২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শব্দের ব্যবহার এবং সুশীল সমাজ

  • মিলু শামস

সহস্রাব্দের শুরু থেকে রাজনীতিতে সুশীল সমাজ যেভাবে ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে আগে তেমন দেখা যায়নি। দেখার কথাও নয়, কারণ বর্তমান বিশ্ব প্রক্রিয়ার যে স্তরে পৃথিবীজুড়ে সুশীল সমাজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরাম নামের এক সংগঠন। যার জন্ম সহস্রাব্দের শুরুতে। নিজেদের এরা প্রকাশ করে বিকল্প নতুন বিশ্ব গড়ার কারিগর হিসেবে। এদের ভাষায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নয় সমাজতন্ত্র ও নয় চাই তৃতীয় ধারা বা বিকল্প পৃথিবী। নয়া উদারনীতিবাদী বিশ্বায়নের বিপরীতে সংহতির অখ- বিশ্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া। কিন্তু এ বিকল্প অর্জনের প্রক্রিয়া কী হবে তা স্পষ্ট নয়। পোস্ট মডার্নিস্ট তাত্ত্বিকদের মতো পোস্ট ইম্পেরিয়ালিজম, টার্ম ব্যবহার করে ইম্পেরিয়ালিজম কে আড়াল বা প্রচ্ছন্ন না করলেও এরা যাদের অর্থসহায়তায় চলে তাদের চরিত্র লক্ষণ থেকে বোঝা যায় মুখে যাই বলুক পোস্ট মডার্নিস্টদের উদ্দেশ্যের সঙ্গে এদের উদ্দেশ্যের তেমন পার্থক্য নেই। শুরুতে এদের ফান্ড আসতো ফোর্ড ফাউন্ডেশন, চার্লস-স্টুয়ার্ট ফাউন্ডেশন, ডেনমার্ক ফিনল্যান্ড ইতালি ও নেদারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জার্মানির অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সহায়তা মন্ত্রণালয়, ওয়ার্ল্ড ফুড অর্গানাইজেশন, ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনসহ জাতি সংঘের আরও কিছু অর্গানাইজেশন থেকে। এদের ঘোষিত উদ্দেশ্য হচ্ছে, আন্তর্জাতিক নাগরিক কমিটি করে বিশ্ব ব্যাংক আইএমএফ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো সংগঠনগুলোর শান্তিপূর্ণ বিরোধিতা করা। সংস্কার ও পুনর্গঠনের জন্য সমালোচনা ও সুপরামর্শ দেয়া। একুশ শতকের নতুন তাত্ত্বিক সংযোজন।

উদ্দেশ্য পূরণে এদের নির্ভরতা মূলত এনজিও ও সুশীল সমাজের ওপর। পৃথিবীজুড়ে এদের মাধ্যমেই কাজ করে এরা। এদের প্রথম সম্মেলন হয়েছিল দু’হাজার এক সালে। একটু খেয়াল করলে দেখব এ সময় থেকেই দেশীয় রাজনীতিতে সংলাপ তৃতীয় ধারা সুশাসন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ইত্যাদি শব্দের আমদানি হয়েছে। এবং এর ঝনঝনানি সবচেয়ে বেশি এসেছে এনজিও ও সুশীল সমাজের কাছ থেকে। কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শোনা এসব শব্দ রাজনৈতিক সঙ্কট কাটাতে আসলে কি কোন অবদান রাখতে পেরেছে? সংলাপ নিয়ে যে পরিমাণ কথা ও কালি খরচ হচ্ছে তাতে মনে হয় বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির সঙ্কট সমাধানের একমাত্র গোপন সূত্রটি ওর মধ্যেই লুকিয়ে আছে।

সরকার ও বিরোধীদলকে একবার সংলাপে বসাতে পারলেই ব্যস, সব সমস্যা ভোজবাজীর মতো উবে যাবে। আসলে এটাই স্ট্র্যাটেজি। সমস্যার শেকড় ওপড়ানো নয় বিচ্ছিন্নভাবে আহা উহু করে সংস্কারের প্রলেপ লাগিয়ে মানুষকে তাক লাগিয়ে দেয়া। বাংলাদেশের সুশীলরা সুনিপুণভাবে তাই করছেন। উচ্চ ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এ টোপ গিলতে সবসময় প্রস্তুত। নিজেদের মেধা ও পা-িত্য বিক্রি করে সংস্কারবাদী ফর্মূলাকে পরিশীলিত করে তাত্ত্বিক পরিভাষায় টিভি টক শো, গোলটেবিল বৈঠক ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করে।

জীবন যাপনের অনুষঙ্গে পরিবর্তন এলে তার স্বাভাবিক প্রভাব পড়ে মানুষের ভাষায়ও। নতুন শব্দ যোগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যবহারিক অর্থবোধকতা নতুন আবহ তৈরি করে। বিশ বছর আগেও লগ অন, সাইন আউট, এসএমএস ফেসবুক ইউটিউব ওয়াই ফাই স্কাইপ ইত্যাদি শব্দের সঙ্গে এদেশের মানুষের তেমন পরিচয় ছিল না। আজকের দিনে এসব ছাড়া নাগরিক জীবন কল্পনা করা যায়? একটু খেয়াল করলে এর সাংস্কৃতিক অভিঘাত সহজেই চোখে পড়ে। আত্মীয়স্বজন বন্ধু প্রতিবেশীর বাসায় ঘটা করে বেড়াতে যাওয়ার চল প্রায় উঠে গেছে। শুয়ে বসে, রাস্তায় চলতে চলতে এমন কি রান্না ঘর বা বাথরুমে ও মোবাইল ফোনে যোগাযোগ ও তথ্য বিনিময়ের কাজ যখন তখন সেরে ফেলা যাচ্ছে। স্কাইপ সংযোগে বিদেশে বাস করা স্বজনেরা মুহূর্তে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন। ইন্টারনেটের ইতিবাচক ব্যবহারকারী কিশোর তরুণদের সলিউশন বক্স কম্পিউটার। পাঠ্য বইয়ের জটিল সমস্যার সমাধান থেকে শুরু করে ইনডোর প্ল্যাটেশন কিংবা দেশী-বিদেশী যে কোন রান্নার আপডেট রেসিপি পাওয়া মাত্র হাতে তুলে দিচ্ছে। পরিবারে বয়স্কদের অভিজ্ঞতা শেয়ারের গুরুত্ব কমছে।

এ হচ্ছে জীবনযাপনে শব্দের আরেক পরিবর্তিত ইতিবাচক রূপ। যা তথাকথিত পরিবর্তিত বৈশ্বিক সুরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।