২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাট পাতার চা

বিস্ময়কর অবশ্যই বাঙালীর জন্য যে, পাট পাতার চা এদেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। অচিরেই তা বাজারে আসবে। সোনালি আঁশের জন্য খ্যাত পাটের বহুমুখী ব্যবহার এক দশক আগেও ছিল অকল্পনীয়। পাট এখন শাড়ি, পোশাক, ব্যাগসহ নানাবিধ পণ্য তৈরির উপকরণ হিসেবে বেশ সমাদৃত। বাঙালীর খাদ্য তালিকায়ও রয়েছে পাটশাক। এই শাক দু’ধরনের হয়, মিঠা ও তিতা। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যে নালিতাশাক বা পাটশাকেরও বর্ণনা মেলে। কিন্তু সেই পাট গাছের পাতা দিয়ে যে চা তৈরি সম্ভব, তার আবিষ্কারক বাংলাদেশীকে অবশ্যই অভিনন্দন। পাট পাতা থেকে দুই বছর আগে চায়ের উৎপাদন শুরু হয়েছে। দেশের মানুষ এখনও এর স্বাদ না পেলেও এরই মধ্যে তা ইউরোপের চার দেশে বেশ সাড়া ফেলেছে। ‘অর্গানিক পণ্য’ হিসেবে পরিগণিত এই পাতার চায়ের কদর বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দেশে উৎপাদিত পাট পাতার চা শতভাগ অর্গানিক কিনা, তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। যদিও ইতোমধ্যে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে।

বিজেএমসির উপদেষ্টা এইচএস ইসমাইল খান এই চায়ের উদ্ভাবক। তার মতে, দেশে এবং জার্মানির একাধিক প্রতিষ্ঠানে এই চা পরীক্ষা করে ইতিবাচক ফল মিলেছে। তবে এখনই চূড়ান্তভাবে একে অর্গানিক বলা যাচ্ছে না। কারণ পুরো প্রক্রিয়াটি এখনও পরীক্ষামূলক। ফুল আসার আগে তোষা পাটের গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করতে হয়। সূর্যের আলোয় তা শুকিয়ে গুঁড়া করলেই চা তৈরি হয়ে যায়। এরপর সেখান থেকে তৈরি পানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী চিনি বা মধু মিশিয়ে পান করা যায়। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট এই চা উৎপাদন শুরু করে। পরে অপর একটি প্রতিষ্ঠান অর্গানিক চা হিসেবে তা জার্মানিতে রফতানি শুরু করে। এখন ইংল্যান্ড, সুইডেন, ফ্রান্সের বাজারেও ‘অর্গানিক’ পরিচয়ে রফতানি করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত উৎপাদিত দশ টন চায়ের মধ্যে আড়াই টন বিদেশে রফতানি করা হয়েছে। পাইপলাইনে আছে আরও তিন টন। আগামী মার্চ-এপ্রিল নাগাদ এটি বাংলাদেশের বাজারে ছাড়া হতে পারে। আগামী ছয় মার্চ পাট দিবস। ওই দিনই দেশে পাটের চায়ের মোড়ক উন্মোচন হবে। সেই হিসেবে মার্চ-এপ্রিল মাস নাগাদ বাজারে চলে আসবে পাটের চা। ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাট পাতার চা উপহার দেয়া হলে তিনি এতে জেসমীন ফ্লেভার যুক্ত করার পরামর্শ দেন। পরে আরও তিনটি ফ্লেভার যুক্ত করা হয়। কৃত্রিম নয়, অর্গানিক উপায়েই মূল উপাদান সংগ্রহ করে ফ্লেভার যুক্ত করা হয়েছে।

বাঙালীর চা পান শতাব্দী পেরিয়ে গেছে। পুরাতন কালে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ফিলিপিন্স ও মিসরে রোগ নিরাময়, রোগ প্রতিরোধ এবং রোগীর দ্রুত সুস্থ হওয়ার জন্য পাট পাতার নির্যাস ও স্যুপ নিয়মিত ব্যবহার হতো। খ্রিস্টপূর্ব ছয় হাজার বছর আগেও পাট পাতা রোগ নিরাময় ও সৌন্দর্য চর্চায় ব্যবহৃত হতো। চা এদেশে এসেছে ব্রিটিশদের হাত ধরে। তাদের উদ্যোগে এই উপমহাদেশে চা বাগান গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশও চা রফতানিকারক দেশ। পাট পাতার চায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ইতোমধ্যেই প্রাণীদেহে সম্পন্ন হয়েছে। এবার মানুষের ওপর পরীক্ষা করা হবে। আর্সেনিক আক্রান্ত দুই শ’ জনের ওপর পরীক্ষা চলবে দুই বছর ও ডায়াবেটিক আক্রান্ত মানুষের ওপর চলবে ছয় মাস। আর্সেনিক আক্রান্ত মানুষ এই চা নিয়মিত পান করলে শরীর থেকে আর্সেনিক পুরোপুরিভাবে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরীক্ষা সফল হলে তখন সিদ্ধান্ত নেয়া হবে পাট পাতার তৈরি চা খাওয়ানো হবে, নাকি ক্যাপসুল তৈরি করা হবে। রাজধানীর উত্তরখানে একটি কারখানায় এই চা উৎপাদন হচ্ছে। আরও কয়েকটি স্থানেও কারখানা হবে।

পাটের বহুমুখী ব্যবহারের ক্ষেত্রে চা পাতা দেশের জন্য সুসংবাদ বৈকি। যারা উদ্ভাবন করেছেন তারা একটি মহৎ কাজ করেছেন বলা যায়। আশা রয়েছে, সোনালি আঁশের পাট পাতার চা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হবে। রফতানি পণ্যের তালিকায় ক্রমশ শীর্ষে ঠাঁই নেবে।