১৯ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গাজীপুরে নাশকতার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটক ৫

গাজীপুরে  নাশকতার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটক  ৫

স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর এবং নিজস্ব সংবাদদাতা, টঙ্গী ॥ বেতন ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে শনিবারেও গাজীপুরে বিভিন্নস্থানে বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি, বিক্ষোভ ও ভাংচুর করেছে। টঙ্গীতে আন্দোলনরত ৫ শ্রমিককে সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা তুলে নেওয়ার খবরে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কারখানা ও গাড়ি ভাংচুর এবং মহাসড়ক অবরোধ করেছে। এসময় একাধিক পয়েন্টে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। এতে কয়েকজন আহত হয়।

এদিকে টঙ্গী এলাকায় গার্মেন্টসে ভাংচুর ও নাশকতার সঙ্গে জড়িত ৫ জন সন্ত্রাসীকে আটক করেছে র‍্যাব-১ এর সদস্যরা। শ্রমিক অসন্তোষের মুখে এদিন জেলার প্রায় অর্ধশত কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। পুলিশ ও কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবী, ভ্রান্ত ধারণা থেকে শ্রমিকরা অযৌক্তিকভাবে গত কয়েকদিন ধরে এ আন্দোলন করছে।

পুলিশ ও শ্রমিকরা জানায়, সরকার ঘোষিত মুজুরী কাঠামোয় বৈষম্যের অভিযোগে তা দূর করে ন্যূনতম বেতন ভাতা বৃদ্ধি ও বাস্তবায়নের দাবিতে শনিবারেও গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করেছে। এদিন ওই দাবীতে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কোনাবাড়ি, টঙ্গী, গাজীপুরা, ভোগড়া, চান্দনা চৌরাস্তা, ইসলামপুর, সাইনবোর্ড, বোর্ডবাজার ও নলজানী এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সকাল হতে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শুরু করে।

একপর‍্যায়ে শ্রমিকরা মিছিল নিয়ে কারখানা থেকে বেরিয়ে আসে। এসময় তাদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেয়ার জন্য তারা আশেপাশের বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের আহ্বান জানায় এবং কারখানায় ইটপাটকেল ছুড়ে ভাংচুর করে। বিক্ষোভকারীরা ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ ও গাড়ি ভাংচুর শুরু করে। এতে মহাসড়কগুলোর কয়েকস্থানে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এসময় মহাসড়কের উপর থেকে অবরোধকারীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে শ্রমিকদের সঙ্গে শিল্প পুলিশ, থানা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন আহত হয়।

এদিকে টঙ্গী বিসিক এলাকার এক কারখানার শ্রমিক নাজমুলসহ কয়েক শ্রমিক জানায়, বেতনভাতা বৃদ্ধির দাবীতে শনিবার টঙ্গী বিসিক এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সকাল হতে আন্দোলন করছিল। এসময় স্থানীয় ট্রিপল ই (ট্রাইভল) পোশাক কারখানার পাঁচ শ্রমিককে সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা ধরে নিয়ে গেছে- এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই এলাকার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এবং তারা কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শুরু করে। এক পর‍্যায়ে তারা পার্শ্ববর্তী টঙ্গী ষ্টেশন রোড মোড় এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও টঙ্গী-নরসিংদী সড়ক মোড়ের উপর অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করতে থাকে। এসময় তারা বেশ কয়েকটি গাড়ির কাঁচ ভাংচুর করে।

পুলিশ অবরোধকারীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওই কারখানাসহ ওই এলাকার প্রায় ৪০টি কারখানা শনিবারের জন্য ছুটি ঘোষণা করে কর্তপক্ষ। ছুটি ঘোষণার পর এসব কারখানার শ্রমিকরাও কারখানা থেকে বেরিয়ে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে সড়কে নেমে পড়লে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও টঙ্গী-নরসিংদী সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

টঙ্গী (পূর্ব) থানার ওসি মো. কামাল হোসেন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাদের বুঝিয়ে প্রায় দেড় ঘন্টা পর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও টঙ্গী-নরসিংদী সড়ক থেকে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সরিয়ে দিলে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। তিনি আরো বলেন, শ্রমিক অসন্তেষের ফলে স্থানীয় বিসিক এলাকার প্রায় ৪০টি কারখানা শনিবারের জন্য ছুটি হয়ে যায়।

তবে সাদা পোশাকে পাঁচ শ্রমিককে ধরে নেয়ার খবরের সত্যতা স্বীকার করে ওসি কামাল বলেন, তাদের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে কারা বা কি কারণে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সে ব্যাপারে কোন তথ্য জানাতে পারেননি তিনি।

এদিকে র‍্যাব-১ শনিবার বিকেলে জানায়, গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় গার্মেন্টসে ভাংচুর ও নাশকতার সঙ্গে জড়িত ৫ জন সন্ত্রাসীকে র‍্যাব-১ এর সদস্যরা আটক করেছে। গার্মেন্টসের মুজুরী কাঠামো নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলনের নামে গত ৯ জানুয়ারি গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় পেট্রিয়ট, জিন্স এন্ড পোলো, গোল্ড স্টার, রেডিসন-১, নর্দার্ন ও সুমিসহ মোট ৯ টি গার্মেন্টসে ব্যাপক ভাংচুর ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে।

এসব ভাংচুর ও নাশকতার সঙ্গে জড়িত থাকায় গাজীপুরে টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় শুক্রবার রাতে অভিযান চালিয়ে ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও থানার লাউতলী গ্রামের আব্দুল মতিনের ছেলে মোঃ শামীম (২৪), একই জেলার কতোয়ালী থানার খাগডহর গ্রামের মজিবুর রহমানের ছেলে মোঃ রোমান (২৭), সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানার নতুনদাতপুর গ্রামের মোঃ আলমগীর হোসেন (২৪), ফেনী জেলার দাগনভ’ইয়া থানার প্রতাপপুর গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে মোঃ আবু সাঈদ (৩২), এবং গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ থানার শক্তিপুর গ্রামের মৃত চান মিয়া সরকারের ছেলে মোঃ সোহেল সরকারকে (২৪) আটক করা হয়। র‍্যাব আরো জানায়, শ্রমিক নামধারী কিছু সন্ত্রাসী সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করে একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রচেষ্টায় এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

শ্রমিক অসন্তোষের ব্যাপারে স্থানীয় কয়েকটি কারখানার কর্মকর্তারা জানান, কারখানার কর্তৃপক্ষ সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বেতন ভাতা শ্রমিকদের দিচ্ছে। কিন্তু বহিরাগত কিছু শ্রমিক বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের জোরপূর্বক কারখানা থেকে বের করে নিয়ে গিয়ে সড়কে গন্ডগোল করেছে। ভুল ধারণা থেকে শ্রমিকরা অযৌক্তিকভাবে এ আন্দোলন করছে। সরকার ঘোষিত বেতন কাঠামোয় পোশাক কারখানার সিনিয়র-জুনিয়র অপারেটরদের মূল বেতনসহ আনুসাঙ্গিক খাতের ভাতাদি বৃদ্ধি করা হয়েছে। সরকারের আগের ঘোষিত গেজেটে কর্মীদের দক্ষতা অনুযায়ী তাদের গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে তাদেরকে বেতন ভাতা কম দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। অথচ বিভিন্ন মহল সিনিয়র ও দক্ষ অপারেটরদের ভাতাদি বৃদ্ধি করা হয়নি বলে গুজব ছড়িয়ে আন্দোলনে ইন্দন দিচ্ছে। এতে শ্রমিকদের মাঝে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়লে তারা অযৌক্তিকভাবে বেতন ভাতা বাড়ানোর দাবীতে গত কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভ ও আন্দোলন করে ভাংচুর করে আসছে।

শ্রমিক অসন্তোষ পর‍্যায়ক্রমে বিভিন্ন কারখানা দেখা দিচ্ছে। ইতোমধ্যে শ্রমিক অসন্তোষের মুখে বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এসব কারখানা খুলে দেওয়া হবে।

শিল্পাঞ্চল পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাহেব আলী পাঠান জানান, সরকার ঘোষিত মুজুরী কাঠামো অনুযায়ী বেতন ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে গত কয়েকদিন ধরে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলন করে আসছে। শ্রমিক অসন্তোষের মুখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শনিবার গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ভোগড়া বাইপাস সড়ক এলাকার স্কয়ার, চান্দনা-চৌরাস্তা ও আশেপাশের এলাকার বডি ফ্যাশন, টিএনজেড, টপ নিট ওয়্যার, কোনাবাড়ির রেজাউল গার্মেন্টস, টঙ্গী থানাধীন গাজীপুরার মন্ডল গ্রুপ, ওরিয়ন ও নিপ্পন, নলজানী এলাকার কোজিমা এবং টঙ্গী বিসিক এলাকার প্রায় সবক’টি সহ জেলার প্রায় অর্ধশত পোশাক কারখানা শনিবারের জন্য ছুটি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এসব এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি কারখানা কর্তৃপক্ষ ওইসব কারাখানা বন্ধ ঘোষণা করে নোটিশ টানিয়ে দিয়েছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এসব কারখানা বন্ধ থাকার কথা ওই নোটিশে উল্লেখ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।