১৯ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গণঅভ্যুত্থানের অর্ধশতক

‘রক্ত যখন দিলাম ঢেলে, রক্ত আরও দেবোই, বীর জনতার ন্যায্য দাবি আদায় করে নেবোই।’ রক্ত যেমন ঢেলেছিল, তেমনি দাবিও আদায় করে নিয়েছিল বাংলার তরুণ ছাত্রসমাজ। প্রতিবাদ, প্রতিরোধের অগ্নিমশাল জ্বেলে ওরা রাজপথ জনপদ কাঁপিয়ে তুলেছিল, ক্ষমতাসীনদের ‘তখতে তাউস’ তথা সিংহাসন উপড়ে ফেলার জন্য স্লোগানে স্লোগানে কম্পিত করেছিল আকাশ-বাতাস। সারা বাংলার মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল ছাত্র-যুবাদের আহ্বানে।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার শুরু হয় ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন। দেশবাসী জানত আইউবশাহীরা শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝোলাবে। কারণ তারা উপলব্ধি করেছিল, সকলকে বশে আনা যায়, কিন্তু শেখ মুজিবকে নয়। আইউবও চেয়েছিল এই কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিতে। ছয় দফার প্রতি বাঙালীর ক্রমশ অকুণ্ঠ সমর্থন জান্তাদের ভীত করে তুলছিল। ছয় দফার আলোকে ছাত্রসমাজ ঘোষণা করে ১১ দফা। ডাকসুসহ চারটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে ঐতিহাসিক ১১ দফার ভিত্তিতে ১৯৬৯-এর চার জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। পরিষদের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র ছিলেন ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমদ। ১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলা ভবনের বটতলায় প্রথম সমাবেশ হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ১৪৪ ধারা জারি করে পাকিস্তানী শাসকরা। সমাবেশ শেষে মিছিল করে রাজপথে নেমে আসে ছাত্ররা। মুহূর্তে শাসকের পেটোয়া বাহিনী ক্ষিপ্রগতিতে ছাত্রদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং বেপরোয়া লাঠিচার্জ শুরু করে। ছাত্ররাও প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শুরু হয় কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ আর ফায়ারিং। প্রতিবাদে শিক্ষাঙ্গনে ধর্মঘট ডাকা হয়। ১৮ জানুয়ারি পুলিশী নির্যাতনের প্রতিবাদে বটতলায় জমায়েত শেষে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্ররা রাজপথে নেমে আসে। সহ¯্রকণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই, আইউব খানের পতন চাই।’ আবারও লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ। ১৯ জানুয়ারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল বের হয়। পুলিশ গুলি চালায়। আহত হয় বুয়েটের ছাত্রলীগ কর্মী আসাদুল হক; যিনি একাত্তরে শহীদ হন। পুলিশের বর্বরতা ও গুলি বর্ষণের প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি বটতলায় সমাবেশ ডাকা হয়। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের ইতিহাসে দিনটি মাইফলক। ১১ দফার দাবিতে ঢাকাসহ সারাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। ছাত্র, শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষ বটতলার সমাবেশে অংশগ্রহণ শেষে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল বের করে। লাখো মানুষের ঢল নামে। ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমদ ঘোষণা করেন শেখ মুজিবসহ সব রাজবন্দীকে যতদিন মুক্ত করতে না পারব ততদিন আন্দোলন চলবে। স্বৈরশাসক আইউব-মোনায়েম শাহীর পতন না ঘটিয়ে বাংলার ছাত্র সমাজ ঘরে ফিরবে না। মুহূর্তে ফুঁসে উঠল মিছিল। মেডিক্যাল কলেজের সামনে যখন মিছিল তখনই এক উর্দুভাষী পুলিশ ইন্সপেক্টর ছাত্রনেতাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামানের বুকে বিদ্ধ হয় গুলি। সঙ্গে সঙ্গে ঢলে পড়েন। হাসপাতালে নেয়ার পথেই তোফায়েল আহমদের হাতে ওপর তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তার গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত শার্টটি সংগ্রামের পতাকা করে আকাশে উড়িয়ে আসাদের রক্ত ছুঁয়ে শপথ গ্রহণ করে ছাত্র সমাজ। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আর ঘরে ফেরেনি।

২৪ জানুয়ারি হরতাল চলাকালে এক মন্ত্রীর বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। যত্রতত্র গুলি চলে। শহীদদের তালিকায় যুক্ত হতে থাকে মতিউর, মকবুল, আনোয়ার, রুস্তম, মিলন, আলমগীরসহ অনেক নাম। রাজপথে বিক্ষুব্ধ মানুষ। মাত্র সাত দিনের আন্দোলনে ২৪ জানুয়ারি প্রবল গণআন্দোলন ও গণবিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে ঢাকায় মানুষ রাজপথে নেমে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করে। মাত্র সাত দিনের আন্দোলনে জাতি এক কাতারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণঅভ্যুত্থান ঘটায়। যার ধারাবাহিকতায় একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ। গণঅভ্যুত্থানের পঞ্চাশ বর্ষ আজ। দেশপ্রেমিক বাঙালীর জীবনের এক মাইলফলক। যাদের রক্তে মুক্ত হলো স্বদেশ জাতি চিরদিন তাদের স্মরণ করবে।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া