২৬ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডিজিটালের নামে বাংলা হরফ হারাতে চাই না

  • মোস্তাফা জব্বার

ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমাদের বাংলা ভাষাপ্রীতি অনেক বেড়ে যায়। মাসটা বিদায় হতেই সেই আবেগ আবার ম্লান হয়ে যায়। আরও স্পষ্ট করে বললে ভাষাপ্রীতিটা সম্ভবত এখন একুশের বইমেলাতেই সীমিত হয়ে থাকে। অথচ রক্ত দিয়ে কেনা বাংলা হরফের বর্তমান অবস্থা অতীতের যে কোন সময়ের চাইতে নাজুক। যদি স্বাধীনতা উত্তরকালে বাংলা ভাষার অর্জনের কথা বলি তবে সেটি সরকারী অফিস ও নিম্ন আদালতে বাংলা ভাষা ও লিপির ব্যবহারের কথা বলতে পারি। আমাদের সৌভাগ্য যে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৮ সালেল ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের জন্ম যেমন দিয়েছিলেন তেমনি ৭২ সালে জিডিআর থেকে অপটিমা মুনীর টাইপরাইটার বানিয়ে এনে বাংলাদেশের সরকারী অফিসে বাংলা চালু করেছিলেন। সেটি এখনও অব্যাহত আছে। কিন্তু ডিজিটাইজেশনের নামে কিছু সরকারী কাজে ও প্রায় সব বেসরকারী কাজে বাংলা তার সাংবিধানিক মর্যাদাও হারাচ্ছে।

ডিজিটাল যন্ত্রের দোহাই দিয়ে আমরা বাংলা হরফকে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও থেকে বিদায় করছি। রোমান হরফ বাংলা হরফের স্থান দখল করছে। বিষয়টি নিয়ে কারও তেমন কোন উদ্বেগ দেখি না। অবস্থা এমন যে আমাদের ব্যাংকাররা, এমনকি সরকারী ব্যাংকগুলোও এখন তাদের সকল কাজ ডিজিটাল প্রযুক্তির নামে রোমান হরফে করে। বেসরকারী অফিসের চিঠিপত্র, ডাটাবেজ রোমান হরফে হয়। ব্যানার-ফেস্টুন, সাইন বোর্ড রোমান হরফেই প্রকাশিত হয়। এমনকি আমাদের মোবাইল কৃষকসহ সবার কাছে রোমান হরফে এসএমএস পাঠায়। সরকারের পক্ষ থেকে মোবাইল অপারেটরদের সরাসরি বাংলায় যোগাযোগ করার নির্দেশ দিলেও সেটি পালিত হয় না। তারা বোঝে না যে দেশের বহু মানুষ এখনও রোমান হরফ তো দূরের কথা ভাল করে বাংলা হরফও চেনে না। আমি হাজার হাজার বাংলা শব্দের সুদীর্ঘ তালিকা প্রস্তুত করতে পারব, যে শব্দগুলো রোমান হরফ দিয়ে লেখাও যায় না। রোমান ২৬টি হরফ অন্তত বাংলা ৫২টি মৌলিক হরফের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। যুক্তাক্ষরের কথা না হয় বাদই দিলাম।

প্রতি বছরেই বাংলা একাডেমিতে বাংলা ভাষার প্রযুক্তিগত অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়ে থাকে। কোন এক বইমেলায় বাংলা একাডেমিতে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা শিরোনামে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এতে আমি মূল প্রবন্ধ পাঠ করেছিলাম। সেবার আমি এই বিষয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। আমার মনে পড়ে, ২০১৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে আলোচনা হচ্ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে তথ্যপ্রযুক্তির ভূমিকা নিয়ে। শ্রদ্ধেয় প্রফেসর ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর সভাপতিত্বে এতে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সরকারের তৎকালীন আইসিটি বিভাগের সচিব এনআই খান। আলোচনা করেন বেসিসের সাবেক সভাপতি মাহবুব জামান, কবি তারিক সুজাত, গবেষক অপরেশ বড়ুয়া ও আমি। এনআই খানের ইতিবাচক নিবন্ধটির প্রশংসা করে আমি সেদিন অতি ক্ষুদ্র একটি প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেছিলাম। সে প্রসঙ্গটিই আমার আজকের আলোচনার মূল বিষয় হিসেবে রাখতে চাই। সেদিন আমি শঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম যে, আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে, জ্ঞানভিত্তিক সমাজও হবে, তবে সেই ডিজিটাল বাংলাদেশ বা জ্ঞানভিত্তিক সমাজে বাংলা হরফ থাকবে কি-না, সেটি জানি না। এর প্রধানতম কারণ হচ্ছে, ডিজিটাল যন্ত্রের দোহাই দিয়ে আমরা বাংলা হরফকে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও থেকে বিদায় করছি। রোমান হরফ বাংলা হরফের স্থান দখল করছে। রোমান হরফের দাপট দিন দিন এতই বাড়ছে যে এই গতিতে চললে বাংলা হরফ জাদুঘরে চলে যাবে। আমার কাছে বার বার প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলা হরফ দিয়ে আমি যখন ইন্টারনেটের ডোমেইন নাম লিখছি তখন কি আমি বাংলা হরফ তৈরি করার জন্য রোমান হরফ ব্যবহার করব? নাকি আমি আমার হরফ দিয়েই আমার ভাষাকে প্রকাশ করব? যে বিষয়টি ভাষা আন্দোলন নিয়ে যারা আলোচনা করেন তাদের জন্য বলা দরকার সেটি হলো ভাষা আন্দোলন কেবল বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে নয়। ভাষা আন্দোলন ভাষার পাশাপাশি সেই ভাষা লেখার হরফ নিয়েও হয়েছে। বাংলা ভাষা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে এবং সেটি বাংলা হরফের বদলে অন্য হরফে লেখা হবে সেটি আমরা গ্রহণ করিনি। পাকিস্তান যার অন্যতম রাষ্ট্রভাষা উর্দু, তারা কিন্তু তাদের হরফ বিসর্জন দিয়ে আরবি হরফ গ্রহণ করেছিল আমরা যেটি করিনি। এর সবচেয়ে বড় কুফল যেটি হয়েছে, সেটি হলো উর্দুর অনেক উচ্চারণ এখন বিকৃত হয়ে গেছে। আরবি হরফ দিয়ে উর্দুর সব উচ্চারণ প্রকাশ করা যায় না। আমরা ভাগ্যবান যে, মালয়েশিয়া, ডেনমার্ক বা মালদ্বীপের মতো আমরা আমাদের হরফ বিসর্জন দেইনি। আমরা সাধারণভাবে রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাবনাটি প্রত্যাখ্যান করেছি। তবে বিগত কয়েক দশকে এটি বারবার ভিন্ন ভিন্ন রূপে আমাদের সামনে এসেছে। আমি আগেই বলেছি, কোন কোন সময়ে আমরা রোমান হরফে বাংলা লিখতে বাধ্য হতাম যেমন মোবাইল ফোনে। ওই যন্ত্রটিতে বাংলা লেখার অপশন যখন ছিল না না তখন এসএমএস বা মেইল রোমান হরফ দিয়েই লিখতে হতো। কিন্তু এখনতো দুনিয়ার কোন ফোন নেই যাতে আমরা বাংলা হরফে বাংলা লিখতে পারি না। বরং এখন কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনের জন্য সরকার কর্তৃক প্রমিত কীবোর্ড আছে। প্রমিত কোড সেটও আছে। দেশে এই প্রমিত মানসম্পন্ন সফটওয়্যারও পাওয়া যায় তবে কেন বাংলা হরফে বাংলা লেখা যাবে না। আমি বাংলা হরফের প্রমিত মানগুলোর উল্লেখ করে রাখি। বিডিএস ১৫২০ : ২০১৮, বিডিএস ১৭৩৮ : ২০১৮ এবং বিডিএস ১৯৩৫ : ২০১৮। দুঃখজনক হলো সরকারের অঙ্গ প্রতিষ্ঠানসমূহের কেউ কেউ সরকারেরই নির্দেশ পুরোপুরি মেনে চলে না। এটি অবাক হবার মতো হলেও এ জটিলতা সৃষ্টি করেছে বাংলা ভাষার নামে জন্ম নেয়া রাষ্ট্রের কিছু প্রতিষ্ঠান। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতেও তাদের ঘুম ভাঙানো যায়নি। মুখে ও লিখিতভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেও তাদের দ্বারা এই বিষয়ে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করানো সম্ভব হয়নি। এমনকি কোন কোন প্রতিষ্ঠান বাংলা হরফের বদলে রোমান হরফ ব্যবহারের নির্দেশনাও দিয়েছে। এমনকি বাংলা হরফে বাংলা লেখা নিষিদ্ধও করেছে। তবে তার বাইরেও সঙ্কট রয়েছে মানসিকতার। আমরা বাংলা খ, ঘ, ঙ, চ, ছ, ঝ, ঞ, ঠ, ঢ, ত, থ, দ, ধ ভ, শ, ষ, ড়, ঢ়, য়, ঃ, ৎ, অ, ঈ, ঊ, ঋ বর্ণসহ শত শত ধ্বনি রোমান হরফ দিয়ে লিখতে পারি না। রোমান হরফে এসব ধ্বনির জন্য কোন বর্ণ নেই। একাধিক বর্ণ দিয়ে এসব উচ্চারণ লিখতে হয়। কখনও কখনও বাংলা ধ্বনির পাশাপাশি বা বিকৃত কোন ধ্বনিকে রোমান হরফ দিয়ে হয়তো প্রকাশ করি কিন্তু এতে না থাকে ব্যাকরণ, না থাকে শুদ্ধ বানান বা বাক্য গঠন। আমাদের হীনম্মন্যতার জন্য আমরা সেই কাজটি করি না এবং জানিও না যে বাংলা হরফের তাকত দুনিয়ার তাবত রোমান বর্ণসমষ্টির চেয়ে হাজার হাজার গুণ উন্নত। এখন যারা রোমান হরফ দিয়ে বাংলা লেখেন তারা টের পান যে তিনি যা বলতে চাইছেন এবং সেটি যে রোমান হরফে প্রকাশ করেন তখন তা ভিন্ন কিছু বা বিপরীত কিছু হয়ে যায়। বাংলা বানানের বারোটাও যে তিনি বাজান সেটিও খুব সহজভাবেই অনুভব করা যায়। যদিও আমি টাইপরাইটারের মুনির কিবোর্ডটিকেই কম্পিউটারের জন্য গ্রহণ করতে পারিনি তবুও বাংলাকে বাংলার মতো দেখার জন্য মুনির চৌধুরীর যে ধারণা, সেটিকেই আমি গ্রহণ করেছিলাম। কম্পিউটারের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আমি নতুন একটি আবিষ্কার করেছি মাত্র, যেটি ডিজিটাল যন্ত্রের উপযোগী। বাংলা ভাষা নিয়ে যারা গবেষণা করবেন বা যারা নতুন কোন আবিষ্কার করবেন তারা অবশ্যই মনে রাখবেন যে- বাংলা বর্ণমালাকে বিসর্জন দিয়ে বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখা যাবে না। সরকারের কোন কোন মহলের বিভ্রান্তি ও রোমান হরফের পৃষ্ঠপোষকতা সাধারণভাবে বাংলা হরফের রোমানাইজেশন করার একটি নিরীহ উদ্যোগ মনে হলেও বাস্তবে এর পেছনে আরও একটু গভীর চক্রান্ত খুঁজে পাওয়া যায়। জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিল যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন করার জন্য সহায়তা প্রদান করে তখন নির্বাচন কমিশনকে তারা একটি বিশেষ ফ্রি সফটওয়্যার ব্যবহার করার উদ্যোগ নেয়। সেই সফটওয়্যারটিতে বিজয় কিবোর্ড বেআইনীভাবে যুক্ত করা হয়েছিল। আমি নিজে জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিল ও নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়ে প্রতিবাদ করি এবং এ ধরনের পাইরেসি থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করি। কিন্তু তারা আমার প্রতিবাদকে কোন ধরনের গুরুত্ব না দিয়ে সেই বিশেষ সফটওয়্যারটিকেই ব্যবহার করতে থাকে। বাংলাদেশের কোন সরকারী অফিসে এটি সবচেয়ে বড় পাইরেসি। জাতিসংঘের কোনো অফিসেও এটি সবচেয়ে বড় পাইরেসি। এরপর আমি কপিরাইট অফিসে ওই সফটওয়্যারটির বিষয়ে অভিযোগ করলে একটি সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে সেই সফটওয়্যার থেকে বিজয় কিবোর্ড প্রত্যাহার করা হয়। তবে তার আগে পাইরেসি হয়েই যায়। যেহেতু পুরনো সংস্করণে বিজয় কিবোর্ড রয়েছে সেহেতু বিজয়ের পাইরেসি এখনও চলছে। নতুন সংস্করণে এখন ইজি নামের একটি কিবোর্ড আছে যাতে বাংলা লিখতে হলে ইংরেজি বর্ণ টাইপ করতে হয়। ফলে যদি শুধু সেই সফটওয়্যারটিই কেবল ব্যবহার করা হয়, তবে রোমান হরফ দিয়ে বাংলা লেখা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। আমরা যখন একটি বাংলা হরফকে একজন বাঙালীর প্রাণ বলে স্লোগান দিই তখন রোমান হরফে বাংলা লেখার এই সরকারী প্রয়াসকে কি বলা উচিত? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালের সেই স্বেচ্ছাচার ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এখনও তাই বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় দুর্দিন হচ্ছে তার লিপি হারিয়ে ফেলার ভয়। আমি ভীষণ আতঙ্কে আছি এই ভেবে যে, আমাদের বাংলা ভাষাভাষীদের একটি বড় অংশ হয়ত নিজেরা বাংলা বলবেন কিন্তু বাংলা বর্ণমালা চিনবেন না।

এই ফেব্রুয়ারিতে আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা রোমান হরফে বাংলা লেখেন, যারা ব্যাংকসহ অন্যত্র ডাটাবেজ তৈরির নামে রোমান হরফ ব্যবহার করেন এবং যারা রোমান হরফ ব্যবহার করার জন্য নানা অজুহাত দেখান তাদের কাছে অনুরোধ করবো মানসিক দৈন্যদশা থেকে বের হন। যদি প্রযুক্তিগত কোন সমস্যায় থাকেন তবে আমাদের কাছ থেকেই সমাধানটা নিয়ে নিন। মনে রাখবেন প্রতিটি বাংলা হরফ প্রতিটি বাঙালীর প্রাণ।

ঢাকা ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান-সম্পাদক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার-এর জনক