২৪ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তারুণ্যের আহ্বান ॥ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন জরুরী

  • অভিমত

নাজমুল হোসেন ॥ সমস্ত জল্পনা-কল্পনা এবং আলোচনা-সমালোচনার অবসান ঘটিয়ে শেষ হলো একাদশ জাতীয় নির্বাচন। দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকে জয়ী করতে স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে তরুণরা বরাবরের ন্যায় আবারও ক্ষমতাসীন দলকেই বেছে নিল। আর আওয়ামী লীগের এমন নিরঙ্কুশ জয় ও আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সমর্থনের মাধ্যমে জনগণ আবারও বুঝিয়ে দিল তারা উন্নয়ন, শান্তি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও নীতিকেই লালন করে। আর সেই সুবাদে টানা তৃতীয় বারের মতো সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। ইতোমধ্যে নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া মন্ত্রীরাও শপথ নিয়েছেন। তাঁরা সবাই গোটা জাতিকে বার বার আশ্বস্ত করছেন ইশতেহারে রাখা প্রতিটি প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন। বিগত দশ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের দুই আমলে দেশের বিভিন্ন সূচকে যে পরিমাণ উন্নয়ন হয়েছে তাতে জনগণের কাছে এই সরকারের ধারাবাহিকতা এখন একান্ত কাম্য একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষিত বেকার তরুণদের জন্য ছিল নানা রকম প্রতিশ্রুতি। দেড় কোটি বেকারের কর্মসংস্থান, তাদেরকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর, শিক্ষার মান বৃদ্ধি ও উদ্যোক্তা তৈরি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে সরকারী চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো। বিগত সাত বছরে তরুণদের এই দাবিটি নবম ও দশম মহান জাতীয় সংসদ, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বেশ কয়েকবারের সুপারিশ, মাঠ পর্যায়ের আন্দোলন, পত্র-পত্রিকায় ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে তথা সব মহলে তুমুল আলোচনার ঝড় তুলেছিল। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মন্ত্রীরাও বার বার তরুণদের আশার আলো দেখিয়েছিলেন। কিন্তু কোন এক অজানা কারণে সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। অবশেষে সরকারের ক্ষমতার অন্তিম মুহূর্তে তরুণরা মন্ত্রিসভা ভাঙ্গার আগেও আশায় বুক বেঁধে বারবার পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে শাহবাগ ও জাতীয় প্রসক্লাবে অবস্থান, মানববন্ধনসহ নানা রকম কূটনৈতিক চেষ্টা করে গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের কয়েকদিন আগে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন সরকারের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নাগরিক টিভি কর্তৃক আয়োজিত ‘সবিনয়ে জানতে চাই’ নামক অনুষ্ঠানে এবং তরুণদের নিয়ে সিআরআই কর্তৃক আয়োজিত আরও একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের উপস্থিতিতে এক প্রশ্নের উত্তরে সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিসহ সরকার সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন বিভিন্ন সময় বলেছিলেন এবার নতুন করে ক্ষমতায় এসেই প্রধানমন্ত্রী এর বাস্তবায়ন করে দিবেন। তাঁরা আরও বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা কখনোই ওয়াদার বরখেলাপ করেন না। এবার জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারী চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা না রাখার বিষয়টিকে নিয়েও ওবায়দুল কাদের ও তারানা হালিম মন্তব্য করে বলেছিলেন বর্তমানে এদেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটে বয়সসীমা একেবারেই তুলে দেয়াটা অযৌক্তিক। তাই আওয়ামী লীগ সরকার যৌক্তিকভাবে, বাস্তবতার নিরীখে ও অন্যান্য এডভান্স গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বয়সসীমার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই বয়সসীমা বাড়াবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এই বয়সসীমা কত বছর বাড়ানো হবে? প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই বুঝেন, যারা প্রথম এই দাবি তুলেছিল, যারা বিগত বছরগুলোতে আন্দোলন করল বয়সসীমা কম করে বাড়ালে তারা তো কোন সুযোগ পাবে না। আমরা দেখেছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সর্বক্ষেত্রেই সঠিক ও সুবিচার করে থাকেন। তিনি সবাইকে কমবেশী খুশি রাখেন। গত সাত বছর ধরে তরুণদের দাবি ছিল সরকারী চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ন্যূনতম ৩৫ বছর করা। কিন্তু বিভিন্ন যৌক্তিক কারণ দর্শিয়ে বুক ভরা আশা নিয়ে এই দাবিতে প্রথম থেকে সারাদেশের যেসব তরুণরা আন্দোলন করে আসছিল এত বছর আন্দোলন করে তাদের বর্তমান বয়সসীমা আজ ৩৫ এর দ্বারপ্রান্তে। তাই আশা করব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবাই যাতে অন্তত আবেদনের পর্যাপ্ত সুযোগ পায় সেই সুবিচার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সেভাবেই এর বাস্তবায়ন করে দিবেন। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী হয়ত ভাবছেন স্বাধীনতা বিরোধী বা যুদ্ধাপরাধীর সন্তানরা এতে করে প্রজাতন্ত্রের কর্মে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন সোনার বাংলাকে কলঙ্কিত করতে পারে। তাই সরকারের পাশাপাশি এর বিরোধী বর্তমান তরুণ প্রজন্ম, মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সন্তানরাও। অন্তত এদের জন্য যেন অন্যরা চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয় সে জন্য চাকরিতে চূড়ান্ত নিয়োগপত্র প্রদানের আগে সঠিকভাবে তদন্তপূর্বক প্রার্থীদের পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করা যেতে পারে।

অন্যদিকে বিশেষ করে যারা বিভিন্ন সমস্যার কারণে যেমন- সেশনজট, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যান্য অভ্যন্তরীণ সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে অকারণে কয়েক বছর হারিয়ে বয়স বাড়াতে দাবি তুলেছে মূলত যৌক্তিকতার সুবিচারে তাদেরই এই সুবিধা পাওয়া উচিত বা তাদেরকেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই সুবিধা দেয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রী চাইলেই কোন বিশেষ আইনের মাধ্যমে সুবিধা দিয়ে মানবতার দৃষ্টিতে সুবিচার স্বরূপ তাদের মুখেও হাসি ফুটাতে পারেন। এ ক্ষেত্রে উনার প্রাপ্ত ‘মানবতার মাতা’ খেতাবটি আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে। যে কোন আইন তো প্রয়োজনের তাগিদেই তৈরি করা হয়। তাই ত্রিশোর্ধদের জন্য তিনি এমন একটি আইন তৈরি করতে পারেন যেখানে এর প্রজ্ঞাপনের পরই কমপক্ষে ৩ বছর পর্যন্ত আইনের আওতাভুক্তরাই শুধু সরকারী চাকরিতে আবেদন করতে পারবেন। আর এই ক্ষণস্থায়ী বিশেষ আইনটি নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার পরই আপনা থেকেই বাতিল হয়ে যাবে। এতে একদিকে যেমন চাকরিতে প্রবেশের বয়স স্থায়ীভাবে বাড়ল না তেমনি অন্যদিকে নবাগত চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে বা অবসরের বয়স বাড়ানো নিয়েও নতুনভাবে দীর্ঘস্থায়ী কোন সমস্যার সৃষ্টি হবে না। ফলস্বরূপ অন্তত হতাশায় থাকা তরুণরা এমন সুযোগ পাওয়ার মাধ্যমে এতটুকু সান্ত¡না পাবে। আর বর্তমানে যেহেতু আগের মতো সেশনজট নেই তাই নতুনরা এই সুবিধা না পেলেও চলবে। তাদের জন্যও অন্য কোন সুবিধার কথা ভাবা যেতে পারে। কারণ তারা যথাসময়েই অনার্স বা মাস্টার্স শেষ করতে পারছে। এরপরেও সরকার বয়স বাড়াতে চাইলে সবাই সুযোগ পাবে সেই চিন্তা মাথায় রেখেই বয়স বাড়াবে বলে আশা করছি। তরুণদের জন্য ইশতেহারে রাখা অনেক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সময় সাপেক্ষ ব্যাপারও বটে। তবে চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর জন্য কোন সময় বা বাড়তি পরিকল্পনার দরকার আছে বলে মনে করি না। তাই ইশতেহার রাখা এই প্রতিশ্রুতির যত দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে, বেকারদের জন্য ততই ভাল হবে।

তাই আশা করব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অতি গুরুত্বের সঙ্গে ইশতেহারে তরুণদের জন্য চাকরিতে প্রবেশের বয়স সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি পূরণপূর্বক দ্রুতই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সুবিচারস্বরূপ একটি সঠিক সিদ্ধান্ত নিবেন।

লেখক : প্রকৌশলী

nazmulhussen@yahoo.com