১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অর্থনৈতিক উন্নয়নে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা

  • আল নাহিয়ান

বাংলাদেশের হাজার বছরের লোকসংস্কৃতির প্রাণ হচ্ছে মেলা ও পার্বণসমূহ। কবে, কখন, কোথায় প্রথম মেলার প্রচলন হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস জানা সম্ভব না হলেও এটি যে আমাদের আবহমান বাংলার এক প্রাচীন ঐতিহ্য এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। ধারণা করা হয়, গ্রামীণ হাট থেকেই আসে মেলার ধারণা। অতীতে রাজা-জমিদাররা মেলার আয়োজন বা পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তাই বাংলার বারো মাসের তেরো পার্বণের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে মেলা। উপলক্ষ যাই হোক না কেন, বাঙালীর সকল উৎসবের মূলে একটা সর্বজনীন রূপ আছে। সকল শ্রেণীর মধ্যে সেতুবন্ধন রচিত হয়। এ কারণেই কালের বিবর্তনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকতার ধরন পাল্টালেও এদেশের সামাজিক উৎসব বা গণমানুষের ঐতিহ্য-কৃষ্টিগুলো আজও হারিয়ে যায়নি।

মেলা মানেই মহামিলন। মানুষের উছ¦াস-উল্লাসের বহিঃপ্রকাশ ঘটে মেলার মধ্য দিয়ে । সরকারী, বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রামীণ মেলার কনসেপ্টকে ধারণ করে শহরাঞ্চলেই এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক জাঁকজমকপূর্ণ মেলার নিয়মিত আয়োজন করা হয়। যেমন কম্পিউটার মেলা, বিজ্ঞান মেলা, কৃষি মেলা, বই মেলা। এমনি একটি মেলা হলো আমাদের সংস্কৃতির আধুনিকতম সংস্করণ ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতিবছর ঢাকার শেরে বাংলানগরে বাংলাদেশ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর উদ্যোগে শিল্পপণ্য ও ভোগ্যপণ্য নিয়ে নিয়মিত আয়োজিত হচ্ছে এ মেলা । ধীরে ধীরে এই মেলা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এখন প্রতিবছরই এই মেলার জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকেন ক্রেতা দর্শনার্থী। মেলায় ব্যতিক্রম, দৃষ্টিনন্দন ও মানের দিক দিয়ে সেরা পণ্যটি পাওয়া যায় বলে বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে। বাংলার চিরায়ত লোকসংস্কৃতিকে সমুন্নত রেখে বরাবরের মতো এবারও গত জানুয়ারি মাসে শুরু হয়েছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার ২৪ তম আসর। এবারে মেলায় প্রিমিয়ার প্যভিলিয়ন,সাধারণ প্যাভিলিয়ন, মিনি প্যাভিলিয়ন, প্রিমিয়ার স্টল, সাধারণ স্টল এবং খাবার দোকানসহ ৬০৫ টি স্টল রয়েছে। এর মধ্যে প্যাভিলিয়ন ১১০টি, মিনি-প্যাভিলিয়ন ৮৩টি ও রেস্তরাঁসহ অন্যান্য স্টল ৪১২টি। বাংলাদেশ ছাড়াও ২৫ দেশের ৫২টি প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিয়েছে। অংগ্রহণকারী দেশÑথাইল্যান্ড, ইরান, তুরস্ক, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, চীন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, হংকং, সিঙ্গাপুর, মরিশাস, দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান।

মেলার আন্তর্জাতিকায়নের ফলে প্রচুর বৈদেশিক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। বিদেশী ক্রেতা ও দর্শকের সমাগম ঘটে। আমাদের দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সামগ্রী বিদেশীদের কাছে বেশ পছন্দনীয়। মেলায় বিদেশী দর্শকদের কাছে এসব পণ্য বিক্রির মাধ্যমে বিশ্বে আমাদের এই দেশীয় শিল্পের বিক্রি ও সুনাম বৃদ্ধি পায়। ফলে লাভবান হতে পারে আমাদের ক্ষুদ্র শিল্প। আর দেশীয় বড় বড় প্রতিষ্ঠানের মুনাফা অর্জনের কথা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার, অংশগ্রহণকারী দেশী ও বিদেশী কোম্পানি থেকে মোটা অঙ্কের রাজস্ব পায় এবং প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ পায়। মেলার টিকেট বিক্রি থেকেও প্রচুর অর্থ উপার্জিত হয়। মেলায় খ-কালীন কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেকারদের সাময়িক বেকারত্ব ঘুচে। অনেকেই আবার মেলার খ-কালীন চাকরিতে ভাল পারদর্শিতা প্রদর্শন করে স্থায়ী চাকরিও পেয়ে থাকেন। বাণিজ্য মেলা একটি দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রসারে বাণিজ্য মেলা সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই দেশের মূল শক্তি অর্থনীতির সমৃদ্ধ অবকাঠামো গঠনে বাণিজ্য মেলার আয়োজন আবশ্যক। তাছাড়া যেহেতু মেলায় বিভিন্ন দেশের বণিকশ্রেণী তাদের নানা ধরনের পণ্য নিয়ে হাজির হয়, তাই দেশীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো নিত্যনতুন বিদেশী পণ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন পণ্য উৎপাদনের ধারণা পায়। ক্রেতা বা ভোক্তা বিদেশী পণ্যের সঙ্গে আমাদের দেশীয় পণ্যের মানের তুলনা করতে পারেন। বিদেশী ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তার সঙ্গে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটে। ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রচার ও প্রসার হয়। জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতির প্রধান বাহক হলো বাণিজ্য । আর এই বাণিজ্যের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণই বাণিজ্য মেলার মূল লক্ষ্য। দেশের অর্থনীতির দ্রুত বিকাশে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে । এ মেলা বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ব্যবসায়িক আয়োজন। উৎপাদক-রফতানিকারক, আমদানিকারক, ব্যবসায়ী ও ক্রেতাসাধারণকে এক প্ল্যাটফর্মে সমবেত করতে এবং পণ্যের প্রসার ও বাজার সম্প্রসারণে তথা জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নে এ মেলার আবশ্যকতা অপরিহার্য।