১৯ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নিরাপদ সড়ক নিয়ে আরও কিছু কথা

  • মতিলাল দেব রায়

এই লেখাটি যখন লিখছিলাম তখন জানতে পারলাম মালিবাগ-রামপুরা রোডে চৌধুরীপাড়া আবুল হোটেলের সামনে দুই বাসের প্রতিযোগিতার মধ্যে দু’জন কিশোরী মৃত্যুবরণ করেছে। এই দু’জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ছবি পত্রিকায় দেখে আবারও নিরাপদ সড়ক নিয়ে না লিখে পারলাম না।

বাবা-মায়ের অভাবের সংসারে সুখ ফেরাতে ঢাকায় এসেছিল বগুড়ার গাবতলী উপজেলার কিশোরী মিম আক্তার (১৬)। নতুন বছরের প্রথম দিনটিতেই যোগ দিয়েছিল আল রাফি গার্মেন্টসে। দুপুরের বিরতিতে সহকর্মী নাহিদ পারভীন পলির (১৯) সঙ্গে মগবাজারের পূর্ব নয়াটোলার বাসা থেকে খাবার খেয়ে কর্মস্থলে ফিরছিল তারা। পথেই যাত্রীবাহী সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাস তাদের নিষ্ঠুরভাবে পিষে মারে। ওইদিন দুপুরে রামপুরার চৌধুরীপাড়ায় ওই ঘটনার পর সন্ধ্যা পর্যন্ত এলাকায় ও আশপাশের সড়ক অবরোধ করে নির্বিচারে গাড়ি ভাংচুর করেছেন গার্মেন্টস শ্রমিকরা। সন্ধ্যায় দুটি বাসে আগুন দিয়েছেন তারা। শ্রমিকদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইট-পাটকেলে উভয়পক্ষের অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। নিহত দু’জন আল রাফি গার্মেন্টসের শ্রমিক।

কেন বারবার বলা সত্ত্বেও চালকরা রাস্তার ওপর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় তা ভেবে পাই না। দেশের আনাচে-কানাচে স্থানীয়ভাবে কিছু যানবাহন যেমন রিক্সা, লাইটেস, পুরনো ট্যাক্সি, পুরনো বেবিট্যাক্সি, টেম্পো, পুরনো পিকআপ সব সময় উপজেলার বিভিন্ন স্থানে যাত্রী আনা-নেয়া করে এবং যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করে। একটি সিএনজিতে ৬ জন প্যাসেঞ্জার এক ট্রিপে গাদাগাদি করে বসিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। এদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাস্তায় কোন ট্রাফিক পুলিশও দায়িত্বে নেই। শহরে যেমন ট্রাফিক পুলিশ আছে, মফস্বলে ট্রাফিক পুলিশ নেই। তাই দেশের ট্রাফিক আইন এক কথায় বলে গ্রাম বা মফস্বল শহরে ট্রাফিক আইন কেউই মেনে চলে না। ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নের কোন পদক্ষেপ চোখে দেখা যায় না।

নসিমন/করিমন/চান্দের গাড়ি/ভটভটি সারাদেশে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন সাইজের অনেক বছরের পুরনো লেগুনা এবং অন্যান্য যানবাহন পুরনো গাড়ির যন্ত্রাংশ দিয়ে মেরামত করে স্থানীয়ভাবে ব্যবসা করছে। এই গাড়িগুলোর নাম বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন রকম। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত প্রায় ৫২ কিলোমিটার সমুদ্রের কিনারে কিনারে বালুর ওপর যে গাড়িগুলো বাহারছড়া বন বিভাগের অফিসের কাছে চলে যায় সেগুলোকে চান্দের গাড়ি বলা হয়। এদের না আছে ফিটনেস সার্টিফিকেট, চালকদের না আছে ড্রাইভিং লাইসেন্স। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো ফৌজদারি অপরাধের শামিল।

সারাদেশের সড়ক নেটওয়ার্ক অর্থাৎ আন্তঃনগর, আন্তঃজেলা, আন্তঃউপজেলা ও আন্তঃগ্রামকে একটি নেটওয়ার্কের আওতায় এনে এখানে নতুন ট্রাফিক ব্যবস্থার প্রচলন করা দরকার। শুধু শহরে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে গ্রামকে বাদ দিয়ে তাহলে কোন ব্যবস্থাই টেকসই বা সাসটেইনেবল হবে না। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে পরিচালিত করে সড়ক নিরাপত্তা পর্যায়ক্রম নিশ্চিত করা খুবই জরুরী। প্রাথমিকভাবে গ্রামীণ বা উপজেলা ট্রাফিক ব্যবস্থাকে পরীক্ষামূলক পরিচালিত করে সেখান থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে পরবর্তী সময় পরিকল্পনামাফিক স্থায়ী এবং টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ভাল হয়। সরকার সকল গ্রামকে শহরে রূপান্তর করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছে। এই ট্রাফিক ব্যবস্থায় ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। সারাদেশে জনসংখ্যা, যানবাহনের সংখ্যা ইত্যাদির হিসাব মাথায় রেখে নির্দিষ্ট দূরবর্তী স্থানে পেট্রোল পাম্প সরকারী, আধা-সরকারীভাবে স্থাপনের ব্যবস্থা করলে যোগাযোগে আরও গতি আসবে। সারাদেশে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে জিপিএস পদ্ধতি চালু করলে যে কেউ জিপিএসের মাধ্যমে দেশের সকল স্থানে যেতে পারবে।

সকল বেসরকারী এবং বিআরটিসি বাসে আকার অনুযায়ী কতজন যাত্রী বসতে পারবে তার সংখ্যা বাসের ভেতরে দর্শনীয় স্থানে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক উল্লেখ করে দিলে বেশি যাত্রী নেয়া বন্ধ হবে। বাসের ভেতরের কন্ডাক্টর কর্র্তৃক ভাড়া আদায় বন্ধ করলে বাসের ভেতর যাত্রীগণ শান্তিতে বসতে পারবেন। বাসের টিকেট যাত্রীগণ বাসে উঠার পূর্বে কাউন্টার থেকে সংগ্রহ করবেন, যা পৃথিবীর সকল দেশে প্রচলিত। রাস্তার অবস্থা অনুযায়ী গতি সীমাবদ্ধ করে দিতে হবে। সকল যানবাহন হবে লেফ্ট হ্যান্ডেড ড্রাইভ। জায়গায় জায়গায় স্পিড লিমিট ব্রেকার স্থাপন করে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

বাসের ভেতর হকার ওঠা সম্পূর্ণ বন্ধ করে অনাকাক্সিক্ষত মানুষের আনাগোনা বন্ধ করা জরুরী। ড্রাইভারদের জন্য বসার স্থান সীমানা দিয়ে চিহ্নিত করে দিতে হবে। ড্রাইভারকে কখনও অসম্মানভাবে ডাকা যাবে না। গাড়ি যখন চালান একজন ড্রাইভার ৭০-৮০ কিলোমিটার গতিতে, তখন কিন্তু তিনি এই গাড়ির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাই তাকে কোন সময় খাটো করে দেখা যাবে না। আইন-নিয়ম-কানুন সকলের জন্য সমান ও প্রযোজ্য।

খোলা ট্রাকে মালামাল পরিবহন করা যাবে না। খোলা ট্রাকে শ্রমিক ও যাত্রী পরিবহন সম্পূর্ণ বন্ধ করা দরকার। সড়ক দুর্ঘটনা হলে ট্রাকের ওপরে থাকা অনেক শ্রমিকের মহামূল্যবান জীবন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

মালিক ও শ্রমিক পক্ষকে ১ বছর সময় দিয়ে উপজেলা পর্যায়ের রাস্তা থেকে ফিটনেসবিহীন যানবাহন উঠিয়ে নিয়ে ধ্বংস করে দিতে হবে। এর পরিবর্তে নতুন যানবাহন চালু করলে যাত্রীরা নিয়মিত চলাচল করতে পারবেন। কারণ, ওই সকল পুরনো যানবাহন একদিকে নিয়মিত পরিবেশ দূষণ করে যাচ্ছে, আর কোন বিকল্প যানবাহন না পেয়ে কালো ধোঁয়া বেরোনো যানবাহনগুলোতে যাত্রীগণ উঠতে বাধ্য হচ্ছেন এবং ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসে যাত্রীসাধারণ বিভিন্ন হার্টের সমস্যা ও ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

যে সকল ড্রাইভার যানবাহন উপজেলায় চালান তাদের কোন লাইসেন্স নেই। তারা ওস্তাদের কাছ থেকে গাড়ি চালানো শিখে তার অনুমোদন নিয়ে দেশের ভেতরে নিজস্ব আইনেই গাড়ি চালাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। এদেরকে কিছু বলার নেই। যাত্রীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে চলাচল করেন। সাধারণ যাত্রীগণ এইদিকে খেয়াল দেন না হয়ত অজ্ঞাতসারে বা জ্ঞাতসারেই।

উপজেলার ভেতরে চলাচলকারী অসংখ্য যানবাহনে দেখা যায় হেলপার হিসেবে ১৮ বছরের নিচে শিশুরা কাজ করছে। তাদের দিয়ে এক শ্রেণীর ড্রাইভার পান ও সিগারেট/বিড়ি আনান। তারা গাড়ি চালু রেখে থামানো অবস্থায় দৌড়ে গিয়ে পান/বিড়ি কিনে দৌড়ে আবার চালু অবস্থায় গাড়ির পেছন দিকে ওঠে। প্রতিটি মুহূর্তে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চাকরি করে দু’বেলা ভাত জোগাড়ের জন্য। এ শিশুদের উদ্ধার করে সরকারী সহযোগিতায় তাদের স্কুলে এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করলে শিশুশ্রম ক্রয়-বিক্রয় ক্রমান্বয়ে বন্ধ হবে। গাড়ির চালকদের গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন বন্ধ রাখতে হবে। সম্ভব হলে পাশে আরেকজন চালক রাখুন। ধূমপান থেকে বিরত থাকুন। রাস্তায় নিরাপদ চলতে হলে যেমন ড্রাইভারের দায়িত্ব আছে, ঠিক সেইসঙ্গে গাড়ির মালিক, গাড়িতে যাতায়াতকারী যাত্রীগণ, পথচারী, কন্ডাক্টর ও সংশ্লিষ্ট সকলের সামগ্রিক এই সমন্বিত দায়িত্ব পালন করা অপরিহার্য। শুধু ড্রাইভারদের ওপর দোষ চাপালে চলবে না। সকলকে ভেবে দেখতে হবে নিজ দায়িত্ব কি? অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে চলা আমাদের স্বভাবগত দোষ। এ পথ পরিহার বাঞ্ছনীয়।

বাস ড্রাইভিং একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। তাই এই পেশাকে কোন অবস্থায়ই অবহেলা করা যাবে না। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে বাস ড্রাইভারকে অনেক নিয়মের মধ্যে চলতে হয়। প্রতিদিন ৮ থেকে ১২ ঘণ্টার বেশি কাজ একদিনে করতে দেয়া হয় না। প্রতি ৮ ঘণ্টায় ৩০ মিনিট বিশ্রামের জন্য রাখা হয়। ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা চালানোর পর তার রেস্টের প্রয়োজন হয়। যদি এর বেশি ড্রাইভ করে তাহলে ঘুমের ব্যাঘাত হয় এবং পরবর্তী সময় এলকোহলের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। এই অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বাস ড্রাইভারদের জন্য প্রতিদিন কতক্ষণ তারা কাজ করতে পারবে তা আইন করে দিলে সেটা সকলের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে।

বাস ড্রাইভারদের জন্য বছরের একটি দিন নির্ধারণ করা দরকার যেদিন পালন করা হবে বাস ড্রাইভার দিবস হিসেবে। যেদিন তাদের শুধু প্রশংসা করার দিন। তাতে তাদের উৎসাহ বাড়বে। আলোচনা সভার আয়োজন করা যেতে পারে। তাদের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে আরও অধিক সচেতন করার জন্য ট্রাফিক সপ্তাহের সঙ্গেও তাদের যুক্ত রাখা যায়।

বৈধ লাইসেন্সধারী ড্রাইভারদের চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ খুবই প্রয়োজন। চাকরিকালীন প্রশিক্ষণের সময় ট্রাফিক আইন, রোড আইন, সড়ক নিরাপত্তা, যাত্রী নিরাপত্তা এবং জরুরী অবস্থায় যোগাযোগ করার নিয়ম ইত্যাদি সম্যক ধারণা দিয়ে সচেতন করা বাঞ্ছনীয়। এই প্রশিক্ষণের স্থান হবে জেলাভিত্তিক এবং উপজেলাভিত্তিক। প্রত্যেককে একটা কোর্স পূর্ণ করেছে মর্মে সার্টিফিকেট দিতে হবে। সকল পেশার চাকরির জন্য যেমন প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, ঠিক তেমনি ড্রাইভারদের জন্যও চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

সকল উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশে সরকারী-বেসরকারী চাকরিজীবীদের একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর চাকরি থেকে অবসর এবং অবসরের পর যতদিন পর্যন্ত সক্ষম থাকবে ততদিন কয়েকটি জরুরী বিভাগ ছাড়া সকল বিভাগে আবার চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেন। আমাদের দেশেও অবসরের বয়স নির্ধারণ করা আছে; কিন্তু বাস ড্রাইভারের একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা ঠিক করে দেয়া যুক্তিযুক্ত হবে। শুধু যারা বাস বা যাত্রীবহনকারী যানবাহনের নয়, অন্যান্য যানবাহনের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হবে। বাস ড্রাইভারদের পদ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ। তাই অন্যান্য চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার পূর্বে দরখাস্ত/আবেদন করতে হয়। পরীক্ষা দিতে হয়। পাস করলে নিয়োগপত্র এবং দায়িত্ব লিখিতভাবে দেয়া হয়। সেইরকম বাস ড্রাইভারদের জন্যও আবেদন, পরীক্ষা ও নিয়োগপত্র দিয়ে চাকরির দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলে তাদের দায়িত্ববোধ বাড়বে। অন্য পেশার মতো চাকরিকালীন সকল সুযোগ-সুবিধা, ছুটি ইত্যাদি দেয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। তবেই আশা করা যাবে সড়ক নিরাপত্তা। যাত্রীদের যেমন নিরাপত্তা দরকার, তেমনি ড্রাইভারদেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে আরও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

বাসের মালিকগণ গাড়ি ক্রয় করে রাস্তায় শুধু নামালেই তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সঠিক ড্রাইভার, বৈধ ড্রাইভারসহ যাত্রী পরিবহনের জন্য যে যে যোগ্যতা থাকা দরকার, তার সবদিক মূল্যায়ন করে তবেই ড্রাইভারদের হাতে গাড়ি তুলে দিবেন। ড্রাইভার যদি দুর্ঘটনায় পড়েন তবে এ বিষয়ে গাড়ির মালিকও কোন না কোনভাবে দায়ী। কারণ, যে ড্রাইভার বৈধ লাইসেন্স ছাড়া বাস চালান মালিক নিশ্চয়ই তা জানেন। গাড়ির যদি ফিটনেস সার্টিফিকেট না থাকে তাহলে দুর্ঘটনা ঘটলে মালিকই দায়ী থাকবেন। শুধু গাড়ির ড্রাইভারদের এককভাবে দায়ী করলে চলবে না। দুর্ঘটনার জন্য ড্রাইভার, মালিক, হেলপার, ট্রাফিক ব্যবস্থা, পুলিশ, পথচারী, রিক্সা, সর্বোপরি রোডস্ এ্যান্ড হাইওয়ে, বিআরটিএ, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সংস্থা কোন না কোনভাবে সবাই এর জন্য দায়ী। কেউই দুর্ঘটনার দায়িত্ব পাশ কেটে যেতে পারেন না।

যতদূর জানি, ঢাকা শহরে বাস ড্রাইভারদের মাসিক বেতন দেয়া হয় না। তারা যাত্রীদের কাছ থেকে যে ভাড়া আদায় করেন তার ওপর ভিত্তি করে কমিশন পান। তাই যাত্রী উঠানোর জন্য প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং গাড়ির নিচে মানুষ চাপা দেন। তাদের অত্যধিক সময় কাজ করানোর পর কিন্তু খুবই কম অর্থ দেয়া হয়। প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রত্যেক বাসে অন্ততপক্ষে দুটি সিট রিজার্ভ রাখা প্রয়োজন। পৃথিবীর সকল উন্নত দেশে প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদাভাবে দুইজন বসার সিট সংরক্ষিত থাকে। প্রতিবন্ধী যাত্রী উঠলে তাদের ওই জায়গায় বসতে দেয়া হয়। প্রতিবন্ধীরা যাতে হুইল চেয়ার নিয়ে উঠতে পারে তার জন্য একটি সিঁড়ি ড্রাইভারের পায়ের কাছে বসানো থাকে। ড্রাইভাররা বাস থামলে এই আলাদা সিঁড়িটি দরজার সামনে লাগিয়ে দিতে পারেন। ড্রাইভারদের বসার জায়গা কাঁচের দেয়াল দিয়ে আলাদা করে দিতে হবে, যাতে করে ড্রাইভারকে গাড়ি চলাকালীন যাত্রীগণ বিরক্ত না করতে পারে। বাসের ভেতর যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্যই বাসে ড্রাইভারের সামনে একটি ক্যামেরা থাকবে, যাতে করে গাড়ি চালানো অবস্থায় গাড়ির ভেতরে সকলের অবস্থান ড্রাইভার খেয়াল রাখতে পারেন। দেশের সকল জেলা রুটের সঙ্গে যোগাযোগকারী আন্তঃজেলা সড়কগুলোতে ট্রাফিক লাইট, সিগন্যালের আওতায় আনতে হবে। বর্তমানে ট্রাফিক আইন শুধু ঢাকা ও জেলা শহরে দেখা যায়। পর্যায়ক্রমে ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট ঢাকা শহরের বাইরে সকল শহর ও গ্রাম পর্যায়ে ব্যবস্থা করতে হবে। ঢাকায় ট্রাফিক সিগন্যাল, ট্রাফিক লাইট থাকবে আর দূরপাল্লার যাত্রায় কোন ট্রাফিক সিগন্যাল, ট্রাফিক লাইট না থাকলে কি করে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এবং নিরাপদ সড়ক হবে? নিরাপদ সড়ক বাংলাদেশের সকল নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করা সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য। দুর্ঘটনার জন্য অনেক সময় পথচারীও দায়ী থাকেন। ব্যস্ততম রাস্তায় যখন ৬০-৭০ মাইল বেগে একটি বাস/ট্যাক্সি চলছে, তখন যদি একজন পথচারী রাস্তার ওপর দিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হতে চায় তা হলে ড্রাইভার গাড়ি কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন? পথচারীকে বাঁচাতে হলে বাসের সকল যাত্রী/ড্রাইভারসহ সকলে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন। তাই আন্তঃজেলা সড়কে রাস্তা ক্রস করতে হলে ডানে এবং বামে দেখে গাড়ির অবস্থান জেনে পা বাড়াবেন। সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক। বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ কমানোর জন্য বিকল্প চিন্তা করা প্রয়োজন। প্রায়ই শোনা যায় ট্রাক ও সিএনজি চালিত অটোরিক্সা এবং বেবিট্যাক্সির মুখোমুখি দুর্ঘটনা ঘটে। তাই এই দুই ভিন্ন ধরনের যানবাহনের মধ্যে সংঘর্ষের কারণ চিহ্নিত করে বিকল্প ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

লেখক : আহ্বায়ক, ক্যাম্পেন ফর রোড সেফ্টি, নিউইয়র্ক