২২ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

একদার প্লাবনভূমি চলনবিল এখন ফসলের মাঠ

  • খরস্রোতা নদীগুলো মরাগাঙে পরিণত

সমুদ্র হক ॥ দূর অতীতের সেই চলনবিল আজ আর নেই। নিকট অতীতে বাঙালীর ঐতিহ্যের এই বিল যেটুকু অস্তিত্ব ধরে রেখেছিল তাও আর থাকছে না। একদার প্লাবনভূমি চলনবিল আজ ফসলের মাঠ ও শুঁটকি মাছের আধার। স্থানীয় লোক, পানি বিশেষজ্ঞ এবং প্রবীণদের মতে, প্রকৃতির পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক অপরকিল্পিত প্রকল্প বাস্তবায়ন দেশের বৃহত্তর চলনবিল মরাবিলে পরিণত হওয়ার অন্যতম কারণ। এর মধ্যেও আশার কথা শোনলেন বিলপারের রাজনৈতিক সচেতন প্রবীণ আশরাফ আলী। জানালেন সরকার ব-দ্বীপ প্রকল্প (ডেল্টা প্রজেক্ট) বাস্তবায়নের যে উদ্যোগ নিয়েছে তার মধ্যে চলনবিলকে অন্তর্ভুক্ত করে নদী কেন্দ্রিক জীবনধারা গড়ে তোলা যায়। চলনবিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ছিল খরস্রোতা অনেক নদী ও খাল। এর মধ্যে করতোয়া, ফুলজোড়, আত্রাই, চিকনাই, বড়াল, গুড়নাই, হিজলি, তুলসি, ইছামতি, নন্দকুজা, গুমানি, চৈচুয়া, ভাদাই, বানগঙ্গা, কুমারডাঙ্গাসহ আরও কয়েকটি নদী উল্লেখ করা যায়। যেগুলো এখন মরাগাঙ।

বিলপাড়ের মানুষের জীবনধারার পরিবর্তন এসেছে। একদা যারা ছিল মৎস্যজীবী (জেলে) সেই পরিবারের পুরুষ সদস্যের বেশিরভাগই মাইগ্রেটেড হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে বিকল্প পেশা খুঁজে নিয়েছে। জেলে পরিবারের কিছু অংশ চলনবিলের যে অস্তিত্ব এখনও আছে তারা মাছ ধরে শুঁটকি বানিয়ে নতুন পেশার সৃষ্টি করেছে। বিলের শুকনো ভূমির বিভিন্ন অংশে গড়ে উঠেছে শুঁটকির চাতাল। বিলপাড়ের শুটকি এখন বিদেশেও যাচ্ছে। শুঁটকি চাতালের বেশিরভাগই নারী কর্মজীবী। এই নারীরাই চলনবিলের শুকনো ভূমিতে সকল ধরনের চাষাবাদ করছে। এই ভূমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকায় ধান পাট গম সবজিসহ সকল ফসল অল্প সময়েই ফলে। বিলের কিছু অংশে ঝিনুক বেচাকেনাও হচ্ছে। পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত চলনবিলের কৃষিকাজসহ যাবতীয় কাজ করছে নারী। সেখানে পুরুষ কৃষক ও শ্রমিকের আধিক্য কম। নদী কেন্দ্রিক অর্থনীতির বলয় ক্রমেই পরিণত হচ্ছে শুকনো ভূমির অর্থনীতির বলয়ে।

ইতিহাস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলনবিলের নামের সূত্রপাত চলন্তবিল থেকে। এই বিলের বিশাল জলাশয় ছিল মৎস্য ভা-ার। শুকনো অংশ ছিল শস্যভান্ডার। শীত মৌসুম পরিণত হতো পরিযায়ী পাখির অভয়ারণ্যে। ১৯০৯ সালের পাবলিক ওয়ার্কাস ডিপার্টমেন্টের এক জরিপে চলনবিলের আয়তন ১ হাজার ৮৮ বর্গ কিলোমিটার। এক শ’ বছরের বেশি সময় পর চলনবিলের আয়তন এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩শ’ ৬৮ বর্গ কিলোমিটারে। পানি বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ শাসনমলে চলনবিলের মধ্য দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সিরাজগঞ্জ থেকে পদ্মার ওপর হার্ডিঞ্জ রেল ব্রিজ হয়ে ওপারে রেলপথ নির্মাণ করে ভারতের কলকাতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হয়। তখন থেকেই বিলের অপেক্ষাকৃত উঁচু উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে ভাটা পড়া শুরু হয়। ক্রমেই আয়তন সঙ্কীর্ণ হতে থাকে।

একটা সময় বড় স্টিমার, বড় মহাজনী নৌকা চলত বিলের ওপর দিয়ে। বিল সংযোগের অধিকাংশ নদী শুকিয়ে এখন ফসলের মাঠ। যেখানে অনেক সময় ভর বর্ষা মৌসুমেও পানি থাকে না। নৌচলাচল কমে যাওয়ায় খেয়াঘাটগুলোও রুদ্ধ হয়ে পড়ছে। জলাভূমি কমে যাওয়ায় জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির অনেক মাছ।

চলনবিল ঘিরে পদ্মা ও যমুনার সংযোগকারী বরাল নদীর মুখে ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত স্লুইজ গেট, ক্রস বাঁধ, বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, বরালের পানি ব্যবহার, খাদ্য উৎপাদন, পানি প্রবাহ বাড়ানো, নৌপথ সম্প্রসারণ। বছর তিনেক কিছুটা সুফল মিললেও এরপর বিপর্যয় ঘটতে থাকে। এক সময় পদ্মা ও বরাল প্রবাহ কমে যায়। বরাল শুকনো মাঠ পরিণত হয়। প্রভাব গিয়ে পড়ে নারদসহ কয়েকটি ছোট নদীর ওপরে। নদী ভূমির অধিকাংশ এখন ভূমিগ্রাসী চক্রের দখলে। সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে বনপাড়া পর্যন্ত মহাসড়ক নির্মাণের পর পানি প্রবাহ আরও কমেছে। প্রবাহের প্রতিবন্ধকতার কারণে পলি জমে দ্রুত ভরাট হচ্ছে বিলের জলাভূমি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) এক জরিপে বলা হয়েছে, বিলে পানি সরবরাহকারী নদী দ্বারা বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট পলি জমা হয়। এর মধ্যে ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট পলি বিভিন্ন নদী ও খাল দিয়ে বের য়ে যায়। বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট পলি জমা হয়।

চলনবিলকে রক্ষায় বছর দুয়েক আগে নদী বিষয়ক টাস্কফোর্স গঠিত হয়। টাস্কফোর্স কিছুটা উদ্যোগ নিলে চাটমোহর এলাকায় পাউবোর কয়েকটি স্থাপনা সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর আর এগোয়নি।