেমিটেন্স বৃদ্ধি, ভারতীয় বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, অভ্যন্তরীণ ভোগ ব্যয় ও সরকারী ব্যয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ উপকৃত হচ্ছে। প্রায় ৪৩ শতাংশ বাংলাদেশী কৃষিকর্মের সঙ্গে যুক্ত, যাদের বেশিরভাগই ধান ও পাট উৎপাদন করে থাকে। এছাড়া দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভুট্টা, শাকসবজি ও গমের উৎপাদনও ভূমিকা রাখছে। অবকাঠামো খাতে অর্থায়ন ও রাজস্ব বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তার জন্য সরকারকে নতুন নতুন খাতের দিকে গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কেননা, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সঙ্কট আরও গুরুতর আকার ধারণ করছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে বিনিয়োগ ও উৎপাদন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বিনিয়োগে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিউক) ওয়ানস্টপ সার্ভিস বা এক দরজায় সেবা চালু করতে পারলে বিনিয়োগের ক্ষেত্র হবে সম্প্রসারিত। অনলাইনের সেবা পাবার ব্যবস্থা জরুরী। আপাতত ১৮ সেবা দেয়ার মাধ্যমে এই সার্ভিস যাত্রা করতে যাচ্ছে এ মাসেই। এতে বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তি ও ব্যয় কমবে। এ ব্যবস্থায় অবৈধ লেনদেনের কোন সুযোগ থাকবে না। দীর্ঘদিন ধরেই এই সার্ভিস চালুর কথা বলাবলি হয়ে আসছিল। এবারই প্রথম আনুষ্ঠানিক যাত্রা করতে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশে কার্যকর পদেক্ষপ নেয়ার বিকল্প নেই।