১৪ জানুয়ারী ২০১৯

শাটডাউন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বরূপ তুলে ধরতে সত্তর দশকে মার্কিন হিপ্পি কবি এ্যালেন গিনসবার্গ লিখেছিলেন এক কবিতা। গালাগালির কমতি ছিল না সে কবিতায়। আলোড়ন তুলেছিল কবিতাটি সমাজতান্ত্রিক শিবিরের মধ্যেও। যুক্তরাষ্ট্র তখন যুদ্ধবাজ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত। দেশে দেশে তাদের সেনাবাহিনী হানাদার হিসেবেই মূল্যায়িত হয়েছিল। শীর্ষ পরাশক্তি হিসেবে যার দাপট ছিল বিশ্বের নানা দেশ জুড়ে, সেই দেশ আজ অচলায়তনে বাঁধা পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আংশিক অচলাবস্থার ২৪ দিন অতিবাহিত হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শাটডাউনের ঘটনা ঘটল। মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনড় অবস্থানে রয়েছেন। এই দেয়াল নির্মাণে কংগ্রেসে আর্থিক মঞ্জুরি বিল পাস করা না হলে জরুরী অবস্থা ঘোষণার মতো কঠোর হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেছেন। গত ২২ ডিসেম্বর থেকে এই অচলাবস্থার শুরু। শাটডাউট মানে মার্কিন সরকারের কিছু প্রতিষ্ঠানের কাজ বন্ধ হওয়াকে ধরে নেয়া হয়। এ সময় কর্মীদের কাজ করতে হয় বিনা বেতনে। কিছু প্রতিষ্ঠানে কাজ বন্ধ হলেও সরকারী-বেসরকারী আরও অনেক প্রতিষ্ঠানে শাটডাউনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মার্কিন ইতিহাসে শাটডাউন বা সরকারের আংশিক অচলাবস্থা শুরু হয় ১৯৭৬ সালে। সবচেয়ে বড় শাটডাউন এর আগে হয়েছিল ক্লিনটনের আমলে ২১ দিন। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর গত বছর একবার ঘটেছিল।

দীর্ঘতম এই শাটডাউন ট্রাম্প সরকারকে পুরো অচলাবস্থার মুখে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বলে আপাত মনে হয়। এতে প্রত্যক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্র কমপক্ষে ৭৭ দিক থেকে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এক জরিপে বলা হয়েছে, ৬৯ ভাগ মার্কিনী মনে করেন দেয়াল নির্মাণ দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ডেমোক্র্যাট সদস্যরা মনে করেন, জনগণের করের অর্থ এভাবে অপচয় করা যায় না। ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল এই দেয়াল নির্মাণ। মেক্সিকো সীমান্তে অনুপ্রবেশকারী, সন্ত্রাসবাদী, মাদক পাচারকারীদের রুখতে দেয়াল অত্যন্ত জরুরী বলে ট্রাম্প মনে করেন। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে অবিলম্বে এই কাজ শুরু করা প্রয়োজন বলে বার বার বলে আসছেন। এতসব বাক্যবাণেও হেলানো যাচ্ছে না ডেমোক্র্যাটদের। তারা কিছুতেই প্রকল্পের জন্য ৫৭০ কোটি ডলার মঞ্জুর করতে রাজি হচ্ছে না। গত ২১ ডিসেম্বর একটি বিল পাস করার কথা থাকলেও ডেমোক্র্যাটরা ভিন্ন একটা বিল পাস করে। এতে ট্রাম্পের দাবি করা অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়নি। ক্ষুব্ধ ট্রাম্প কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেয়ার ফলে পরিস্থিতি সংঘাতময় হয়ে উঠছে। প্রশাসনিক অচলাবস্থা জনমনেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। কৃষি, বাণিজ্য, বিচার বিভাগ, স্বরাষ্ট্র, আবাসন ও নগর উন্নয়ন, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং পরিবহন বিভাগের আট লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিনা বেতনে কাজ করতে হচ্ছে। বেতন-ভাতা না পেয়ে তাদের বাধ্য হয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। বেতন না দিয়ে চাকরি করতে বাধ্য করার ঘটনাকে ‘অমানবিক’ উল্লেখ করে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে আমেরিকান ফেডারেশন অব গবর্নমেন্ট এমপ্লয়ীজ। অভ্যন্তরীণ আয়কর বিভাগ তাদের অনেক কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা অবশ্য আশঙ্কা করছেন, চলতি মাসে পাঁচ লাখ মার্কিনী কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হবেন। ফলে বেকারত্বের হার চারভাগে দাঁড়াবে। ট্রাম্পের আচরণগত একগুঁয়েমি স্পষ্ট করছে যে, অচলাবস্থা সহজে কাটবে না। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছে, মাসের পর মাস এমনকি বছর পর্যন্ত শাটডাউন চালিয়ে যাবেন। জরুরী অবস্থা জারি করে দেয়াল নির্মাণ তিনি করবেনই। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে মতৈক্য দুরূহ। ডেমোক্র্যাটরা স্পষ্ট করেছেন, দেয়াল নির্মাণের সঙ্গে শাটডাউনের কোন সম্পর্কই নেই। ট্রাম্প তা মানছেন না। জরুরী অবস্থা জারি করলে ডেমোক্র্যাটরা আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। পরাশক্তির শক্তি পরীক্ষা চলছে এখন। এই অবস্থা আরও কিছুদিন অতিবাহিত হলে জনবিক্ষোভ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। ট্রাম্পের শুভবুদ্ধির উদয় না হওয়া পর্যন্ত অবস্থার পরিবর্তনের লক্ষণ অতি ক্ষীণ।