২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পুতুলনাচ নীতিমালা

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ উপন্যাসে মানুষ যে পুতুল, সুতোর টানে যে নড়াচড়া করে, জীবন পথে চলে তার অনুষঙ্গ পাওয়া যায়। ছোট্ট বেলা পুতুল খেলার সঙ্গীরা, বড় হলে কোথায় হারিয়ে যায়। কেউ জানে না বা বুঝতেও পারে না যেন। পুতুলের সঙ্গে শৈশব, কৈশোর জড়িয়ে যায় সমাজের প্রায় সবখানেই যেন। পুতুলের আছে নানা রকমফের। সেই পুতুলগুলো নাচে, গান গায়, তখন অন্যরকম আমেজ বয়ে আসে। রঙিন পুতুল, হাতে ও মাথায় সুতো বাঁধা। সুর ও ছন্দের তালে তালে নাচে মঞ্চে। বিনোদনপিয়াসী দর্শক পুতুলের হাসিতে যেমন হেসে ওঠেন, তেমনি পুতুলের কান্নায় কাঁদেন। বিভিন্ন পার্বণ, উৎসবে পুতুলনাচের আয়োজন এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। বাঙালী সংস্কৃতিতে পুতুলনাচ এমনভাবে জড়িয়ে যে, শুধু লোকনাট্য নয়, গীতিকার ও কবিরা পুতুলনাচকে নিয়ে বহু গান, কবিতা রচনা করেছেন। মধ্যযুগের অনেক কাব্যে পুতুল, পুতুলনাচ, বাজিকর, সূত্রধর ইত্যাদির উল্লেখ পাওয়া যায়। অনেক মানুষ পুতুল নাচকে নিয়েছেন পেশা হিসেবে। কিন্তু সময় ও সংস্কৃতির পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে শত শত বছরের সাংস্কৃতিক এ ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তপ্রায়। নয়া প্রজন্মের অনেকের কাছে পুতুলনাচ যেন গল্পগাথা। শেখ হাসিনার সরকার বিলুপ্তপ্রায় এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য ‘পুতুল নাট্যশিল্প উন্নয়ন নীতিমালা ২০১৮’ ঘোষণা করেছে। হারিয়ে যাওয়া, ফুরিয়ে যেতে থাকা পুতুল নাট্যচর্চার সার্বিক মানোন্নয়ন এবং দেশব্যাপী এর বিকাশ, বিস্তার ও প্রসারই নীতিমালার মূল লক্ষ্য। অনেক বিলম্ব হলেও সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা অভিনন্দনযোগ্য। নীতিমালায় ইতিবাচক দিকগুলোই গৃহীত হয়েছে।

তাই পুতুলনাচ শিল্প বাঁচিয়ে রাখার জন্য সরকারী পর্যায়ে অনুদান, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো নির্মাণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হবে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কল্যাণমুখী নানা প্রচার কার্যক্রমে ব্যবহার করা হবে পুতুলনাচ। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে কল্যাণ ও অকল্যাণ বিষয়ে সচেতন করার কাজেও ব্যবহার হবে পুতুলনাচ। প্রতিবছর কয়েকটি পুতুলনাচ দলকে সরকারী অনুদান দেবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রবীণ ও দুস্থ পুতুলনাচ শিল্পীকে অনুদান বা ভাতা দেয়া হবে। পুতুলনাচ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা এবং ভবিষ্যত প্রজন্মকে এ শিল্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া শেখ হাসিনার সরকারের উদ্দেশ্য। এ জন্য দেশের বিভিন্ন ধারার পুতুলনাচের দলগুলোকে শিল্পকলা একাডেমিতে নিবন্ধিত হতে হবে। এসব দলকে প্রতি তিন বছর অন্তর নিবন্ধন নবায়ন করতে হবে। তবে কোন দল পুতুলনাচ প্রদর্শনে ব্যর্থ হলে কিংবা আপত্তিকর বিষয়ক পুতুলনাচ প্রদর্শনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে নিবন্ধন বাতিল হবে। বর্তমানে দেশে কত ধরনের পুতুল ও কত ধরনের কতটি পুতুলনাচ দল রয়েছে এবং তাদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কোন তথ্য নেই। নীতিমালা অনুযায়ী সেই তালিকা করা হবে। নিয়মিত প্রদর্শনী ও উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হবে। এ জন্য শিল্পকলা একাডেমিসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে নাচ পরিবেশন উপযোগী মঞ্চসহ মিলনায়তন তৈরি করা হবে। পর্যায়ক্রমে সারাদেশে হবে। টিভিতে পুতুলনাচ পরিবেশন করা হবে। চালু হবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। নীতিমালা বাস্তবায়নে ‘পুতুল নাচ উন্নয়ন কমিটি‘ গঠন করা হবে। বিদেশে পাঠানো হবে প্রদর্শনের জন্য। প্রাচীন এই শিল্পকে যুগোপযোগী হিসেবে গড়ে তোলার এই সরকারী পদক্ষেপ এক যুগান্তকারী বলা যায়। সারাদেশে পুতুল নাচ পেশা ও প্রদর্শন বিস্তৃত হোক-প্রত্যাশা সংস্কৃতিমোদীদেরও।