২১ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মাদকের বলি

মানুষের মজ্জাগত যদি হয়ে ওঠে আসক্তি তবে তার কাছ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া সহজ হয়ে ওঠে না। আসক্তির রয়েছে নানা ধরনধারণ। আসক্তির সবচেয়ে খারাপ ও নিকৃষ্ট স্তর হচ্ছে মাদকাসক্তি। এ এক ভয়াবহ আসক্তি। একবার এর ফাঁদে পা দিলে আটকে যায় পদযুগল, বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। চিকিৎসায় নিরাময়ের পথ পাওয়া বোধহয় ভাগ্যেরই বিষয়। মাদকাসক্তি মানুষকে স্বাভাবিকতার বাইরে অস্বাভাবিকতায় এমনইভাবে টেনে নেয় যে, মনুষ্যপদবাচ্য থেকে দূরে সরে গিয়ে অমানুষের তালিকায় ঠাঁই হয়ে যায় অনায়াসে। হিতাহিতজ্ঞানশূন্যতা মাদকাসক্তকে অপরাধের বেড়াজালে আবদ্ধ করে সমাজকে কলুষিত করতে তৎপর হয়। মাদকাসক্তির ভয়াবহতা এতই তীব্র যে, সমাজ পরিবার শুধু তারা ভুক্তভোগী নয়। পরিপার্শ্বও আক্রান্ত হতে বাধ্য। কোন সমস্যা, তা যতই গুরুতর হোক না কেন, যদি স্থায়ী রূপ ধারণ করে, তাহলে একটা সময় তা যেন গা-সওয়া ব্যাপারে পরিণত হয়। বাংলাদেশে মাদকাসক্তি তেমনই এক ভয়ঙ্কর সমস্যা। তরুণ যুবকদের বেশ বড় একটা অংশ এই আত্মঘাতী আসক্তির শিকার। তবে তা শুধু এই বয়সীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, পূর্ণ বয়স্ক এমনকি শিশু-কিশোরদের মধ্যেও মাদকাসক্তি ছড়িয়ে পড়েছে। মাদকাসক্তির এলাকাও সীমাবদ্ধ নেই। খোদ রাজধানী ঢাকা থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম-মফস্বল পর্যন্ত সারাদেশে তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সঠিক পরিসংখ্যান মেলে না। সংখ্যার হিসাব পেলে সমস্যাটি যে কত ব্যাপক সে সম্পর্কে ধারণা মিলত এবং সমাজে এ নিয়ে কিছু করার জোরালো তাগিদ তৈরি হতো। সামাজিক লোকলজ্জার কারণে অনেক পরিবার সন্তানের মাদকাসক্তির বিষয়টি আড়াল রাখে। মাদকাসক্তি স্থায়ী রূপ ধারণ করেছে মাদকের সহজসভ্যতা এবং মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় যথাসময়ে না আনার কারণে। মাদক নিয়ে এ দেশে কারবার শুরু হয় পঁচাত্তর পরবর্তী ক্ষমতা দখলদার সামারিক জান্তা শাসকের আমল হতে। ক্ষমতাসীনদের তত্তা¡বধানে দেশব্যাপী গাঁজা, কোকেন, ম্যানড্রেক্স, ইউনিকার্টন, আফিম, চরস, ফেনসিডিল নামক মাদকের বিস্তার ঘটে। সে সময় এসব সহজলভ্য করে দেয়া হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিকভাবে পঙ্গু করতে বিদ্যায়তনে এর ব্যাপক প্রসার ঘটানো হয়। ক্ষমতাসীনরা এই ব্যবসায় জড়িত থাকার পাশাপাশি মাদক নির্মূলেও ছিল সোচ্চার কণ্ঠ কিন্তু তাতে মাদক ব্যবসার রমরমা অবস্থার বিন্দুমাত্র হেরফের হয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও সুলভ ও প্রায় সর্ববিস্তারী মাদক হচ্ছে ‘ইয়াবা’। মিয়ানমার থেকে এসব আসে চোরাই পথে।’ এই ব্যবসার সঙ্গে জনপ্রতিনিধি, পুলিশ সদস্য ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের একাংশের জড়িত হওয়ার খবর গণমাধ্যমেই প্রকাশ হয়। তাদের সহায়তায় এই ব্যবসা চলছে অবাধে। সর্বশেষ কয়েকটি বৃহৎ চালান ধরা পড়ার পর গ্রীন টির মোড়কে নতুন মাদক ‘খাট’ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নাইজিরিয়া থেকে এসব চা পাতা হিসেবে আমদানি করা হয়ে আসছে।

গত মাসে শ্রীলঙ্কায় ধরা পড়া দেশটির ইতিহাসে হেরোইনের বৃহত্তম চালানের সঙ্গে চার নারীসহ ছয় বাংলাদেশী আটক হওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক। ইয়াবা চোরাচালান বন্ধে তীব্র নজর দেয়ার আড়ালে অপর মাদক হেরোইনের প্রসার যে বাড়ছে, তা কারও নজরে বোধহয় পড়ছে না। সরকার গত এক বছরের বেশি সময় ধরে শূন্য সহিষ্ণতা নিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান চালিয়ে আসছে। অভিযান চলাকালে ‘ক্রসফায়ারে’ দুই শতাধিক মাদক বিক্রেতাও নিহত হয়েছিল। ফিলিপিন্সেও মাদক ব্যবসায়ী ও আসক্তদের নির্মূলে হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। কিন্তু তাতেও সর্বনাশা মাদকচক্র নিয়ন্ত্রণে আসেনি। দেশে ইয়াবার রমরমা ব্যবসা চলছে। এতে দ্রুত-বিত্তবান হওয়ার নমুনা কক্সবাজারে নিম্ন আয়ের লোকজনের হঠাৎ অর্থবিত্তে ফুলে-ফেঁপে ওঠায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনেকেই এই ব্যবসায় জড়িত। মাদকাসক্তি দূর করার জন্য সামাজিক ও পারিবারিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি মাদক চোরাচালান এবং বিক্রি বন্ধে সতর্কতা বাড়ানো জরুরী। জনগণের সহায়তা নিয়ে সরকারকেই মাদক নিয়ন্ত্রণে হতে হবে সোচ্চার এবং কার্যকর। সরকার মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখছে।