২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ পিতা-মাতা কেন বৃদ্ধাশ্রমে?

  • নাজমুল হোসেন

পৃথিবীতে মা-বাবা এমন এক আশ্রয় স্থল যার তুলনা পৃথিবীর কোন বাটখারায় পরিমাপ করা যায় না। যায় না সেই পরম স্নেহের ওজন নেয়া কোন ওয়েট মেশিনে। সুতরাং এই মা এবং বাবারা তাদের শেষ বয়সে কেন বৃদ্ধাশ্রমে থাকবে প্রশ্নটি অচেতন প্রতিটি সন্তানের বিবেকের নিকট। মা-বাবা না থাকলে আমরা পৃথিবীর আলোই দেখতে পেতাম না। যে মা পরম স্নেহে শত অবর্ণনীয় কষ্ট, আঘাত, যন্ত্রণা সহ্য করে দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করল, আবার জন্মের পর থেকে লালন-পালন করা, পড়ালেখা শেখানো, সন্তানদের হাসিখুশি রাখতে কত ত্যাগ স্বীকার করল, সেই বাবা-মায়েদেরই বৃদ্ধ বয়সে থাকতে হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। মানবতার প্রতি এ এক চরম উপহাস। গত দুই দশক আগেও আমাদের দেশে বৃদ্ধাশ্রম তেমন একটা ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এর সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু কেন এই বৃদ্ধাশ্রম?

এই প্রশ্নের উত্তর বড়ই করুণ। ছোটবেলায় যে বাবা-মা ছিল সব সময় নিরাপদ আশ্রয়স্থল, যাদের ছাড়া এক মুহূর্ত থাকার কল্পনাই করা যেত না, আজ সেই বাবা-মাকেই ঝামেলা মনে হচ্ছে। নিজের কাছে রাখার প্রয়োজন বোধ করছি না। অথবা অবহেলা ও দুর্ব্যবহার করে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করা হচ্ছে যেন তারা নিজেরাই ভিন্ন কোন ঠাঁই খুঁজে নেন। মনে রাখতে হবে আমরা এক সময় শিশু ছিলাম। আর বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মা’রাও শিশু সুলভ আচরণ করে, বায়না ধরে। তারা আমাদের ছোটবেলায় এসব মানতে পারলেও আমরা মানতে পারছি না। বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলার, তাদের সঙ্গে সময় কাটানোর বা দেখভাল করার এতটুকু সময় আজ আমাদের নেই। শুধু তাই নয়, অনেকেই আবার উচ্চ শিক্ষিত হয়েও পিতা-মাতার ওপরে হাত তোলার মত ঘৃণ্য, নিন্দনীয় ও ইসলাম বহির্ভূত কাজও করে থাকেন। অনেক পরিবারের বউ হয়ত শ্বশুর-শাশুড়িকে নিজের বাবা-মায়ের মতো করে মন থেকে মেনে নিতে পারে না। আবার অনেকেই এমন স্ত্রীর পিতা-মাতার ওপরে আনীত বিভিন্ন অভিযোগে তাদের বিরোধী হয়ে যায়। ফলে তাদের স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে। তবে এটা কোন সমাধান নয়। এক্ষেত্রে প্রকৃত সমস্যা বা ভুল বোঝাবুঝির সমাধান গুরুত্ব সহকারে নিজেদেরই করে নিতে হবে। তাই একা নির্জনে থাকার চেয়ে বৃদ্ধাশ্রমে তাদের মতো অনেকের সঙ্গে কাটানোই ভাল। এমনি চিন্তাধারা থেকে বৃদ্ধাশ্রমের সূচনা। আর বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় এ জাতীয় নানা অজুহাতে অনেকেই তাদের মা-বাবার পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন। এক সময় যারা নামী-দামী বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, চাকরিজীবী ছিলেন তাদের অনেকেই আজ নিজ সন্তানদের অবহেলা, অযত্ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে বৃদ্ধাশ্রমের স্থায়ী বাসিন্দা হতে বাধ্য হচ্ছেন। সবকিছু থাকতেও সন্তানহারা এতিম হয়ে জীবনযাপন করছেন। এমন দুঃখী পিতা-মাতাদের বুকভরা কষ্ট থেকে সন্তানকে লেখা চিঠি প্রায়ই পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়, যা পড়ে চোখের পানি সংবরণ করা যায় না। আমরা যারা তাদের অবহেলা ও বোঝা মনে করে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসছি, তারা কি একবারও ভেবেছি আমাদেরও একদিন বৃদ্ধ হতে হবে। খুব বেশি দূরে নয়, আমাদেরও নিজ সন্তানের অনুরূপ আচরণের শিকার হয়ে শেষ বয়সে সৃষ্টিকর্তার অমোঘ নিয়মে এই বৃদ্ধাশ্রমেই বাকি জীবন কাটানোর প্রস্তুতি নিতে হবে। ইসলামেও রয়েছে এ নিয়ে কড়াকড়ি। পিতা-মাতাকে যারা কষ্ট দেবে, সম্মান করবে না তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে সীমাহীন যন্ত্রণা ও দুর্ভোগ। হাদিসে স্পষ্টই উল্লেখ রয়েছে, পিতা-মাতার পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত। সত্যিই বিবেকের কাছে আজ আমরা পরাজিত আর বড়ই অকৃতজ্ঞ। আজ আমরা চাকরি করে, ব্যবসা করে বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছি, সুনাম কুড়াচ্ছি। তারপর বিয়ে করে নতুন সংসার নিয়ে আলাদাভাবে থাকছি। আর অন্যদিকে বৃদ্ধ পিতা-মাতা কি খাচ্ছে, কি পড়ছে, কোন জটিল ও কঠিন রোগে ভুগছে- সে দিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই।

বৃদ্ধাশ্রমের ধারণাটা ক্রমেই আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। পশ্চিমা বিশ্বের সামাজিক আর সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় ওল্ড হোমগুলো অপরিহার্য হলেও আমাদের মাটির আঙ্গিনায় তা শুধু বেমানানই নয়, এর নৈতিকতার দিকটিও বিবেচনা করা দরকার। এক সময় সবকিছু বিসর্জন দিয়ে যে পিতা-মাতা সন্তানের ভবিষ্যত গড়েছিলেন, আজ তাদের অনেকেই বড় একা ও অপাংক্তেয়। পুঁজিবাদী ধনী দেশগুলোয় ব্যক্তি স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য হলো মূল চালিকাশক্তি। তাই ১৮ বছর পার হলেই নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই চালানো বা ভবিষ্যত গড়ার যেমন তাড়া থাকে, তেমনি অর্থ উপার্জনের পর পরিবারকে পাঠানোর প্রয়োজন নেই। আর পরিবারের কেউ তা আশাও করবে না। অন্যের গলগ্রহ না হয়ে ওল্ড হোমের আশ্রয়ই তাই সেখানে জীবনের স্বীকৃত সমাধান। এই ক্ষেত্রে আমরা কেনই বা তাদের অনুকরণ বা অনুসরণ করব? তা ছাড়া আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক গতিশীল জীবনচর্চার অনুশীলন শুরু হয়ে গেলেও পারিবারিক নির্ভরশীলতা মোটেও কমে যায়নি। এখানে যেমন বয়স ১৮ হলেই পিতা-মাতার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না অর্থাৎ তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিয়ে দেয়ার জন্য সব সঞ্চয় ব্যয় করেন, তেমনি শেষ বয়সে বাবা-মার ভার নেয়াটাও সন্তানের কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৃদ্ধাশ্রমের যে একেবারেই প্রয়োজন নেই, তা বলছি না। পিতা-মাতার আর্থিক খরচ চালানোর সামর্থ্য যদি একেবারেই না থাকে তখন হয়ত এটি বিকল্প ব্যবস্থা হতে পারে। নিঃসন্তান দম্পত্তির জন্যও এ ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে বৃদ্ধাশ্রম যেন কখনই না হয় দায়িত্ব এড়ানোর হাতিয়ার।

বৃদ্ধাশ্রম মানবিক, নৈতিক ও ধর্মীয় দিক দিয়ে রীতিমতো অগ্রহণযোগ্য। আমাদের দেশে এ পদ্ধতিটি স্বীকৃত কোন পদ্ধতি বা স্বাভাবিক কোন বিষয় হয়ে ওঠার আগেই এ নিয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। পাল্টাতে হবে মানসিক পরিবর্তন। তবেই সুখী ও সমৃদ্ধি পরিবার তৈরি করতে পারব। পারব শ্রদ্ধা-সম্মানের সুষম বণ্টন করতে। মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, সামাজিক অনুশাসন, ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রসার, নৈতিক মূল্যবোধ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। শেষ বয়সে প্রতিটি বৃদ্ধ মানুষের ঠাঁই যেন হয় পরিবারে এবং আরাম-আয়েশে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে। পাশাপাশি সরকারকেও আইনের মাধ্যমে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক : প্রকৌশলী ও লেখক

nazmulhussen@yahoo.com