২১ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আবির্ভাবেই হ্যাটট্রিকে নায়ক আলিস

আবির্ভাবেই হ্যাটট্রিকে নায়ক আলিস

মোঃ মামুন রশীদ ॥ একেবারেই অচেনা একটি মুখ। ঢাকা ডায়না-মাইটসের একাদশে শুক্রবার নামটি দেখে সবাই ধাঁধায় পড়ে গিয়েছিলেন। কাগজে-কলমে সবচেয়ে বড় ম্যাচ রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে, সেখানেই কিনা আলিস আল ইসলামের নাম! তখনও তার পরিচয় খুঁজে বের করতে তাড়াহুড়া করেননি কেউ। কিন্তু বল হাতে যখনই হ্যাটট্রিক করে ঢাকাকে অবিশ্বাস্য এক জয় এনে দিলেন তখন আঁতিপাঁতি করে খুঁজেও তার পরিচয় উদ্ধার করা যায়নি। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ (বিপিএল) টি২০ আসরের মতো একটি মঞ্চে ক্যারিয়ারে প্রথমবার নেমেই দেশী-বিদেশী মহা তারকাদের সঙ্গে খেলে হ্যাটট্রিকসহ ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছেন। ‘বৃক্ষ তোর নাম কি? ফলেই পরিচয়!’ ৪ ওভারে ২৬ রানে ৪ উইকেট নিয়ে বড় মঞ্চে উঁচু দরের ক্রিকেটে নিজের আবির্ভাবটা নায়কের বেশেই হয়েছে ডানহাতি অফস্পিনার আলিসের। চলতি বিপিএলে প্রথম হ্যাটট্রিক করলেন সবার অচেনা এই নবাগত। তবে নিজেই পরিচয় জানালেন তিনি সংবাদ সম্মেলনে। এমন একটি মঞ্চে নামার সুযোগ যেভাবে পেয়েছেন, ২২ বছর বয়সী এ তরুণ জানালেন সেই রহস্য।

ঢাকা-রংপুর সবচেয়ে বড় ম্যাচ চলতি আসরের এটা সবাই আগেভাগেই ধরে নিয়েছিলেন। আর ম্যাচটিও শুক্রবার সরকারী ছুটির দিনে, তাই মিরপুরের গ্যালারি প্রথমবারের মতো চলতি বিপিএলে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। সেই ম্যাচে আগে ব্যাট করে ঢাকা ৯ উইকেটে ১৮৩ রান তুলে ফেলে। জবাবে রাইলি রুশো আর মোহাম্মদ মিঠুনের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে নিশ্চিত জয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল রংপুর। কিন্তু সেই সময়ই আঘাত হানেন ডানহাতি অফস্পিনার আলিস, সাজঘরে ফেরান ৪৪ বলে ৮৩ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলা রুশোকে। যেকোন পর্যায়ে ক্যারিয়ারের প্রথম টি২০ খেলতে নেমেই প্রথম শিকার এত বড় এক টি২০ ব্যাটসম্যানের, তাই যেন সাহসটা বেড়ে গিয়েছিল আলিসের। অথচ মাঠে নামার পর শুরুটা খুব বাজে হয়েছিল তার। রুশো-মিঠুন ১২১ রানের জুটি গড়েছিলেন তারই বদান্যতায়। পরপর দুই বলে তিনি মিঠুনের একেবারে সহজ ক্যাচ হাতছাড়া করেছিলেন। আর এর মধ্যেই ১ ওভার বোলিং করে মাত্র ৭ রান দিয়েছিলেন। তবে আবার যখন বোলিংয়ে ফিরেছেন তখন ইনিংসের ১৬তম ওভার, শিকার করেছেন রুশোকে। নিজের পরবর্র্তী ওভারেই রংপুরের আরেক আশা-ভরসা মিঠুনকে সাজঘরে পাঠান সরাসরি বোল্ড করে। মিঠুন ৩৫ বলে ৪৯ রান করেছিলেন। সেটি ছিল ১৮তম ওভারের চতুর্থ বল। ওই ওভারের পঞ্চম বলে রংপুর অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাকে বোল্ড এবং শেষ বলে ফরহাদ রেজাকে স্লিপে সাকিবের ক্যাচে পরিণত করে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন আলিস। তার এই এক ওভারের ঘূর্ণি ম্যাজিকই ঢাকার জয়কে নিশ্চিত করে। শেষ ওভারে ৪ বলে ৬ রান যখন প্রয়োজন, সেটিও রুখেছেন আলিস।

মাত্র ১৯ বছর বয়সে পেশাদার ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করেছিলেন রাজধানী ঢাকার সাভারের অঞ্চল বলিয়ারপুরের ছেলে আলিস। তখন দ্বিতীয় বিভাগে তিনি গ্রীন ক্রিসেন্ট ক্লাব ও কাঁঠালবাগানের হয়ে খেলেছেন। দুই বছর পর প্রথম বিভাগের দল ওল্ড ডিওএচইসের হয়ে শুরু করেন খেলা। তখনই নজরে আসেন ঢাকা ডায়নামাইটস কোচ খালেদ মাহমুদ সুজনের। তিনিই এবার বিপিএলে নেটে বোলিংয়ের জন্য আলিসকে এনে ম্যাচ খেলার উপযুক্ত মনে করেই নামিয়েছিলেন। এ বিষয়ে আলিস বলেন, ‘আমি ওল্ড ডিওএইচএসের হয়ে খেলেছি প্রথম বিভাগে। আর বিপিএলে এবারই প্রথম নেটে বোলিং করছিলাম। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সুজন স্যার বললেন মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত থেকো কাল (শুক্রবার) খেলার জন্য। তিনি আমাকে নেটের বোলিং দেখেই পছন্দ করেছিলেন। আর আমিতো মানসিকভাবে খেলার জন্য প্রস্তুতই ছিলাম।’ তবে মানসিক প্রস্তুতি থাকলেও মিরপুরে খেলতে নেমেই ভড়কে গিয়েছিলেন। কারণ এদিনই সবচেয়ে বেশি দর্শক উপস্থিতি ছিল। এ বিষয়ে আলিস বলেন, ‘এ রকম কোন ম্যাচ এটাই প্রথম আমার। আসলে মিরপুর স্টেডিয়ামেই প্রথম। এত বড় স্টেডিয়ামে এত দর্শকের সামনে আসলে অনেক নার্ভাস ছিলাম। সেজন্যই ক্যাচগুলো হাতছাড়া হয়েছে। তবে এরপর সাকিব ভাইসহ সুজন স্যার (কোচ খালেদ মাহমুদ) ও টিম ম্যানেজমেন্ট, বাকিরা আমাকে অনেক সমর্থন দিয়েছে, উৎসাহিত করেছে। সাকিব ভাই বলেছেন যে ঠিক জায়গা বল কর, তাহলেই হবে। আর আমিও মনে করেছিলাম যে ক্যাচ ছেড়েছি সমস্যা নেই, যদি ভাল বোলিং করতে পারি অবশ্যই ভাল কিছু হবে।’

সেই ভাল কিছু যে এমনটা হবে চিন্তাও করেননি আলিস। হ্যাটট্রিকসহ ৪ উইকেট নিয়েছেন এবং দলকেও জিতিয়েছেন। ক্যারিয়ারের প্রথম টি২০ খেলতে নেমেই বাজিমাত করেছেন, হয়েছেন ম্যান অব দ্য ম্যাচ। এ বিষয়ে আলিস বলেন, ‘আসলে এতটা ভাল হবে চিন্তা করিনি। শেষ ওভারে কিছুটা নার্ভাস ছিলাম। দুই বল উইকেটের বাইরে ফেলেছি যেগুলো শফিউল ভাই ভাল মেরেছে। এরপর আর সেই ভুল করিনি। লাইনে বল ফেলার চেষ্টা করেছি। আসলে হ্যাটট্রিক তো করা যায় না, হ্যাটট্রিক হয়ে যায়। দলের সবার ভাল সমর্থন ছিল বলেই সম্ভব হয়েছে এটা।’ আলিস তার আইডল হিসেবে সাকিব ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের সুনিল নারাইনকে ধরে নিয়েই ক্যারিয়ার এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আর প্রতিযোগিতামূলক এমন একটি ম্যাচে প্রথমবার ‘হোম অব ক্রিকেটে’ তাদেরই সতীর্থ হিসেবে খেলার ব্যাপারটি কল্পনাও করেননি। তিনি বলেন, ‘আমার আইডল সাকিব ভাই ও সুনিল নারাইন। আমি সৌভাগ্যবান প্রথম এ ধরনের বড় ম্যাচে তাদের দলেই একসঙ্গে খেলেছি।’ এবার বিপিএলে মূলত সুযোগ পাওয়ার কারণ কোচ সুজন এখনও ওল্ড ডিওএইচএস ক্লাবের সঙ্গে আছেন। তাছাড়া সর্বশেষ প্রথম বিভাগ আসরে ৯ ম্যাচে ২৭ উইকেট শিকার করেছিলেন আলিস। বিকেএসপি ও কাকরাইল বয়েজের বিপক্ষে ৫ উইকেটও নিয়েছিলেন। এবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ। তার বিষয়ে রংপুর অধিনায়ক মাশরাফি বলেন, ‘দেশের খেলোয়াড়রা চিন তো আগে থেকেই। আমি সেভাবে জানি না। বিদেশীদের তো চেনার কোন কারণই নেই। তবে সে ভাল বোলিং করেছে, চাপের মধ্যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছে বলেই সফল হয়েছে। এটা ধরে রাখতে পারলে তার ক্যারিয়ারের জন্য অবশ্যই ভাল হবে।’