১৮ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু হোক সচল

  • জাফর ওয়াজেদ

প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। প্রথম নির্বাচিত হয়ে আসা সংসদ সদস্যারাও বেশ সরব। সংরক্ষিত নারী আসনগুলোর নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর অধিবেশনে তাদের উপস্থিতি সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে এমন ধারণা সহজেই আসে। সংসদীয় গণতন্ত্র এদেশের জনগণের চাওয়া বলেই দেশ এই পথে ধাবিত হয়ে আসছে। সরকারও পরিচালিত হচ্ছে সংসদীয় পদ্ধতিতে। কিন্তু সংসদীয় গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর ‘সিরিয়াসনেস’-এর অভাবে। বাংলাদেশের ডামাডোলের রাজনীতিতে দেখা যায় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হতে যত প্রাণান্তকর পরিশ্রমই করা হোকনা কেন, সংসদ অধিবেশনে অংশ নিয়ে সংসদীয় ব্যবস্থাকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে আগ্রহ প্রায় স্তিমিত। সংসদে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরাতে নেই তেমন আগ্রহ। অধিবেশনে হাজিরা দেয়াতেও আলস্যবোধ সম্ভবত জেগে ওঠে। তাই মাঝে মধ্যে সংসদে কোরাম না হওয়ার ঘটনা কম নয়। আর টানা সংসদ বর্জন করার রেওয়াজও তৈরি করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। সপ্তম সংসদে বিএনপি-জামায়াত নামক জোট সদস্যরা হাজির ছিলেন নামমাত্র। অধিবেশন বয়কট শুধু নয়, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস বর্জন করেছে। তারা যুক্তি দেখাত যে, ‘সংসদে সরকারী দল কথা বলতে দেয় না।’ এমন যুক্তি তারা দেখাতেই পারেন, কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সংসদ পরিচালিত হয় কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী। খেয়াল খুশিমত যখন তখন দাঁড়িয়ে যা খুশি তাই বলার বিধান নেই। বিধি অনুযায়ী নিয়ম-নীতি মেনে কথা বলতে হয়। লাগামছাড়া কথা বলার অধিকার একেবারেই নেই। কিন্তু সে সবের তোয়াক্কা তারা করে না অনেক ক্ষেত্রেই। ‘ফ্রি স্টাইলে’ কথা বলার স্থান নয় সংসদ । বিধি বিধান মেনে কথা বলতে হয়। সংসদ সদস্যদের জন্য রয়েছে কার্যপ্রণালী বিধি। যাতে বিধান রয়েছে একজন সদস্য অধিবেশনে কি ধরনের আচরণ করবেন। কোন্ প্রসঙ্গ কোন্ বিধিতে উত্থাপন করবেন তাও নির্দিষ্ট করা রয়েছে। ‘সংসদ সদস্যদের আরচণ বিধি’ প্রণয়ন করার কাজটি শুরু করেছিল নবম সংসদ। কিন্তু সে কাজ আর এগোয়নি। আচরণগত সমস্যা অনেক ক্ষেত্রেই সংসদ কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। স্পীকার এ বিষয়ে অবশ্য বার বার সতর্ক করেন যদিও, কিন্তু সদস্যরা তা বেমালুম ভুলে গিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অনুপস্থিত ব্যক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করতে পিছপা হন না। বিএনপির সাজাভোগী চেয়ারপার্সন আড়াই দফা সংসদ নেত্রী ছিলেন। কিন্তু তার অধিবেশনে উপস্থিতি নামমাত্র। হাতে গোনা যায়। অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা হলেও তিনি থাকতেন গরহাজির। দেখা গেছে তখন তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অপ্রয়োজনীয় কোন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়ে বেড়াচ্ছেন। সংসদকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন এমন উদাহরণ মেলে না। এমনকি বিরোধী দলীয় নেত্রী থাকাকালেও সংসদকে উপেক্ষা করা ছিল তার অভ্যাস ও মজ্জাগত। এবার একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের আট সদস্য অধিবেশনে যোগ দেবেন কি, ওরা তো শপথই নিচ্ছেন না। নির্বাচনের পর সংসদ বয়কটের পক্ষে যে যুক্তিকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন তা দুর্বল চিত্তের দুর্বল রাজনীতির পরিচায়ক। তাদের কাছে সংসদে যোগ দেয়ার অর্থই হলো সরকারী দলের অনিয়মকে মেনে নেয়া, সরকার ও সংসদকে বৈধতা দেয়া। ঐক্যফ্রন্টের বিএনপির সদস্য ছয় জন আর গণফোরামের দু’জন। এর মধ্যে গণফোরামের এক সদস্য শপথ নিয়ে সংসদে যোগদানের আগ্রহ অনেক আগেই প্রকাশ করেছেন। বিএনপি যদি শপথ নিয়ে সংসদে যোগও দেয় তাদের বর্জন সংস্কৃতি তারা ভুলে যাবে, এমনটা নয়। বিএনপি নেত্রী সরকারে থাকাকালে সব সময় বলে আসতেন সংসদই হবে সকল সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু সেই তিনিই সংসদ বর্জন করাকেই গুরুত্ব দিতেন। সংসদ সদস্যদের মুখোমুখি হতে তিনি ছিলেন নারাজ। কোন সমালোচনাকেই সহ্য করতে পারতেন না। তাই সংসদে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় সদস্যের বক্তব্য রাখার সময় ‘চুপ বেয়াদব’ বলে হুমকি-ধমকি দিতে কসুর করেন না। পঞ্চম সংসদে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তাদের তথ্যমন্ত্রী বিরোধীদলীয় সদস্যদের উদ্দেশে কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘তারা হঠাৎ নওমুসলিম সেজেছে।’ তার বিদ্রুপপূর্ণ বাক্যাবলীর কারণে বিরোধী সদস্যরা সংসদ বর্জন করেছিলেন। সেই বর্জনের রেশে শেষ পর্যন্ত সংসদ থেকে পদত্যাগও করেন একযোগে। তাদের সংসদে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারী দলের পক্ষ থেকে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এমনকি পদত্যাগপত্র আটকে রাখা হয়েছিল বিধি বিধান ভঙ্গ করে। আসন শূন্য ঘোষণাও দেয়া হয়নি। এই একই তথ্যমন্ত্রী এমন ভাষ্যও রেখেছিলেন যে, সরকারে আমরা আছি। সুতরাং রেডিও-টিভি চলবে সরকারের নির্দেশে এবং সরকারের পক্ষে প্রচারণা চালানো হবে। তার বক্তব্যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল সংসদের ভেতরে-বাইরে। পঞ্চম সংসদে বিএনপির এক ডাকসাইটে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে যে, শিক্ষক নিয়োগে তিনি সুপারিশ করেছেন যাদের নাম তারা কেউ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি। যারা উত্তীর্ণ হয়েছে তাদের নাম বাদ দিয়ে এটি করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তুমুল তর্ক-বিতর্কের পর একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি দশবার বৈঠক করেও তদন্তের ‘ক্রাইটেরিয়া’ কী হবে, তা নির্ধারণ করতে পারেনি বা নির্ধারণ করতে দেয়া হয়নি। সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারের জবাবদিহিতার বিধান রয়েছে এবং তা সংসদে। কিন্তু সেদিকে নজর দেয়ার মতো কর্মকান্ড পরিলক্ষিত হয় না। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো পরিচালিত হতো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর নেতৃত্বে। কিন্তু ষষ্ঠ সংসদে শেখ হাসিনা সংসদনেত্রী থাকাকালে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পরিবর্তন আনেন। মন্ত্রীর পরিবর্তে মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে সাধারণ সদস্য থেকে সভাপতি এবং মন্ত্রীদের সদস্য হওয়ার বিধান জারি করেন। ফলে স্থায়ী কমিটিগুলো মন্ত্রীনির্ভর না হওয়ায় মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সুপারিশ ও পরামর্শ প্রদানে সক্রিয় হয়ে উঠতে পেরেছে। পঞ্চম সংসদ পর্যন্ত যে কোন বিল সংসদে উপস্থাপনের পর তা আইন মন্ত্রণালয় পাঠানো হতো যাচাই বাছাইয়ের জন্য। শেখ হাসিনা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসেন। সংসদে উত্থাপিত বিল যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর বিধান জারি করেন। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বিল সংসদে উত্থাপিত হয়ে আসছে। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থাকে গুরুত্ববহ ও কার্যকর করে তোলার জন্য শেখ হাসিনা সপ্তম ও নবম সংসদে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন ও সংযোজন করেন। অর্থাৎ সংসদীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দৃঢ়, গতিশীল এবং কার্যকর করার জন্য আন্তরিকভাবে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন তাতে সংসদকে সকল সমস্যা সমাধানের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করেছেন। দশম সংসদ নিয়ে সমালোচনা হলেও আইনগত বাধ্যবাধকতাকে রক্ষা করে পূর্ণ মেয়াদ পালন করতে পেরেছে। ২০১৪ সালের পাঁচ জানুয়ারি বিএনপি-জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছিল দশম জাতীয় সংসদ। নানা ঘটনার কারণে এই সংসদ স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই প্রথম টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করার নজির স্থাপন করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ। এই সংসদের দু’জন সদস্য আন্তর্জাতিক দুটি সংস্থার প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন। স্পীকার ডক্টর শিরীন শারমিন চৌধুরী কমওয়েলথ পার্লামেন্টারি এ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) সভাপতি নির্বাচিত হন। এছাড়া সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সভাপতি নির্বাচিত হন। যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে। দশম সংসদে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা উপস্থিত থেকেছেন ৩৩৮ দিন। বিদেশ সফরের কারণে কয়েকটি কার্যদিবসে অনুপস্থিত থেকেছেন। বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ উপস্থিত ছিলেন ২৪১ দিন। বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে আগে কোন বিরোধীদলীয় নেতা এতদিন সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত থাকেননি।

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানকালে তিনজোটের রূপরেখায় রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতি থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের উল্লেখ ছিল। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় যেয়ে সেই পথ অবলম্বন না করার কথা বললেও ধোপে টেকেনি। বিরোধীদল আওয়ামী লীগের চাপে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। তবে পঞ্চম সংসদ থেকে শুরু হয় অধিবেশন বর্জনের সংস্কৃতি। সংসদের ভেতরে-বাইরে আন্দোলন চলে। দশম সংসদে বর্জনের সংস্কৃতির অবসান ঘটেছিল। নবম সংসদে বিরোধীদল বিএনপি ৪১৮ কর্মদিবসের মধ্যে ৩৪২ দিবস ছিল অনুপস্থিত। এমনকি সংসদের ভেতরে-বাইরে কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। দশম সংসদ বর্জনের মধ্য দিয়ে বিএনপির অধপতনের যাত্রা শুরু হয়েছে। একাদশ সংসদে তারা যে ছয়টি আসন পেয়েছে তা কম নয়। নির্বাচনে অংশ নিলেও নির্বাচনমুখী কোন কার্যকলাপই চালায়নি তারা। মনোয়ন বাণিজ্যের নামে যথাযথ প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারেনি, ভোট কেন্দ্রে এজেন্টও দিতে পারেনি। এমনকি তাদের কর্মী, অনুসারী ও সমর্থকরাও ভোট দিতে আসেনি। এক নেতিবাচক অবস্থান তারা গড়ে তুলেছিল। বিএনপি সংসদে বিরোধী গ্রুপ হিসেবে মর্যাদা পেতে পারে। সংসদীয় গণতন্ত্রে আস্থা কম বলেই বিএনপি নেতা-কর্মীরা সংসদ বিমুখ সেই ১৯৯১ সাল হতেই। সংসদে সববিষয়ে আলোচনায়ও আগ্রহী নয় তারা। দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সংসদে আলোচনা করতেও দেয়নি তারা। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার আমলে সংসদীয় গণতন্ত্র বিকশিত হবে জনগণের প্রত্যাশা তাই।

সংসদে ডাকসাইডে ‘পার্লামেন্টারিয়ানদের’ সঙ্গে নতুনরাও যুক্ত হয়েছেন এবার। সকলে মিলে সংসদকে প্রাণবন্ত করে তোলা শুধু নয়, সংসদে জাতীয় সমস্যাসহ স্থানীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা শেষে সমাধান উঠে আসবে- এমন প্রত্যাশা ভোটারদের থাকা স্বাভাবিক। শেখ হাসিনাই পারেন সংসদকে গুরুত্ববহ করে তুলে সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চাকে অর্থবহ করে তুলতে। বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের সংসদ বর্জন নিজেদের পায়ে কুড়াল মারার শামিল। দেশকে মধ্যম আয়ের পথে এগিয়ে নিতে হলে সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ও বিস্তারের পরিধি আরও বাড়ানো সঙ্গত।

নির্বাচিত সংবাদ