১১ জানুয়ারী ২০১৯

কয়েক হাজার বাংলাদেশী কর্মী কুয়েতে গিয়ে বেকায়দায়

ফিরোজ মান্না ॥ দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে কয়েক হাজার বাংলাদেশি কর্মী কুয়েতে বেকায়দায় পড়েছেন। প্রতিজন কর্মীর কাছে চার থেকে সাড়ে ৪ লাখ করে টাকা নিয়েছে দালাল চক্র। তারা কর্মীদের ভুয়া কোম্পানির ঠিকানায় কুয়েত নিয়েছে। কিন্তু তাদের কোন চাকরি মেলেনি। এই কর্মীদের কেউ কেউ টাকা তুলতে লুকিয়ে কাজ করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন। কুয়েত সরকার তাদের দেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে খবর মিলেছে। কুয়েত সরকার দালাল চক্রকে গ্রেফতারের জন্য দেশটিতে অভিযান শুরু করেছে। কয়েকটি দেশের নাগরিক মিলে দালাল চক্রটি গড়ে তুলেছে। দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে-বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিসর, ভারত ও সিরিয়া।

সূত্র জানিয়েছে, কয়েকটি দেশের দালালদের তালিকা করেছে কুয়েত সরকার। মানব পাচার বন্ধ করতে কুয়েত সরকার এবারই প্রথম এমন একটি তালিকা তৈরি করল। দালালদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ মাঠে নেমেছে। কুয়েতের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। ইতোমধ্যে কয়েক জন দালালকে গ্রেফতার করেছে। তবে তারা কে কোন দেশের নাগরিক জানা যায়নি। কুয়েতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসও বিষয়টি নিয়ে খোঁজ খবর করছে। তবে এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কিছু জানে না।

সূত্র জানিয়েছে, দালাল চক্র তিনটি ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে প্রবাসীরা কুয়েতে প্রবেশ করেছে। ‘ফ্রি ভিসার নামে ভুয়া ভিসায়’ কয়েক হাজার কর্মীকে কুয়েতে নিয়েছে তারা। এই প্রবাসীদের কোন রকম চাকরি ঠিক না করেই দেশটিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দালাল চক্র ৩ হাজারের বেশি কর্মীকে দেশটিতে নিয়েছে। প্রতিজন কর্মীর কাছ থেকে সাড়ে ৩-সাড়ে ৪ হাজার কুয়েতি দিনার (বাংলাদেশী মুদ্রায় ৪ লাখ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টাকা) দিয়েছে।

কুয়েতি সংবাদ মাধ্যম আল-আনবা দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েকদিনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ৯০ জনের বেশি কর্মী গ্রেফতার হয়েছে। পুলিশ তাদের কাছে কোন বৈধ কাগজপত্র পায়নি। পরে জিজ্ঞাসাবাদে কর্মীরা জানিয়েছে তারা দালালের মাধ্যমে কুয়েতে এসেছেন। এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো কর্মীদের কাজ থেকে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। মানব পাচার বিষয়ক প্রসিকিউটর অব ক্রাইমস ওই তিন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারকে তলব করে। তাদের কাছ থেকে পুরো ঘটনা জানার পরই কুয়েত সরকার তিন হাজার দালালের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে। তালিকা তৈরির পর এখন পুলিশ তাদের গ্রেফতারের জন্য মাঠে নেমেছে। বেশ কয়েক জন দালালকে পুলিশ গ্রেফতারও করেছে। গোটা চক্রকে গ্রেফতার করার জন্য পুলিশ সাঁরাশি অভিযান পরিচালনা করছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছে। আবার অনেকেই তুরস্কে আশ্রয় নিয়েছে। মানব পাচারের মূলহোতা হিসেবে এক সিরিয়ান নাগরিককে শনাক্ত করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই ব্যক্তিই তিনটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশাল সংখ্যক কর্মীকে কুয়েতে নিয়েছে। তাদের কোন কাজ না দিয়েই দেশটিতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তবে ওই সিরিয়ান নাগরিকের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

সূত্র জানিয়েছে, ডিরেক্টরেট জেনারেল অব রেসিডেন্স এ্যাফেয়ার্স জিব আল-শুইয়ুখ পরিদর্শন করেন। ওই সময় কয়েকজন কর্মীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা এই ঘটনার কথা জানান। ডিরেক্টরেট জেনারেল অব রেসিডেন্স এ্যাফেয়ার্স বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। ওই তিনটি কোম্পানি একই উপায়ে তিন হাজারের বেশি সংখ্যক মানুষকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কুয়েতে নিয়েছে। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করা হয়। কুয়েতে গত কয়েক বছরে কি পরিমান মানব পাচার হয়েছে তার চিত্র উঠে এসেছে। অবৈধ ভিসা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপর থেকেই কুয়েতে অবৈধ ভিসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

কুয়েত থেকে সূত্র জানিয়েছে, দালাল চক্র তুরস্ক থেকে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছে। কুয়েতে অবস্থানকারী দালালরা সাধারণ কর্মী হিসেবে কাজ করে। কুয়েতে তাদের চেনা খুব মুশকিল। কিন্তু যারা গডফাদার হিসেবে কাজ করছে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তবে কুয়েতে যে তিনটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান রয়েছে-তাদের মালিকরা আবার কুয়েতি নাগরিক। তাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তলব করেছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে কুয়েত। তালিকা অনুযায়ী ৩ হাজারের বেশি দালালকে আটক করার জন্য পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তাদেরকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে কুয়েত সরকার।