১৯ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে সংসদে যেতে হতে পারে

  • নানামুখী চাপ বাড়ছে

শরীফুল ইসলাম ॥ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ছয়টি আসন পাওয়ায় চরম হতাশ বিএনপি। এ হতাশা থেকে দলীয় হাইকমান্ড নির্বাচিতদের সংসদে না যাওয়ার নির্দেশ দেয়। আর বিএনপি সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ায় গণফোরাম থেকে নির্বাচিত ২ জনকেও যেতে বারণ করছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। তবে বিএনপি যাতে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে জাতীয় সংসদে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয় সে জন্য দলটির ওপর নানামুখী চাপ রয়েছে।

সূত্র জানায়, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এত কম আসন পাবে তা দলের নেতারা কল্পনাও করতে পারেনি। আর এ কারণেই আওয়ামী লীগের ২৫৯ আসনের বিপরীতে মাত্র ছয়টি আসনে বিজয়কে সহজভাবে নিতে পারেনি দলটি। তাই ৩০ ডিসেম্বর ভোট শেষে রাতে ফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সরকারী দলের বিরুদ্ধে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে এ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে পুনর্নির্বাচন দাবি করে বিএনপি। পরে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক করে ওই রাতেই এ জোটের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনকে দিয়েও পুনর্নির্বাচনের দাবি জানানো হয়। যদিও এ সিদ্ধান্তের আগে নির্বাচিতদের মতামত নেয়া হয়নি।

৩ জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশান কার্যালয়ে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সকল প্রার্থীকে নিয়ে বৈঠক করা হয়। এ বৈঠকে প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় নির্বাচনে কি ধরনের অনিয়ম হয়েছে তার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। এ বৈঠক শেষে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা আবার জানান এ জোট থেকে নির্বাচিতরা জাতীয় সংসদে যাবে না। আর এ জন্যই তারা শপথও নেবেন না। ওই দিনই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনের ফল বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে স্মারকলিপি প্রদান করে। তা বাতিল না করলে আন্দোলনের হুমকীও দেয়া হয়। এ ছাড়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সকল প্রার্থী নিজ নিজ এলাকার ভোট কারচুপির কথা উল্লেখ করে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

৫ জানুয়ারি গণফোরামের বর্ধিত সভায় এ দলের ২ জন সংসদে যাওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়। দলের সভাপতি ড. কামাল হোসেন নিজেই দল থেকে নির্বাচিত ২ জনের সংসদে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে বক্তব্য রাখেন। কিন্তু এতে বিএনপি ক্ষুব্দ হয়ে ড. কামালকে অবস্থান পরিবর্তনের কথা বলে। এ অবস্থায় ৬ জানুয়ারি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক শেষে জানানো হয় গণফোরাম বা বিএনপির কেউ সংসদে যাবে না। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে আন্দোলন করা হবে বলেও ওইদিন জানানো হয়। সর্বশেষ ৮ জানুয়ারি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও দলীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে জানান তারা জনগণের সরকারের জন্য গণতান্ত্রিক আন্দোলন করবেন। তাই দল থেকে নির্বাচিতরা সংসদে যাবেন না।

সংসদে না যাওয়ার বিষয়ে বিএনপির অবস্থান জানার পর দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মহল থেকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের চাপ আসতে থাকে। বিশেষ করে বিএনপি যখনই বিদেশী কূটনীতিকদের সঙ্গে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ নিয়ে যাচ্ছে তখনই তারা অভিযোগ শোনার পাশাপাশি বিএনপিকে সংসদে যাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। এ ছাড়া জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশও বিএনপিকে জাতীয় সংসদে যাওয়ার বিষয়ে চাপ দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

এদিকে গণফোরাম থেকে নির্বাচিত ২ জন সংসদে যোগ দেয়ার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী বলে জানা গেছে। আর এ কারণেই সংসদে না যাওয়ার বিষয়ে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারছেন না তারা। তবে প্রকাশ্যে এ সিদ্ধান্তের বিরোধীতাও করছেন না। তবে কোন কারণে ঐক্যফ্রন্ট থেকে অনুমতি না পেলেও কি করে সংসদে যাওয়া যায় তা নিয়ে গণফোরাম থেকে নির্বাচিত ২ জন গোপনে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিচ্ছেন। অবশ্য বিএনপিসহ জোটের বিভিন্ন দলের সিনিয়র নেতাদের চাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক প্রকাশ্যে সংসদে না যাওয়ার কথা বললেও নীতিগতভাবে তিনি সংসদে যাওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক বলে জানা গেছে। তাই শেষ পর্যন্ত তিনিও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত ৮ জনকে সংসদে যাওয়ার কথা বলতে পারেন। আর তাহলে বিএনপিকেও তখন জাতীয় সংসদে যোগদানের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্তে আসতে হবে।

সংবিধান অনুসারে কোন জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর ৯০ দিনের মধ্যে কোন সংসদীয় এলাকার নির্বাচিত কেউ সংসদে যোগ না দিলে তার সংসদীয় আসন শূন্য হয়ে যাবে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত ৮ জন ছাড়া অন্যান্য দলের নির্বাচিতরা ইতিমধ্যেই শপথ নিয়েছেন। ৩০ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি এ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ। ৩০ জানুয়ারি বিএনপি থেকে নির্বাচিতরা শপথ না নিলেও এর পর ৯০ দিন পার হওয়ার আগেই তাদের সংসদে যোগ দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা জানান, যেভাবে নির্বাচন হয়েছে আর বিএনপির যে ক’জন নির্বাচিত হয়েছে তাতে সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঠিকই আছে। তবে বিএনপি যাতে সংসদে যায় সে জন্য নানামুখী চাপ রয়েছে। তাই শেষ পর্যন্ত হয়তো এ ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হতে পারে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত হন বগুড়া-৬ আসনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে জাহিদুর রহমান, চাঁপাই নবাবগঞ্জ-২ আসনে আমিনুল ইসলাম. চাঁপাই নবাবগঞ্জ-৩ আসনে হারুনুর রশীদ ও বি বাড়িয়া-২ আবদুস সাত্তার। এ ছাড়া বিএনপির সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে থাকা গণফোরাম থেকে নির্বাচিত হন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর মৌলভীবাজার-২ আসনে এবং মোকাব্বির খান সিলেট- ২ আসনে। তারা কেউ নির্বাচিত হওয়ার পর শপথ নেননি এবং তারা সংসদেও যাবেন না বলে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে জানানো হয়েছে। আর বগুড়া-৭ আসেনে বিএনপির সমর্থন নিয়ে রেজাউল করিম বাবলু নির্বাচিত হলেও তিনি ইতিমধ্যেই জাতীয় সংসদের স্পীকারের কাছে শপথ নিয়েছেন।

এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর বিএনপি সংসদে যোগ না দিয়ে আন্দোলনে যাওয়ার কথা বললেও দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা আন্দোলনের পক্ষে সায় দিচ্ছে না। বিএনপি পন্থী বুদ্ধিজীবীরাও আপাতত আন্দোলনের পক্ষে সায় দিচ্ছেন না। তাদের যুক্তি হচ্ছে এখন আন্দোলনে গেলে দেশের সাধারণ মানুষ বিশেষ করে যারা ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তারা বিষয়টিকে ভাল চোখে দেখবে না। তাই দেশের রাজনীতিতে বিএনপির অবস্থান কিভাবে ধরে রাখবেন এ নিয়ে মহা চিন্তিত দলটির সিনিয়র নেতারা। বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও এখন আর আগের মতো সহযোগিতা দিতে চাচ্ছেন না। এ পরিস্থিতিতে চারদিকে অন্ধকার দেখছে বিএনপি। তাই শেষ পর্যন্ত সংসদে যোগ দেয়ার পক্ষেই যেতে পারে।

প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদে নির্বাচনে ভরাডুবির পরও বিএনপি প্রথমে সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু নানামুখী চাপে শেষ পর্যন্ত তারা সংসদে যোগ দিয়েছিল। সেবার মাত্র ৩০টি আসন পেয়েছিল বিএনপি। পরে সংসদে যোগ দিয়ে ৫টি নারী আসনও পায় দলটি। এবারও সংসদে যোগ দিলে সংরক্ষিত নারী আসনের ১টি পাবে বিএনপি। সে ক্ষেত্রে গণফোরামের ২টি, বিএনপির ৬টি ও সংরক্ষিত একটি নারী আসনসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আসন হবে ৯টি। তাই এ ৯ জন ঐক্যবদ্ধ থেকে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে বিভিন্ন ইস্যুতে সংসদে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখতে পারলে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা হলেও সুবিধা আদায় করতে পারবে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছে। আর তা না হলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ঘরে-বাইরে কোথাও দাঁড়াতে পারবে না দলটি।