১৮ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যে দলের নেতারা অভিযুক্ত দণ্ডপ্রাপ্ত তাদের জনগণ কেন ভোট দেবে ?

  • সিএনএন নিউজ ১৮-কে শেখ হাসিনা

জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ, নির্বাচন সম্পর্কে বিরোধী দল এবং কিছু বিদেশী সরকার ও এনজিওর অভিযোগ, ভবিষ্যতে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কসহ বেশকিছু বিষয় নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম সিএনএন নিউজ ১৮ এর সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে কথোপকথনে অংশগ্রহণ করেন গণমাধ্যমটি ডেপুটি নির্বাহী এডিটর জাকা জ্যাকব। রবিবার গণমাধ্যমটি তাদের ফেসবুক পেজে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে হওয়া এই কথোপকথনের ফুটেজটি প্রকাশ করে। আরটিভি অনলাইনের পাঠকদের জন্য কথোপকথনটি তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

শেখ হাসিনা : টানা তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের সুযোগ দেয়ার সর্বপ্রথম আমি আমার জনগণকে ধন্যবাদ দিতে চাই। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই দল এদেশের মানুষকে সংগঠিত করে এবং আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি। কাজেই মানুষের কাছে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। মানুষ এটা বুঝতে পেরেছে যে শুধু এই দল ক্ষমতায় এলে দেশের উন্নতি হয়।

প্রশ্ন : ভারতীয় উপমহাদেশে একটা কথা প্রচলিত আছে যে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি দেশের জনগণ ক্ষুব্ধ থাকে। কিন্তু আপনি টানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হলেন। আপনার এই জয়ের কারণ কী বলে মনে করেন আপনি?

শেখ হাসিনা : দেখুন, ক্ষমতাসীন দল যদি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে পারে, তবে তাদের ক্ষুব্ধ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আমরা আমাদের জনগণের ভালর জন্য কাজ করেছি বলেই, তারা আমাদের গ্রহণ করেছে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর এদেশের মানুষ সেনা অভ্যুত্থান, স্বৈরতন্ত্র, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, অর্থপাচার, সন্ত্রাসবাদ দেখেছে। একটা পর্যায়ে যখন তারা বুঝতে পারলো যে ক্ষমতায় এলে শুধু আওয়ামী লীগ দেশের জন্য কাজ করে, তখন তারা আমাদের প্রত্যাখ্যান করেনি। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো বাংলাদেশের জনগণ খুবই সচেতন। তার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন। যদি আমরা ভুল কিছু করতাম, তবে তারা অবশ্যই আমাদের ভোট দিত না।

প্রশ্ন : বিরোধী দল, কিছু আন্তর্জাতিক এনজিও এবং বিদেশী সরকার এই নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ বিরোধী দলের প্রার্থীরা প্রচারণা চালাতে পারেনি এবং নির্বাচনের আগে তাদের অনেক নেতাকর্মীকে হামলা ও গ্রেফতার করা হয়েছে। এসব সমালোচনার জবাবে আপনি কী বলবেন?

শেখ হাসিনা : গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমালোচনা একটা সাধারণ বিষয়। আপনার জানার কথা যে আমাদের দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে। যে কেউ তার মতপ্রকাশ ও আলোচনা করতে পারে। একইভাবে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোও সমালোচনা করতেই পারে। কিন্তু তারা বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করছে না। কেউ যদি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রæয়ারি এবং ২০০১ সালের নির্বাচনসহ অতীতের যেকোন নির্বাচনের সঙ্গে এটার তুলনা করে, তবে সহজেই বিষয়টি বুঝতে পারবে। তাই যারা এই নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করছে, তাদের অবশ্যই বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস জানতে হবে। আর এই নির্বাচনে বিরোধী দল তাদের কর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের সামনে কোন নেতা উপস্থাপন করতে পারেনি। যদি তারা ক্ষমতায় আসে, তবে সরকার প্রধান কে হবে, তা তারা স্পষ্ট করতে পারেনি। এছাড়া তাদের মনোনয়ন বাণিজ্য এবং জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ততাকে মেনে নেয়নি বাংলাদেশের জনগণ।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হয়েছে। এখন তাদের সক্রিয়তার বিষয়টি কোন পর্যায়ে?

শেখ হাসিনা : এখন জামায়াতের বেশিরভাগ নেতাকর্মী বিএনপিতে। নির্বাচন কমিশন তাদের নিবন্ধন বাতিল করেছে কিন্তু বিএনপি তাদের সহযোগী হিসেবে নিয়েছে এবং এই নির্বাচনে তাদের মনোনয়ন দিয়েছে। জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই যারা আমাদের সমালোচনা করছে, তাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে এই নির্বাচনে বিরোধী দল কী করেছে। তাছাড়া নির্বাচনের সময় কেন জানি না বিরোধী দল নিষ্ক্রিয় ছিল। হয়তো নেতৃত্বে সমস্যার কারণেই এমনটি হয়েছে। যে দলের নেতারা অভিযুক্ত ও দণ্ডপ্রাপ্ত, সেই দলকে জনগণ কেন ভোট দেবে?

প্রশ্ন : আপনার দলের গত মেয়াদে বাংলাদেশ থেকে বেশকিছু ভারত-বিরোধী কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। তাৎক্ষণিক বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নানা ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, ভবিষ্যতের পদক্ষেপগুলো কেমন হতে পারে?

শেখ হাসিনা : আমরা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। সুতরাং বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে দেশে বা দেশের বাইরে কোথায় আমরা সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে দেব না। তাই এসব সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রতিহত করতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া দরকার, তা আমরা নেব। আমি দেশের ও মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে চাই। তাই এদেশে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপই নেব।

প্রশ্ন : স¤প্রতি ভারতের আসামে নাগরিক নিবন্ধনের সময় অসংখ্য বাংলাদেশী পাওয়া গেছে, যারা অবৈধভাবে দশকের পর দশক ধরে সেখানে বাস করছে। এই বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

শেখ হাসিনা : দেখুন, সারাবিশ্বে অভিবাসন একটি সাধারণ বিষয়। অনেক ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের দেশগুলোসহ বিশ্বের অনেক দেশে বসবাস করছে। পাশাপাশি দেশের ক্ষেত্রে তো এটা আরও সাধারণ বিষয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো এখন আমাদের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে, চাকরির সুযোগ আছে, দরিদ্রের হার কমেছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা আছে, তবে বাংলাদেশের মানুষ কেন সেখানে যাবে এবং বসবাস করবে? তারপরও যখন প্রশ্নটি উঠেছে, তখন আমরা দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করতে পারি। আমি মনে করি তারা সেখানে কোন ধরনের ঝামেলায় জড়াচ্ছে না। তাছাড়া এর আগে ১৯৯৬ সালে যখন আমি সরকার গঠন করি, তখন আমি ভারতে শরণার্থী হিসেবে থাকা ৬৪ হাজার মানুষকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনেছিলাম।

প্রশ্ন : রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের কাছ থেকে কী ধরনের ভূমিকা আশা করছেন আপনি?

শেখ হাসিনা : বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা আমাদের জন্য বড় ধরনের বোঝা। আমি মনে করি দ্রæত সমস্যাটির সমাধান হওয়া উচিত। তাদেরও উচিত নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়া। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে ভারত। মিয়ানমারের সঙ্গে ভাল সম্পর্কও আছে ভারতের। সুতরাং এক্ষেত্রে তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করতে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই সমস্যাটি সমাধানের ক্ষেত্রে আমরা প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সহযোগিতা কামনা করি।

প্রশ্ন : আপনার গত দুই মেয়াদের তিস্তা চুক্তি আলোর মুখ দেখেনি। এবার এক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক কিছু হতে পারে বলে মনে করেন কী?

শেখ হাসিনা : এক্ষেত্রে আমরা আশাবাদী। এটি মূলত নির্ভর করছে ভারতের কেন্দ্রীয় ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ওপর। রাষ্ট্রীয়ভাবে নেয়া ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদক্ষেপ ও সমর্থনে আমি সন্তুষ্ট। সমস্যা থেকে গেছে দিদিমনির (পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) সঙ্গে। আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি। তিনিও রাজি হয়েছেন কিন্তু যে কারণেই হোক এটি বাস্তবায়িত হয়নি। আমি আশা করি ভবিষ্যতে এটার সমাধান হবে।

প্রশ্ন : ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড সম্পর্কে আপনার চিন্তাভাবনা কী?

শেখ হাসিনা : এখন বিশ্ব একটা গ্রামে পরিণত হয়েছে। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কানেকটিভিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও চীন ইতোমধ্যে কানেকটিভিটি সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে সই করেছে। তাছাড়া এর ফলে চারটি দেশের বাণিজ্যই বৃদ্ধি পাবে। এরপর ভারতের উদ্বেগের কোন কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। তবু যদি ভারতের কোন সমস্যা থাকে, তা নিয়ে দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক আলোচনা করতে পারে। আমি মনে করে যেকোন সমস্যার সমাধান আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব।

প্রশ্ন : পাকিস্তানের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সার্ক সম্মেলন আয়োজনের জন্য বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এই বিষয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?

শেখ হাসিনা : আমি ইমরান খানকে অভিনন্দন জানাই। একজন ক্রিকেটার হিসেবে আমি অবশ্যই তার প্রশংসা করব। তিনি খুব ভাল ক্রিকেট খেলতেন। ক্রিকেটের মাঠে তিনি ছক্কা হাঁকানোতে অভ্যস্ত ছিলেন। এখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি কী করেন, সেটাই দেখার অপেক্ষায় আছি। সার্ক সম্মেলনে দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যায় না। এক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কিছু সমস্যা আছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে কিছু সংবেদনশীল বিষয় আছে। আজ বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এখন আমাদের নিজস্ব এজেন্ডা ও প্রোগ্রাম আছে। কিন্তু আমি মনে করি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতার বিকল্প নেই। এখন পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করে ইমরান সার্ক সম্মেলন সফল করতে পারেন কিনা সেটাই দেখার বিষয়।

প্রশ্ন : নির্বাচনের আগে বেশকিছু বিদেশী সরকার ও আন্তর্জাতিক এনজিও বাংলাদেশে মানবাধিকার নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছে, সেই বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

শেখ হাসিনা : আমরা শান্তি, সংহতি, খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা নিশ্চিত করেছি। এখন জনগণ আমাদের সরকারের নেয়া উদ্যোগের সুবিধা ভোগ করছে। এখন কিছু মানুষ মানবাধিকারের কথা বলছে। কিন্তু যখন এদেশে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে, তখন তাদের ভূমিকা কী ছিল? আমরা এসব সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রতিহত করার মাধ্যমে ইতোমধ্যে জনগণের মানবাধিকার নিশ্চিত করেছি। মানবাধিকার বলতে শুধু সিকিউরিটি বা সেফটিকে বুঝি না আমি। আমি মনে করি এর সঙ্গে খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার নিরাপত্তাও যুক্ত। একজন মানুষ চায় ভালভাবে বাঁচতে। আমরা সেটা নিশ্চিত করতে পেরেছি। এর মানে আমরা মানবাধিকার নিশ্চিত করতে পেরেছি। তবু কিছু মানুষ ও এনজিও আমাদের সমালোচনা করছে। একজন রাজনীতিক হিসেবে আমি ভাল করেই জানি যে সমালোচনা থাকবেই। আমি ভাল করেই জানি যে যত বেশি কাজ করবে, সে তত বেশি সমালোচনার মুখে পড়বে।

প্রশ্ন : ভারতের আসন্ন লোকসভা নির্বাচন উপলক্ষে নরেন্দ্র মোদিকে কী বার্তা দেবেন?

শেখ হাসিনা : অবশ্যই আমি তার সফলতা কামনা করি। দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে যে সুন্দর সম্পর্ক আছে, তা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আমি আশা করি।

নির্বাচিত সংবাদ