২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জেসিসির পঞ্চম বৈঠক

বাংলাদেশের নবগঠিত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন প্রথম বিদেশ সফরে গেছেন ভারতের নয়াদিল্লীতে চার দিনের জন্য। উদ্দেশ্য, বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পরামর্শমূলক (জেসিসি) ৫ম বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা। এর বাইরেও তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ অন্য শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এবারের সফরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও জোরদার করাসহ পারস্পরিক বহুমুখী সহযোগিতা বৃদ্ধিতে চারটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশের ১৮০০ সরকারী মধ্যম সারির কর্মকর্তাকে সে দেশে প্রশিক্ষণ দান, মেডিসিন প্লান্টের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও আয়ুশের মধ্যে সহযোগিতা, দুর্নীতি দমন কমিশন ও সিবিআইয়ের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বাগেরহাটের মংলায় ভারতীয় ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা বৃদ্ধি। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এবারের আলোচনার অন্যতম মুখ্য ইস্যু হিসেবে হয়ে উঠেছে তিস্তা ইস্যু ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। দীর্ঘদিন থেকে ঝুলে থাকা তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যুটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উত্থাপন করায় সুষমা স্বরাজ জানান, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি দ্রুত সমাধান করতে তারা কাজ করবেন। এর পাশাপাশি মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখা হবে। এ দুটো ক্ষেত্রে ভারতকে শুধু কথার কথা নয়, বাস্তবে প্রমাণ দিতে হবে। কেননা এ দুটো ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ভুক্তভোগী।

উল্লেখ্য, ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিন বিরাজমান সীমান্ত ও ছিটমহল সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের পর তিস্তা ও মনু নদীর পানিবণ্টন সমস্যাটি ঝুলে আছে। অন্যদিকে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা দশ লক্ষাধিক ছিন্নমূল রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার সমাধানে ভারতের সাহায্য-সহযোগিতাও কামনা করেছে বাংলাদেশ। ভারতের প্রধানমন্ত্রীও সবসময় বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে তার দেশ সর্বদাই পাশে থাকবে বলে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক পদ্মা-মেঘনা-যমুনার মতো। তিনি যদি এর সঙ্গে তিস্তা নদীর প্রসঙ্গটি জুড়ে দিতেন, তাহলে সর্বাঙ্গসুন্দর হতো অবশ্যই। তিস্তা ও মনু নদীর ন্যায্য পানিবণ্টন সমস্যার সমাধান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবি। পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনেও ভারত সহযোগিতার মনোভাব প্রত্যাশা করে ঢাকা।

বাংলাদেশ ভারতের শুধু নিকট প্রতিবেশীই নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত অকৃত্রিম বন্ধু ও সুহৃদ। দিল্লী বাংলাদেশের কাছে করিডর, ট্রান্সশিপমেন্ট, শুল্কমুক্ত পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্য সুবিধাসহ যখন যা চেয়েছে, তখনই তা পেয়েছে সহজে। ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে ভারতের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ও সহযোগিতা সর্বদাই স্মরণ করা হয়ে থাকে। সে তুলনায় বাংলাদেশের চাহিদা ও প্রাপ্তি অনেক কম। উদাহরণত বলা যায়, উজানে পানির প্রবাহ ও প্রাপ্তির কথা। ভারত কোন অবস্থাতেই আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও আইনকানুন ভঙ্গ করে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তাসহ অভিন্ন নদ-নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ অবরুদ্ধ করতে পারে না। অথচ ভারত তাই করেছে প্রথমে গঙ্গা এবং পরে তিস্তা ও অন্যান্য নদ-নদীতে বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণ করে। সর্বশেষ ব্রহ্মপুত্রেও বাঁধ নির্মাণের কথা শোনা গেছে। বাংলাদেশ এসব ক্ষেত্রেই ন্যায়ানুগ ও যুক্তিসঙ্গত প্রতিবাদ জানিয়েছে। তবে দুঃখজনক হলো গঙ্গার পানি নিয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে তা হয়নি; বরং ঝুলে আছে দীর্ঘদিন থেকে। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার প্রথম দিকে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরকালে তিস্তা চুক্তির সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। তবে শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সফর বাতিল করায় তা আর হয়ে ওঠেনি। অভিযোগ রয়েছে তিনি তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে আদৌ আগ্রহী নন। তদুপরি বর্তমানে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের সঙ্গে তার খারাপ সময় যাচ্ছে। সে অবস্থায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ‘গুজরাল ডকট্রিনের’ মতো প্রয়োজনে পশ্চিমবঙ্গকে পাশ কাটিয়ে তিস্তা চুক্তি সম্পাদন করতে পারে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়। পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক পুনর্বাসনে ভারতের সর্বাত্মক সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য।