২১ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গরিবের ডাক্তার রাকিবুল ইসলাম লিটু আর নেই

 গরিবের ডাক্তার রাকিবুল ইসলাম লিটু আর নেই

স্টাফ রিপোর্টার ॥ হৃদরোগের ডাক্তার নিজেই মারা গেলেন হার্ট এ্যাটাকে। ‘গরিবের ডাক্তার’ বলে খ্যাত উত্তরা আধুনিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডাঃ রাকিবুল ইসলাম লিটু আর নেই (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার দুপুরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৫০ বছর। তিনি স্ত্রী ও তিন ছেলে, আত্মীয় স্বজনসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। মাল্টিপল অরগান ফেইলিয়র নিয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে অধ্যাপক ডাঃ মাহবুবুর রহমানের অধীনে ভর্তি হন তিনি। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও গুণগ্রাহীরা হাসপাতালে ভিড় জমান। হাসপাতাল প্রাঙ্গণেই ওঠে কান্নার রোল। শুক্রবার বাদ মাগরিব উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের খেলার মাঠে ডাঃ লিটুর নামাজে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

ল্যাবএইড হাসপাতালের মুখপাত্র সাইফুর রহমান লেনিন শুক্রবার দুপুরে সাংবাদিকদের জানান, বুধবার রাতে ম্যাসিভ হার্ট এ্যাটাক হয় ডাঃ লিটুর। তখন থেকেই তার অবস্থা ছিল খুবই গুরুতর। বৃহস্পতিবার সকালে তাকে ল্যাবএইড হাসপাতালে আনা হয়। শুক্রবার আনুমানিক বেলা সোয়া একটার দিকে ডাঃ লিটু মারা যান। হার্ট কিডনি ফুসফুসসহ বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অকার্যকর হয়ে পড়েছিল তার। ডাক্তারি ভাষায় যাকে মাল্টি অরগান ফেইলিয়র বলা হয়।

এদিকে ডাঃ রাকিবুল ইসলাম লিটুর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসক, গণমাধ্যমকর্মী, রাজনৈতিক নেতাসহ সর্বমহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তার সুস্থতা কামনা করে অসংখ্য স্ট্যাটাস দেখা যায়।

সবার কাছে মানবদরদী চিকিৎসক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন ডাঃ লিটু। পেশার প্রতি একাগ্রতার কারণে তিনি সবার কাছে অসম্ভব জনপ্রিয় ছিলেন। এই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ প্রতিদিন অসংখ্য রোগী দেখলেও গরিবের কাছ থেকে টাকা নিতেন না। টাকা ছাড়াই অনেকের অস্ত্রোপচার করেছেন। বহু রোগীকে বাড়ি ফেরার জন্য নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়েছেন। জড়িত ছিলেন বিভিন্ন দাতব্য ও সেবামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে। বরাবরই তিনি গরিব ও অসহায় রোগীদের প্রাধান্য দিতেন। এ লক্ষ্যে গঠন করেছিলেন পেশেন্ট ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন। তিনি ছিলেন এই ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক। ডাক্তার হয়েও রোগীদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াইয়ের পাশাপাশি নানা পদক্ষেপও নিয়েছিলেন তিনি। এসব সেবা কার্যক্রমের জন্য তিনি খ্যাতি পেয়েছিলেন ‘গরিবের ডাক্তার’ হিসেবে।

ডাঃ লিটুর মৃত্যুর সংবাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও শুরু হয় শোকবার্তা। শুক্রবার সাংবাদিক কবির আহমেদ খান ফেসবুকে লিখেন আমাদের সবার প্রিয়, বিশেষ করে সাংবাদিক সমাজের কাছে অত্যন্ত পরিচিত মুখ, ডাক্তার, গরিব দুঃখী মানুষের প্রাণের মানুষ রাকিবুল ইসলাম লিটু ভাই ল্যাবএইড হাসপাতালের সিসিইউতে নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন, আজ (শুক্রবার) দুপুরে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুন। সাংবাদিক সেবিকা দেবনাথের লেখায় ফুটে উঠেছে সাধারণ মানুষের সঙ্গে ডাঃ লিটুর সহজে মিশে যাওয়ার প্রবল শক্তির কথা। সেবিকা দেবনাথ ফেসবুকে লিখেছেন এফবিতেই জেনেছিলাম লিটু ভাইয়ের অসুস্থতার খবর। তার চলে যাওয়ার খবরটাও ওখানেই পেলাম। তার সঙ্গে আমার বেশি সখ্য ছিল তা দাবি করছি না। একাত্তর টিভির একটা অনুষ্ঠানে গিয়ে তার সঙ্গে আমার আলাপ এবং দীর্ঘক্ষণ কথা হয়। প্রয়াত তাজিন আপা ছিলেন উপস্থাপনায়। স্টুডিওতে সব মিলিয়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ছিলাম। অনুষ্ঠান শেষে একসঙ্গে ছবি তুললেন। আমার মোবাইল নাম্বার নিলেন, ফোন করে বললেন আমার নাম্বারটা সেভ করে রাখ। আমি ‘লিটু ভাই হার্ট স্পেশালিস্ট’ নাম দিয়ে তার ফোন নাম্বার সেভ করলাম। বললেন, যে কোন সময় যে কোন দরকারে ফোন দিব। তার নাম্বারটা ফোনেই রয়ে গেল নীরবে। একবার নববর্ষেই বোধ হয় তার একটা এসএমএস পেয়েছিলাম। সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ না হলেও স্মৃতিগুলো থেকে যায়। সেগুলো মনেও পড়ে কারণে অকারণে। মরহুম ডাঃ লিটুকে উদ্দেশ্য করে ফেসবুকে সাংবাদিক মাহবুবা জান্নাত লিখেছেন, ভাল মানুষেরা এভাবে তাড়াতাড়ি চলে যায়। আমিও বিপদে লিটু ভাইকে পাশে পেয়েছি। অথচ বিনিময়ে কিছুই করতে পারিনি। আল্লাহ উনাকে বেহেশত নসিব করুন। এভাবে জাতি-ধর্ম-বর্ণ শ্রেণী নির্বিশেষে বিভিন্ন পেশার মানুষ ডাঃ লিটুর অকাল মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।

তার বিদেহী আত্মার চির শান্তি কামনা করার পাশাপাশি শোকসন্তুপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনাও জ্ঞাপন করেছেন অনেকে।