১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সত্তার সঙ্কটে উদ্বাস্তুরা

সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইউরোপমুখী উদ্বাস্তুর ঢল নেমেছিল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লাখ লাখ উদ্বাস্তু ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে তুরস্ক হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল। শুধু সিরিয়া নয়, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকেও উদ্বাস্তুর ঢল নামে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে শুধু জার্মানিই প্রায় ১০ লাখ উদ্বাস্তু গ্রহণ করে।

ভিন্ন দেশে ভিন্ন পরিবেশে এই উদ্বাস্তুদের নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়। ধীরে ধীরে তারা সেগুলোর সঙ্গে নিজেদের ধাতস্থ করে নেয়। প্রতিকূলতার একটি হচ্ছে ভিন্ন সমাজ, ভিন্ন সংস্কৃতি ও রীতিনীতির সঙ্গে নিজেদের আত্মস্থ হওয়া। সেটা যে সবাই পেরেছে তা নয়। যারা পারেনি তারা মানসিক ও অন্যান্য সঙ্কটে পড়েছে।

জার্মান চ্যান্সেলর এ্যাঙ্গেলা মার্কেল ১০ লাখ উদ্বাস্তু গ্রহণ করার সময় তার সেই সিদ্ধান্তের একটা প্রধান দিক ছিল নবাগতদের জার্মান সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে হবে। অর্থাৎ তাদের জার্মান ভাষা শিখতে ও শেষ পর্যন্ত কাজ বা চাকরি খুঁজে নিতে হবে। মার্কেলের সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ছিল জার্মান ভোটারদের এই আশঙ্কা দূর করার চেষ্টা করা যে উদ্বাস্তুরা অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

জার্মানিতে আগত উদ্বাস্তুদের প্রায় অর্ধৈক হচ্ছে সিরীয়। অনেক সিরীয় নারী ও পুরুষের কাছে এই একীভূত বা একাত্মতা কথাটার অর্থ নিজেদের সাংস্কৃতিক সত্তার সুগভীর বোধকে বিসর্জন দিয়ে বিজাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে আত্মস্থ হয়ে পড়া। জার্মান হওয়ার অর্থ সিরীয় মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলা। ২০১৬ সালে আলেপ্পো থেকে সপরিবারে এসেছে রাশা (৩২)। স্বামী তাকে হেডস্কার্ফ খুলে ফেলতে উৎসাহিত করলেও সে রাজি হয় না। বলে সে এর জন্য এখনও সে মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। হেডস্কার্ফ বাদ দিয়ে চলা আর উলঙ্গ হয়ে বেড়ানো একই বলে মনে হয় তার কাছে। রাশার স্বামী ঘাশাম বলেন, সিরিয়ার পরিস্থিতি ভিন্ন। সেখানে যৌথ পরিবার এক নিরাপত্তার জাল যোগায়। কিন্তু জার্মানিতে তো আর যৌথ পরিবারের নিরাপত্তা নেই। সে চায় তার স্ত্রী জার্মান ভাষা শিখে নিয়ে চাকরি জুটিয়ে পরিবারের আয় বাড়াক। কিন্তু পাঁচ সন্তানের জননী রাশা বাড়ির বাইরের কাজ সম্পর্কে কিছুই জানে না। সে বলে, ‘আমরা ইতোমধ্যে বাড়িঘর সব হারিয়ে ফেলেছি। একমাত্র আমাদের মূল্যবোধই আমাদেরকে আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে বেঁধে রেখেছে।’

শুধু উদ্বাস্তুদেরই নয়, উপরন্তু প্রথম প্রজন্মের যে কোন অভিবাসীর কাছেও চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে এই যে মূল্যবোধগুলো দ্বিগুণ প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে। সিরিয়ার অনলাইন নেটওয়ার্কগুলোতে সে সব উদ্বাস্তু বাবা-মাকে নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হচ্ছে যারা তাদের কিশোরী মেয়েদের ছেলেদের সঙ্গে সময় কাটানোর অনুমতি দেয়। সমালোচিত হচ্ছে সে তালাকপ্রাপ্তা ও বিধবা রমণীরা যারা পুরুষদের বিশেষত জার্মান পুরুষদের সঙ্গে ডেটিং করার। সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা করে। টারটুস এলাকার স্বামীহীনা এক সন্তানের জননী ৩৫ বছর বয়স্কা ওউলা শাউদ বলেন, ‘যেদিন লোকেরা দেখতে পেল একজন জার্মানের সঙ্গে আমার দেখা সাক্ষাত হচ্ছে সেদিন আমি আমার সমস্ত সিরীয় বন্ধুদের হারিয়ে ফেললাম।’ শাউদ সঙ্গ খুঁজে পেয়েছেন তবে সে সঙ্গে তার সমাজের ও তাঁর আবাসভূমির সঙ্গে তার চূড়ান্ত বন্ধনও হারিয়ে ফেলেছেন। সেই জন্য তাঁর নিজেকে এখন বস্তু একঘরে ও বিচ্ছিন্ন বলে মনে হয়।

বুনেস্যান নামে এক মনস্তত্ত্ব¡বিদ বলেন, এই উভয় সঙ্কট অহরহই তার কাজকর্মের ক্ষেত্রে হাজির হয়। উদ্বাস্তুদের আবেগগত স্থিতিশীলতার জন্য সামাজিক সহায়তা নেটওয়ার্ক একান্তই প্রয়োজন। তবে পীড়নমূলক সম্পর্ক ছিন্ন করা, স্বাধীন হিসেবে দাবি করা এবং ডেট করার মতো ব্যক্তিগত প্রয়োজনগুলোর যখন সাংস্কৃতিক রীতিনীতির সঙ্গে সংঘাত বাঁধে তখনই দেখা দেয় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জই দেখা দিয়েছিল আমার জীবনে। ২৩ বছরের এই সিরীয় নারী বাস করে পশ্চিম জার্মানির জানটেন শহরে। একদিন বিকেলে ভাষা শিক্ষার ক্লাস থেকে বাসায় ফিরে দেখে ঘর ল-ভ-। তার স্বামী মোহম্মদ ও ২ বছরের ছেলে শাউদ নেই। তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখে তাদের পাসপোর্টও নেই। মোহম্মদকে ফোন করে কোন সংযোগ পায় না আয়া। কয়েক ঘণ্টা পর সিরিয়া থেকে ফোন আসে তার দেবরের। জানায়, মোহম্মদ তার ছেলেকে নিয়ে সিরিয়ায় ফিরে আসছে। আয়া যদি সন্তানের সঙ্গে থাকতে চায় তবে তাকেও জার্মানির জীবন ছেড়ে সিরিয়ায় ফিরতে হবে। আয়া পুলিশকে জানায়। পুলিশ খোঁজখবর নিয়ে বলে, সন্তানসহ তার স্বামী প্লেনে করে গ্রীসে চলে গেছেন। কয়েক দিন পরে সিরিয়া থেকে তার স্বামী মোবাইল টেক্সট মেসেজে আয়াকে বলে, ‘সন্তানকে চাইলে আমাদের কাছে ফিরে এসো। তুমি জার্মান হয়ে যাচ্ছ। নিজের ধর্ম, নিজের সংস্কৃতি ও নিজের জনগণের কাছে ফিরে এসো।’

এখানেই হলো সমস্যা। অনেক উদ্বাস্তু বিদেশের মাটিতে নতুন পরিবেশে ধাতব হতে পারে। অনেকে পারে না। আয়া পেরেছে। তার স্বামী মোহম্মদ পারেনি। সিরিয়ার স্থাপত্যকলার ছাত্রী আয়া জামান ভাষা দ্রুত আয়ত্ত করতে পেরেছে। স্বামী সেভাবে পারেনি। না পারার কারণে স্ত্রীর প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়েছে। আয়া যত বেশি বাইরের কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, জার্মানদের সঙ্গে মেলামেশা করেছে তার স্বামী তত বেশি নিকটবর্তী মসজিদে কেন্দ্রীভূত সিরীয় সনাতনী সমাজের কাছে ফিরে গেছে। সেখানে সে খুঁজে পেরেছে তারই মতো দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন পুরুষদের যারা সিরীয় ঐতিহ্যকে কিছুতেই বিজাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি। তই একদিন তার স্বামী সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে গেল স্বদেশে সেখান থেকে তারা উদ্বাস্তু হয়ে জার্মানিতে ঠাঁই নিয়েছিল।

চলমান ডেস্ক

সূত্র : টাইম

নির্বাচিত সংবাদ