২৬ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘ইন্টারনেট অব থিঙ্কস’ আমাদের প্রস্তুতি

  • রেজা সেলিম

এই মুহূর্তে আমি, আপনি যা যা করছি বা যা যা ভাবছি যদি তা দৃশ্যমান করে নিতে পারি, তাহলে তা এক একটি তথ্য- যার ডিজিটাল রূপান্তর খুব বেশি জটিল কিছু নয়। দৃশ্যমান মানে এই নয় যে, তা এখনি খালি চোখে দেখতেই হবে। দৃশ্যমান বলতে আমরা বুঝাতে চাইছি যা উপস্থিত ও ব্যবহারযোগ্য। এই তথ্যগুলো ডিজিটাল প্রযুক্তির জগতে ডেটা নামে পরিচিত। বিজ্ঞানে ও পরিসংখ্যানে যার নানারকম সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা আছে। ইন্টারনেট এই উপস্থিত ডেটাগুলো সমন্বয় করে ও সম্ভাব্য ডেটা তৈরি করতে মানব বুদ্ধির সাহায্য নিয়ে প্রকারান্তরে বিজ্ঞানকেই সাহায্য করে। এখন প্রশ্ন হলো, মানব কল্যাণে বিজ্ঞান যে ভূমিকা নেয় সেখানে ইন্টারনেট নিয়ে কাজগুলোয় আমরা কতটা কল্যাণের সুযোগ বের করে নিতে পারি!

যখন ইন্টারনেট মানুষের ব্যবহারের আয়ত্তে চলে এলো তখন সবাই ভাবল আমাদের দিনের সব কাজ একে দিয়ে কেমন করে করিয়ে নেয়া যায়। প্রথমে জাপানীরা দাবি করে বসল, ইন্টারনেট হতে হবে সর্বব্যাপী, যার নাম তারা দিল ইউবিকুইতাস (হেনজাই সুরো) আর সে লক্ষ্যে জাপান তথ্যপ্রযুক্তির সব সুবিধা টেনে নিজের কাজে ও ঘরে সর্বব্যাপী ব্যবহার শুরু করল। অনেকেই হয়ত জানেন, অপটিক্যাল ফাইবার টেনে তার ত্রিমুখী উপযোগিতা কাজে (একই তারে টেলিফোন, স্যাটেলাইট টিভি ও ইন্টারনেট ব্যবহারে) জাপানীরা ছিল অগ্রগামী। এমনকি আর এফ (রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি) চিপস ব্যবহার করে কোন সঙ্কুচিত তথ্যভা-ার তৈরিতে জাপানীরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।

জাপানের পথ ধরে দেশে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের সর্বময় প্রচেষ্টার অন্যতম উদাহরণ হলো একে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বা যুদ্ধকাজ থেকে ঘুরিয়ে এনে মানুষের কাজে কেমন করে ব্যবহার করা যায়। আর সে কাজগুলো হতে হবে কল্যাণমুখী বা যাতে সকলের উপকার হয়। দুনিয়ায় নানারকম কল্যাণের কাজ হয়, কিন্তু বিজ্ঞানকে যথাযথ পথ চিনিয়ে না দিলে সে আঁকাবাঁকা পথে মানুষকে নিয়ে যায় বা কেউ কেউ মনে করেন, মানুষ তার বুদ্ধি খরচ করে বিজ্ঞানকে আঁকাবাঁকা পথে টেনে নেয়। দূর নিয়ন্ত্রিত ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্রগুলো বিজ্ঞান নিশ্চয়ই তার মায়ের পেট থেকে নিয়ে আসেনি, মানুষ তার বুদ্ধি খরচ করে এসব তৈরি করেছে ও নেশায় পেয়ে সেগুলো আধিপত্য বিস্তারে ব্যবহার করছে। ফলে বিজ্ঞানের এই আবিষ্কার ‘ইন্টারনেট’ যা প্রথম সরাসরি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ল। দুনিয়ার প্রায় সব দেশেই এর ব্যবহারের কুফলগুলো নিয়ে মানুষ গোড়া থেকে নড়েচড়ে বসল, এই দিয়ে যেন যা খুশি তা না করা হয়।

অনেকেই হয়ত জানেন যে, ইন্টারনেট বা আন্তঃসংযোগ সৃষ্টির এই কাজটি প্রথম করেছিল ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিভাগের একটি গবেষণা সংস্থা এ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি যা ‘আরপা’ নামে পরিচিত আর তাদের এই আন্তঃযোগাযোগের পদ্ধতির নাম দেয়া হয়েছিল ‘আরপানেট’। ফলে সামরিক শক্তির অধিকারে এই নেটওয়ার্ক ক্ষমতা বেশি থাকবে এমন একটি ধারণা অনেকের মধ্যে ছিল। নব্বইয়ের দশকের প্রথমভাগে যখন ইন্টারনেট বাণিজ্যিক কাজে উন্মুক্ত করা হয় তখন হুমড়ি খেয়ে পড়ে আইএসপি ব্যবসায়ীরা যাতে নানা প্রান্তে তারা এই সংযোগ পৌঁছে দিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে। শুরুতে প্রথম প্রান্ত থেকে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ইন্টারনেট ছিল ব্যয়বহুল ও সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভিসেট স্থাপন করে মহাকাশে সংযোগ ঘটিয়ে কেমন করে হাওয়াইয়ের একটি প্রান্ত থেকে ইন্টারনেট বাংলাদেশে এসে পৌঁছাত তা মাত্র সেদিনের কথা হলেও অনেকের কাছে মনে হবে বিস্ময়কর। সে সংযোগ বাসাবাড়িতে পেতে দরকার হতো টেলিফোনের। ডায়াল করে দুই প্রান্তের মডেমের এই সংযোগ পেয়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের যে কৌশল শুরুতে ছিল এখনকার ব্রডব্যান্ড বা ওয়াই-ফাই প্রজন্মের কাছে তা শুধু অচেনাই নয়, অবিশ্বাস্যও বটে।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট সকলের জন্যে উন্মুক্ত হয় ১৯৯৬ সালে। নানা ধাপ পেরিয়ে ইন্টারনেট সেবা এখন প্রায় সকলের নাগালের মধ্যে। যদি দাম ও সেবার মান উপযুক্ত হয় তাহলে বাংলাদেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার করে একে সর্বব্যাপী কাজের অনুকূলে রাখা মোটেই কঠিন নয়। এই দুই যুগে ধাপে ধাপে নানা ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবহার করে আমাদের দেশে যে ডিজিটাল প্রজন্ম গড়ে উঠেছে তাদের হাতে এখন দেশের ভবিষ্যত ভার। ১৯৯০ সালে যে শিশুর জন্ম হয় এসেছে এখন তার বয়স ২৯ যা কর্মক্ষম উৎপাদক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। বেড়ে উঠতে উঠতে সে জেনে গেছে সব রকমের আন্তঃসংযোগ এখন বিজ্ঞানের এক সৃষ্টি ছাড়া তারবিহীন জগতের হাতে। আর তার সর্বময় ক্ষমতা মানুষ জানে, সেও জানে। বিজ্ঞানীরা যা বুঝে তা এখন মানুষের বুঝার নাগালের কাছাকাছি। কারণ, সবাই এখন জ্ঞান সমাজের অধিবাসী। চর্চায় ও মননে মানুষ বুঝতে পারে সক্ষমের অনুকূলে সে তার শক্তির পরীক্ষা দিয়ে তাতে উত্তীর্ণ হয়েই আছে।

ফলে আমাদের এখন জানা ও বুঝা দরকার বিজ্ঞানের এই প্রান্তের আন্তঃসংযোগের জ্ঞান আমরা কেমন করে সর্বব্যাপী কল্যাণের কাজে ব্যবহার করতে পারি। অতি সম্প্রতি নেটওয়ার্ক জগতে চালু হয়েছে এক নতুন চিন্তার- সব কাজ ও কাজের মাধ্যমকে কেমন করে একটি ডিভাইসের আওতায় এনে তা ব্যবহার করা যায় যাতে মানুষের নানামুখী কাজের জটিলতা এক লহমায় নিরসন হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় আমরা একে বলছি ‘ইন্টারনেট অব থিঙ্কস’ যা ‘আইওটি’ নামে পরিচিত। এই সমন্বিত ব্যবস্থায় ডেটা বা তথ্যের যে কোন নির্দেশনা যে কোন ডিভাইসে যেভাবে চাইবে সেভাবেই উপস্থাপিত হবে। বাড়ির দরজা খুলে দেয়া, গ্যারেজের চাবি সংরক্ষণ, টিভি চালু-বন্ধ, ঘরের আলো চালু বা নিভিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে অফিস, বাসাবাড়ির সব কাজে সে সহায়তা দিতে পারে শুধু সেন্সর দিয়েই। এ রকম সহজ কাজের পদ্ধতি আমাদের দেশের জন্য কি নির্দেশ করে?

নির্দেশ করে কেমন করে আমরা কায়িক শ্রমের কাজ থেকে বিযুক্ত হয়ে যাব আর কাজগুলো তখন করে দেবে আমাদের বুদ্ধি দিয়ে গড়া যন্ত্রপাতি বা একটিমাত্র সেন্সর যা দখল করে নেবে আমার চলতি কাজে উপার্জনের সুযোগ। ফলে শ্রমের বাজার থেকে আমাকে যে বুদ্ধির বাজারে ঠাঁই নিতে হবে তার জন্য আমি কতখানি প্রস্তুত সে কথা আমরা ভাবছি কি-না ‘ইন্টারনেট অব থিঙ্কস’ কিন্তু আমাকে সে কথাই ভাবাচ্ছে। আমরা কি প্রস্তুতি নিচ্ছি?

তথ্যপ্র্রযুক্তি দিয়ে আমাদের কর্মজীবনের শুরুতে অনেকদিন যাবত আমরা ‘ই-রেডিনেস’ নিয়ে বিস্তর কথা বলেছি, দেন-দরবার করেছি। আমরা স্পষ্ট করেই উল্লেখ করেছি যদি এই রেডিনেস আমাদের না থাকে আমরা পিছিয়ে যাব। বুঝতে না পারার কারণে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই আমরা পিছিয়ে থেকেছি (যেমন সময়মতো ইন্টারনেট সংযোগ নিতে পারা, লেখাপড়ার জন্য কেমন করে স্কুলে এর কারিকুলাম করব তা বুঝতে না পারা) এমনকি অনেক ঠকবাজির পাল্লায় পরে আর হুজুকে মেতে (যেমন রাতারাতি ডেটা এন্ট্রি করে আমরা বড়লোক হবো বলে অনেক টাকা নিয়ে আমাদের কম্পিউটার শেখানো হয়েছে বা মেডিক্যাল ট্রান্সক্রিপশনের কাজ উপচে পড়ছে বা কল সেন্টার করতে হবে) আমরা আমাদের সময় ও সুযোগ নষ্ট করেছি। এর আর একটি বড় কারণ, আমাদের শাসকযন্ত্রে যারা নীতির ভূমিকা নেন তাদের অনেকেই দুনিয়ার অনেক খবর জানেন না বা জানতে পারেন না কিন্তু কাজটা তাদের করতে হয় ফলে ভুল শুরু হয় ওখান থেকেই। নানা উপায়ে আমরা তাদের বলেছি আপনারা শুধু পরিবেশটা ঠিক রাখুন, আর সব কাজ আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরাই করতে পারে।

এখন যে বুদ্ধির জগতে আমরা দিনের সব কাজ নিয়ে প্রবেশ করছি সেখানে সর্বব্যাপী কাজের পরিবেশ থাকা দরকার। আর কিছুদিনের মধ্যে ‘ইন্টারনেট অব থিঙ্কস’ এসে আমাদের সব আয়োজন থামিয়ে দিয়ে সবকিছু ঘুরিয়ে দেবে এমন এক লক্ষ্যের দিকে যার জন্য আমাদের এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। আগাগোড়া বুঝে এগুতে হবে আর সবাইকে আশ্বস্ত করতে হবে এই বলে যে, আমরা দেশের জন্য ও দেশের মানুষের জন্য ভাল হয় এমন সব বিজ্ঞান-বুদ্ধির চর্চায় কখনোই পিছিয়ে থাকব না, সে পরিবেশ আমাদের আছে।

লেখক : পরিচালক, আমাদের গ্রাম, উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প

rezasalimag@gmail.com