২৪ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সততা রেখে চলবেন ॥ মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে মন্ত্রীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

সততা রেখে চলবেন ॥ মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে মন্ত্রীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ
  • বিত্তবৈভব অনেক করা যায় কিন্তু তাতে পচে যাবেন;###;আমি মন্ত্রিসভায় অনেক বড় পরিবর্তন করেছি, আপনারা প্রমাণ করবেন আমার আস্থা সঠিক ছিল

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যদের সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি সব মন্ত্রীকে নির্বাচনী এজেন্ডা বাস্তবায়নে শুরু থেকে কাজ করারও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠনের পর সোমবার মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে বসে প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা দেন। বৈঠকের শুরুতে আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সকাল ১০টায় এ বৈঠক শুরু হয়। প্রথম দিনের কার্যসূচীতে আলোচনার জন্য ছয়টি বিষয় রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর গত ৭ জানুয়ারি চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ হাসিনা। ২৪ মন্ত্রী, ১৯ প্রতিমন্ত্রী এবং তিন উপমন্ত্রীকে নিয়ে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা সাজিয়েছেন তিনি।

বৈঠকের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের প্রতি জনগণের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। সেই প্রত্যাশা পূরণ করা আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর যে আকাক্সক্ষা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল, আমাদেরও সেই আকাক্সক্ষা। সেই আকাক্সক্ষা পূরণ করব। একটি ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলব। মন্ত্রিসভার সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে আপনারা নিশ্চয়ই পড়েছেন, আমার দাদা তাকে যে কথাটা বলেছিলেন; যে কাজই কর না কেন, সিনসিয়ারিটি অব পারপাস এ্যান্ড অনেস্টি অব পারপাস।

আমি মনে করি এই দুটি কথা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মন্ত্রিপরিষদ এই কথাটি মনে রেখে যে কাজই করবেন, নিষ্ঠার সঙ্গে ও সততার সঙ্গে কাজ করবেন। প্রতিটি কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে করতে হবে- এ কথাটি মনে রাখতে হবে। জনগণের প্রতি আমাদের যে দায়িত্ব, কর্তব্য রয়েছে- সেটা পালন করতেই আমরা এখানে এসেছি। একই সঙ্গে নির্বাচনী অঙ্গীকারের কথা মাথায় রেখে কাজ করে যেতে হবে। যার যে মন্ত্রণালয় আছে, সেখানে যে সব নির্বাচনী এজেন্ডা রয়েছে, তা বাস্তবায়নে শুরু থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, সততার শক্তি অপরিসীম, সেটা আমরা বারবার প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের দেশ এগিয়ে যাবে এবং যে অগ্রযাত্রা আমরা শুরু করেছি সেটা আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

বৈঠকের পর অনির্ধারিত এক আলোচনায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি আগের মন্ত্রিসভার অনেক বড় পরিবর্তন এনে নতুন মন্ত্রিসভা করেছি। এর আগে কোন মন্ত্রিসভায় এত বড় পরিবর্তন আসেনি, কেউ এত বড় পরিবর্তন করেনি। আমি নতুনদের মন্ত্রিসভায় এনেছি। আপনাদের ওপর যে আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে মন্ত্রিসভায় এনেছি, আশা করি, আপনারা সততা ও নিষ্ঠা নিয়ে প্রমাণ করবেন যে, আপনাদের ওপর আমার আস্থা ও বিশ্বাস সঠিক ছিল। যদি সেটা না করতে পারেন তবে আমার উদ্দেশ্য সফল হবে না। অনেকে নানা কথা বলবে, শুনতে হবে, অনভিজ্ঞদের নিয়ে আসার কারণে এটা হয়েছে। এ কারণে আপনারা সততা রেখে চলবেন। বিত্ত, বৈভব অনেক করতে পারবেন। কিন্তু সেটা করতে গেলে পচে যাবেন।

সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের খসড়া অনুমোদন ॥ একাদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি যে ভাষণ দেবেন, তার খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সোমবার তার কার্যালয়ে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে ভাষণের খসড়া অনুমোদন করা হয়। পরে সচিবালয়ের এক ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, আইনগত বাধ্যবাধকতা আছে বছরের শুরুতে যে সংসদ বসে সেটাতে এবং সরকার গঠনের পর প্রথম বৈঠকে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন। সেটা মন্ত্রিসভা ঠিক করে দেয় এবং তিনি চূড়ান্ত অনুমোদন দিলে সেটা সংসদে পাঠ করা হয়।

২০১৯ সালের জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির ভাষণে যেসব বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে তার মধ্যে থাকছেÑ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্র; সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের গৃহীত কার্যক্রম; রূপকল্প-২০২১ এবং রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নে বিভিন্ন খাতে গৃহীত কর্মসূচীর রূপরেখা; দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপ ও সাফল্য; কৃষির উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য; দেশী ও বিদেশী কর্মসংস্থান; সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী; স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও গ্রামীণ অর্থনীতি; শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা; যোগাযোগ ব্যবস্থা; ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে আইসিটি প্রযুক্তির উন্নয়নকল্পে বিভিন্ন কর্মসূচীর বাস্তবায়ন; তথ্য ও গণমাধ্যমের উন্নয়ন; আইনশৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা; আইন প্রণয়ন ও বিচারিক কার্যক্রম; জনপ্রশাসনের উন্নয়নে গৃহীত কার্যক্রম; বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্য; মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকাশ ও মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে গৃহীত কার্যক্রম; প্রশাসনিক নীতি, কৌশল, উন্নয়ন দর্শন এবং অগ্রযাত্রার দিকনির্দেশনা। শফিউল জানান, মূল ভাষণে ৭৫ হাজার শব্দ থাকছে। সংক্ষিপ্ত ভাষণে প্রায় ছয় হাজার শব্দ রাখা হয়েছে। বড় ভাষণটি টেবিলে দেয়া থাকবে। মূল ভাষণের একটি ইংরেজী সংস্করণও তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবন্ধী কোটা বহাল আছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ॥ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারী চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা তুলে দিলেও আইনানুযায়ী প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা বহাল রয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম। সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান তিনি। প্রতিবন্ধীবিষয়ক জাতীয় কর্ম-পরিকল্পনার খসড়া অনুমোদনের বিষয়ে কথা বলার একপর্যায়ে এক সাংবাদিক জানতে চান, প্রতিবন্ধীদের জন্য করা আইনে কোটা রাখার বিধান রয়েছে। কিন্তু আপনার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি সব ধরনের কোটা বাতিলের সুপারিশ করেছে। কোটা বাতিল হওয়ায় বঞ্চিত হচ্ছে বলে প্রতিবন্ধীরা আন্দোলন করছে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এটা নিয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনা হয়নি। তবে আইনে যে প্রভিশন আছে ওটা কিন্তু কার্টেল (বাদ দেয়া) হয়নি। এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অর্ডার (প্রশাসনিক আদেশ) দিয়ে আইন কখনও সুপারসিড হয় না। (প্রতিবন্ধীদের কোটা আইনানুযায়ী) যা ছিল, তাই আছে। প্রতিবন্ধীদের জন্য বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন কোটা ছিল বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। কোটা বাতিলের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কোটা পর্যালোচনা কমিটি বেতন কাঠামোর নবম থেকে ১৩তম গ্রেড (আগের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকরি) পর্যন্ত সরকারী চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের কোটা বাতিলের সুপারিশ করে। পরে গত বছরের ৩ অক্টোবর কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

প্রতিবন্ধীবিষয়ক জাতীয় কর্ম পরিকল্পনা অনুমোদন ॥ ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’ এবং ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা বিধিমালা, ২০১৫’ এর আলোকে প্রতিবন্ধীবিষয়ক জাতীয় কর্ম-পরিকল্পনার খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আইন বা বিধিমালার আলোকে সেই বিষয়ে গাইডলাইন দেয়া হয়েছে। প্রবেশগম্যতা বা এ্যাক্সেসিবিলিটি অর্থাৎ প্রতিবন্ধীরা চলাফেলার ক্ষেত্রে কোন জায়গায় কীভাবে যাবেন সেটা নিয়ে অনেকগুলো বিষয় রাখা আছে।

তিনি বলেন, প্রবেশগম্যতা যেমন- ভৌত অবকাঠামো, পরিবহন ও যোগাযোগসহ জনসাধারণের প্রাপ্য সব সুবিধা ও সেবাসমূহে অন্যদের মতো সমসুযোগ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্যবহার উপযোগী নিশ্চিত করা। যেমন- বাসে আজকাল প্রতিবন্ধীরা উঠতে গেলে একজন টেনে তুলতে হবে বা ল্যাডার লাগাতে হবে। অর্থাৎ গণপরিবহন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ব্যবহার উপযোগী করার নির্দেশনা আছে, এটা করতে হবে।

শফিউল আলম বলেন, ভবনগুলোতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড-২০০৬ এর বিধানগুলো কার্যকর করা। যেমন- সব গণস্থাপনা ভবন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, আদালত, পুলিশ স্টেশন, আইনী সহায়তা কেন্দ্র, রেল স্টেশন, বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল, বিমানবন্দর, নৌ ও স্থলবন্দর, দুর্যোগকালীন আশ্রয় কেন্দ্র, সাইক্লোন শেল্টার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানস্থল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, উড়াল সেতু, পরিসেবার স্থান, বিনোদন ও খেলাধুলার স্থানসহ সব জায়গায় এটা (বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন) করা। বিমানে আই-চেয়ার, কেবিন চেয়ারের ব্যবস্থা রাখা, দুর্যোগকালীন আশ্রয় কেন্দ্র ও সাইক্লোন শেল্টার শিশু ও দুগ্ধ কন্যার প্রবেশগম্য টয়লেট রাখার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হবে।

সৈয়দ আশরাফের স্মৃতিচারণে আবেগাপুøত প্রধানমন্ত্রী ॥ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সাবেক জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের স্মৃতিচারণে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকের প্রথম এজেন্ডা হিসেবে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আজ আমাদের মাঝে নেই, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আশরাফকে ছোটবেলা থেকেই আমি চিনি, কামালের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। সে ছাত্রলীগ করত। আমাদের মধ্যে একটা পারিবারিক সম্পর্কের মতোই ছিল। এ সময় প্রধানমন্ত্রী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। মন্ত্রিপরিষদের একাধিক সদস্য এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।