১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মেঘনায় ট্রলারডুবি ॥ ট্যাঙ্কারের ধাক্কা

মেঘনায় ট্রলারডুবি ॥ ট্যাঙ্কারের ধাক্কা
  • ২০ জন নিখোঁজ উদ্ধার ১৪, বিলম্বে অভিযান

স্টাফ রিপোর্টার, মুন্সীগঞ্জ ॥ মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার চরঝাপটার কাছে মেঘনা নদীতে তেলবাহী ট্যাঙ্কারের ধাক্কায় মাটিবোঝাই ট্রলারডুবির ঘটনায় ২০ জন নিখোঁজ রয়েছে। সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হয়েছে ১৪ জন শ্রমিক। সোমবার দিনগত রাত ৩টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। তবে মুন্সীগঞ্জ প্রশাসনের উদ্ধার অভিযানের বিলম্বের কারণ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি অনেকটা গুজব বলেই ধরে নিয়ে প্রশাসন তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। সোমবার রাত ৩টার দিকে ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটলেও ২৯ ঘণ্টা পরে বুধবার সকাল ৮টায় প্রশাসন উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তবে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ট্রলারটির সন্ধান পাওয়া যায়নি। সন্ধান কাজ বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা থেকে আবার শুরু হবে।

মুন্সীগঞ্জ সদরের ইউএনও ফারুক আহম্মেদ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, কুয়াশাচ্ছন্ন গভীর রাতের এই দুর্ঘটনার স্থান চিহ্নিত করতে সমস্যা হচ্ছিল। বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের নিয়ে বুধবার দুর্ঘটনার স্থান এবং দুর্ঘটনাকবলিত ট্রলারটি শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। ঘটনাস্থলে মুন্সীগঞ্জের প্রশাসন ছাড়াও পুলিশ, নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড, বিআইডব্লিউটিএ ও ফায়ার সার্ভিস কাজ করছে।

ইউএনও জীবিত শ্রমিকদের বরাত দিয়ে জানান, কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে ট্রলারে মাটি তুলে ৩৪ জন শ্রমিক নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বক্তাবলীর ইটেরভাঁটিতে নিয়ে যাচ্ছিল। বিপরীত দিক থেকে আসা একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ট্রলারে ধাক্কা দেয়। এতে ট্রলারটি ডুবে যায়। ট্রলারে থাকা শ্রমিকদের মধ্যে অন্যরা সাঁতারে প্রাণে বাঁচলেও ট্রলারটির কেবিনের ভেতরে ঘুমন্ত ২০ শ্রমিকের ভাগ্যে কি হয়েছে এখনও জানা যায়নি। এদের মধ্যে ১৮ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। ১৭ জনের বাড়ি পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় এবং একজনের বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায়। তিনি জানান, ডুবে যাওয়া ট্রলারটির মালিক বক্তাবলীর জাকির দেওয়ান। এই মাটি জাকির দেওয়ানের ইটভাঁটায় ব্যবহারের কথা ছিল। এই ট্রলারডুবির ঘটনায় জাকির দেওয়ান অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে রয়েছেন বলে বেঁচে যাওয়া শ্রমিকরা তাকে জানিয়েছেন। তবে এখনও ট্রলারের মালিক পক্ষের লোকজন দুর্ঘটনাস্থলে আসেনি।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান জনান, মঙ্গলবার পাবনার ভাঙ্গুড়া থানায় ওসির মাধ্যমে ট্রলারডুবির ঘটনা অবগত হয়ে মেঘনায় নৌপুলিশ দিয়ে সন্ধান চালায়। কিন্তু নৌপুলিশ এ রকম কোন ঘটনার তথ্য মিলাতে পারেনি। বুধবার সকাল থেকে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়। তবে ট্রলার বা নিখোঁজ শ্রমিকদের কোন হদিস পাওয়া যায়নি।

মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে উদ্ধারকারী জাহাজ তলব করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড ও বিআইডব্লিউটিএ কাজ করছে।

গজারিয়া ও মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা এবং চাঁদপুরের উত্তর মতলবের সীমান্তবর্তী এলাকা এটি। বড় আকারের দুর্ঘটনার পর মেঘনায় ট্রলারটি খুঁজে ফিরছে সকলে। দুর্ঘটনাটি ঘটেছে রাতের বেলায়, তাই দুর্ঘটনাস্থল চিহ্নিত করতে সমস্যা হচ্ছে। এদিকে নিখোঁজের স্বজনরাও আসতে শুরু করেছেন। ট্রলারডুবিতে বেঁচে যাওয়া কয়েক শ্রমিক দুর্ঘটনাস্থল চিহ্নিত করার জন্য সন্ধানকারী জাহাজে অবস্থান করছে। ঘটনাস্থলে গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাসান সাদী জানান, মেঘনা অনেক বড় নদী। তাই শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। ইউএনও জানান, পাবনা থেকে নিখোঁজদের ৩০/৩৫ জন স্বজন এসেছেন। মেঘনার পাড়ের একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই স্বজনদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে উপজেলা প্রশাসন।

নৌপুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মাহাবুবুর রহমান, নৌপুলিশের ঢাকা অঞ্চলের এসপি হুমায়ুন কবির ঘটনাস্থলে গতকাল দিনভর মেঘনা নদীতে থেকে উদ্ধার অভিযান তদারকি করেন।

ট্রলারডুবিতে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া শ্রমিক পাবনার মোঃ হাবিবুর রহমান ও পরশ কুমার সিং বলেন, নদীতে প্রায় এক ঘণ্টা সাঁতার কাটার পর একটি বালুর জাহজে উঠে প্রাণ বাঁচান। বেঁচে যাওয়া আরেক শ্রমিক মামুন আলী বলেন, আমরা ১৪ জন শ্রমিক বেঁচে গেলেও কেবিনের ভেতরে থাকা ২০ জনের কেউই বেরুতে পারেনি। কনকনে শীতে অন্ধকার রাতের সেই বেঁচে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে মামুন আলী বলেন, তেলের ট্যাঙ্কারটি দেখতে পেয়ে আমাদের ট্রলারের চালক বিপদ সংকেত দিয়ে ঘণ্টা বাজায়। আমরা তাড়াহুড়া করে ওপরে উঠে আসার আগেই ট্যাঙ্কারটি আমাদের ট্রলারের ওপরে উঠিয়ে দেয়। এরপরেই ট্রলারের বাইরে থাকা শ্রমিকরা ছিটকে নদীতে পড়ে যান, ডুবে যায় বড় আকারের ট্রলারটি। কিন্তু তেলের ট্যাঙ্কারটি তাদের উদ্ধারে কোন সাহায্য পর্যন্ত করেনি। এ সময় আমরা সাঁতার কেটে কাছ দিয়ে যাওয়া মাটির ট্রলারে উঠে জীবন রক্ষা করি। পরে ফতুল্লার বক্তাবলী গিয়ে পাবনার ভাঙ্গুড়ার বাড়িতে ফোন করে ঘটনা জানাই। ঘটনা শুনে নিখোঁজের স্বজনরা ভাঙ্গুড়া থানা ও প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ভাঙ্গুড়া থানা পুলিশ মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু মুন্সীগঞ্জের প্রশাসন তাদের উদ্ধারে তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়নি। যদি মঙ্গলবার ভাল করে উদ্ধার অভিযান চালানো হতো তবে হয়তো সেদিনই ট্রলারটির সন্ধান পাওয়া যেত।

নিখোঁজ ২০ জনের মধ্যে ১৮ জনের পরিচয় মিলেছে ॥ নিহতরা হলেন- পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার খানমরিচ ইউনিয়নের মু-ুমালা গ্রামের গোলাই প্রামাণিকের ছেলে সোলেমান হোসেন, জব্বার ফকিরের ছেলে আলিফ হোসেন ও মোস্তফা ফকির, গোলবার হোসেনের ছেলে নাজমুল হোসেন-১, আবদুল মজিদের ছেলে জাহিদ হোসেন, নূর ইসলামের ছেলে মানিক হোসেন, ছায়দার আলীর ছেলে তুহিন হোসেন, আলতাব হোসেনের ছেলে নাজমুল হোসেন-২, লয়ান ফকিরের ছেলে রফিকুল ইসলাম, দাসমরিচ গ্রামের মোশারফ হোসেনের ছেলে ওমর আলী ও মান্নাফ আলী, তোজিম মোল্লার ছেলে মোশারফ হোসেন, আয়ান প্রামাণিকের ছেলে ইসমাইল হোসেন, সমাজ আলীর ছেলে রুহুল আমিন, মাদারবাড়িয়া গ্রামের আজগর আলীর ছেলে আজাদ হোসেন, চ-িপুর গ্রামের আমির খান ও আবদুল লতিফের ছেলে হাচেন আলী এবং উল্লাপাড়া উপজেলার গজাইল গ্রামের তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে রহমত আলী।

উদ্ধার অভিযানে মুন্সীগঞ্জ প্রশাসনের ভূমিকায় জনমনে প্রশ্ন-

ডুবে যাওয়া ট্রলারটি সম্পর্কে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থানা পুলিশ মঙ্গলবার সকালে অবগত হলেও তারা ট্রলারটি উদ্ধারে তেমন কোন ভূমিকা না নেয়ায় জনমনে এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সাংবাদিকরাও পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় যোগাযোগ করেও পুলিশ ট্রলারডুবির ঘটনাটি নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং এটি একটি গুজব বলেই চালিয়ে দেয়া হয়েছে।

প্রশাসন জানিয়েছে, বিকেল ৫টা পর্যন্ত ট্রলারটির সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে সন্ধান কাজ বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা থেকে আবার শুরু হবে।

শোকের মাতম ॥ নিজস্ব সংবাদদাতা পাবনা থেকে জানান, মুন্সীগঞ্জের মেঘনা নদীতে মাটিবোঝাই ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ ২০ শ্রমিকের মধ্যে ১৭ জনের বাড়ি ভাঙ্গুড়া উপজেলার খানমরিচ ইউনিয়নে। মঙ্গলবার ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ ১৭ শ্রমিকের নিখোঁজের সংবাদ জানাজানি হলে তাদের পরিবারে শুরু হয় শোকের মাতম। দিনভর নিখোঁজ এ শ্রমিকদের বাড়িতে শত শত মানুষ ভিড় জমায়। মঙ্গলবার নিখোঁজ শ্রমিকের স্বজনরা তাদের সন্ধানে মুন্সীগঞ্জে হাজির হয়। ট্রলারডুবির ঘটনায় উদ্ধারকৃত শ্রমিক খানমরিচ ইউনিয়নের চ-িপুর গ্রামের মামুন আলী জানান, মঙ্গলবার ভোরে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে ৩৪ জন শ্রমিক মাটিবোঝাই ট্রলার নিয়ে নারায়ণগঞ্জের বক্তাবলী আসার পথে ঘটনাস্থলে বিপরীতমুখী মালবাহী জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষে ট্রলারটি ডুবে যায়। ট্রলার দুর্ঘটনায় ১৪ জন প্রাণে বাঁচলেও ২০ জন নিখোঁজ হয়। এ দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া মামুন আলী ও শাহ আলম জানান, মালবোঝাই জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লাগার সময় তারাসহ অধিকাংশ শ্রমিক ঘুমিয়ে ছিলেন। আচমকা ট্রলারটি ডুবে গেলে চারদিকে অন্ধকারের মধ্যে তিনি নদীতে ভাসতে থাকেন। ট্রলার মালিক তাদের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এরপর ট্রলার মালিক মেঘনা নদীতে তাদের অনুসন্ধানকালে ৩ ঘণ্টা পানিতে ভেসে থাকার পর তাদের ১৪ জনকে উদ্ধার করা হয়। এখন পর্যন্ত নিখোঁজ শ্রমিকদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে উদ্ধার অভিযান চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

নির্বাচিত সংবাদ