২৪ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভারত থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসছে রোহিঙ্গারা

জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ ভারতে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। উদ্যোগের অংশ হিসেবে সম্প্রতি সাত রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তরও করা হয়। বিষয়টি সেখানে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। মিয়ানমারে ফিরে আবার নির্যাতনের মুখে পড়ার ভয়ে আতঙ্কিত রোহিঙ্গারা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। সরেজমিন এবং টেকনাফে বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এর সত্যতা মিলেছে। খবর ওয়েবসাইটের।

উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ মোহাম্মদ রেজাউল করিম ভারত থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের প্রবেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, এক সপ্তাহে ভারত থেকে পালিয়ে আসা ৭৪ রোহিঙ্গাকে ট্রানজিট পয়েন্টে রাখা হয়েছে। এছাড়া বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আরও ১৮ রোহিঙ্গা ভারত থেকে এসেছে। তাদের যাচাই-বাছাই শেষে নিশ্চিত হওয়া যাবে। শুনেছি অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশে করেছে, তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় সূত্রের তথ্যানুযায়ী, গত ১০ দিনে ১১১টি রোহিঙ্গা পরিবারের ৪৬৮ সদস্য কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রবার বাগানের কাছে স্থাপিত ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। এরাই ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নতুন আসা এসব সদস্য জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

ভারত থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা পরিবার নেতারা জানান, গত কয়েক দিনে ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের কেরাইনটেলা থেকে পালিয়ে তিন পরিবারের ১২ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়ির তমব্রু নোম্যানসল্যান্ডে (শূন্যরেখা) ঠাঁই নিয়েছে। এদের মধ্যে সাত শিশু, দুই নারী ও তিন পুরুষ রয়েছে। টেকনাফের হোয়াইক্যং উনচিপ্রাং রোহিঙ্গা শিবিরের নুর আলম ও সানজিদাসহ এক পরিবারের পাঁচ এবং বাহারছড়া শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরে আজিজ উল্লাহ নামে এক রোহিঙ্গা যুবক ভারতের জম্মু-কাশ্মীর থেকে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয় বলে জানিয়েছেন উনচিপ্রাং রোহিঙ্গা শিবিরের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউছুফ ও টেকনাফ শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম। নাইক্ষ্যংছড়ির তমব্রু নোম্যানসল্যান্ড রোহিঙ্গা শিবিরের চেয়ারম্যান দিল মোহাম্মদ বলেন, তিন দিন আগে জোহর আহম্মদ ও তার স্ত্রীসহ এক পরিবারের ছয় রোহিঙ্গা ভারতের কাশ্মীর থেকে পালিয়ে এসে আমার শিবিরে পৌঁছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছি। তবে বর্তমানে তারা শূন্যরেখায় আশ্রয় নিয়েছে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, সম্প্রতি ভারত সরকার সে দেশে আশ্রিত কিছু রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে পাঠিয়ে দেয়। এই ভয়ে তারা সে দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে চলে আসছে। তাদের কাছে ভারত ও ইউএনএইচসিআর’র দেয়া আইডি কার্ডও রয়েছে।

ভারত থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিকে ইউএনএইচসিআর’র দেয়া আইডি কার্ড ভারতে কাশ্মীর থেকে পালিয়ে এসে টেকনাফের বাহারছড়া-শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা যুবক আজিজ উল্লাহ জানান, তিনি চারদিন আগে ভারত থেকে পালিয়ে টেকনাফের শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরের আইয়ুবের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি মিয়ানমারের মংডু হাসসুরাতা গ্রামের আজিম উল্লাহর ছেলে। আজিম উল্লাহ পরিবার নিয়ে ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের কেরাইনটেলায় বাস করতেন। আজিজ উল্লাহ বলেন, ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে পালিয়ে বাংলাদেশে টেকনাফের শামলাপুর হাতকুলা গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এখানে দীর্ঘ ১২ বছর শৈশব কাটিয়ে পরিবারের সঙ্গে পালিয়ে ভারতের কাশ্মীরের কেরাইনটেলায় চলে যাই। সেখানে তিন হাজারের বেশি রোহিঙ্গার বসতি রয়েছে বলেও জানান তিনি। তিনি জানান, ভারতের কাশ্মীরে লোহার দোকানে দিনমজুরি করে সংসার চলত। অনেক সময় কাজের টাকা মিলত না। ফলে সংসার চালাতে কষ্ট হতো। তাছাড়া সেখানে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, সে ভয় সব সময় কাজ করছিল।

ভারত থেকে আসা এক ব্যক্তির কাছে ছিল ইউএনএইচসিআর’র দেয়া আইডি কার্ড। আজিজ উল্লাহর বর্ণনা মতে, ভারতের কাশ্মীর থেকে কলকাতা পৌঁছতে তিন দিন সময় লেগেছে। সেখান থেকে রাতে দালালের মাধ্যমে সাতক্ষীরার একটি ছোট খাল পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে চট্টগ্রামের গাড়িতে করে কক্সবাজার হয়ে টেকনাফের শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরে পৌঁছে মামা মোহাম্মদ আইয়ুবের বাড়িতে আশ্রয় নেন। ভারতে স্ত্রী ও তিন সন্তান রেখে এসেছেন তিনি। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের প্রতিনিধি টেকনাফ শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরের ইনচার্জ বদুর রহমান বলেন, ভারতের কাশ্মীর থেকে পালিয়ে রোহিঙ্গা শিবিরে এক যুবক আশ্রয় নেয়ার খবর শুনেছি। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। টেকনাফ শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম বলেন, চারদিন আগে ভারত থেকে এক রোহিঙ্গা যুবক পালিয়ে এসে শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। তার কাছে সে দেশের ইউএনএইচসিআর কর্তৃক প্রদত্ত কার্ড রয়েছে। তিনি বলেন, এই রোহিঙ্গা শিবিরে ২ হাজার ৬২৫ পরিবারে ১৩ হাজার ৭০ রোহিঙ্গা রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ শিশু ও নারী। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের বলেন, চলতি মাসে ভারত থেকে পালিয়ে আসা প্রায় অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। এদের বেশিরভাগই শিশু ও নারী। এসব রোহিঙ্গাকে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ট্রানজিট পয়েন্টে রাখা হয়। পরে উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে পাঠিয়ে দেয়া হয়।