২৬ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন

  • নাজনীন বেগম

১৯৫২ সাল বাঙালীর ঐতিহ্যিক সংগ্রামী অভিযাত্রার এক অবিস্মরণীয় যুগ সন্ধিক্ষণ। মায়ের ভাষা মানুষের নিজের আত্মপরিচয়, যাপিত জীবনের প্রতিদিনের গতি, আপন চৌহদ্দিতে ভাব বিনিময়ের নিয়ামক শক্তি সর্বোপরি আদর্শ, বোধ আর সংস্কৃতির অপরিহার্য অঙ্গ। ’৪৭-এর দেশ বিভাগে বাঙালীর আত্মপরিচয়ের ওপর যে নির্মম পেষণ শুরু হয়, সেখানে ভাষাকে নিয়ে আরম্ভ হয়ে যায় এক অযাচিত অপকৌশল। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীর মুখের ভাষাকে স্বীকৃতি না দেয়ার যে অশুভ পাঁয়তারা পাকিস্তানী সামরিক জান্তা গোটা দেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় অনাকাক্সিক্ষত বিপর্যয়ের সূত্রপাত করে, সে মাত্রায় ভাষা প্রেমিক বাঙালীরাও হয়ে ওঠে সংগ্রামী আন্দোলনের এক অপ্রতিহত শক্তি। লড়াইয়ের পথ পরিক্রমায় সম্মুখ সমরে ঝাঁপিয়ে পড়া থেকে আরম্ভ করে জীবনবাজি রাখাই শুধু নয়, রক্তস্নাত আঙ্গিনায় প্রাণ বিসর্জন দিতেও দ্বিধা করেনি। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনার নজিরও বিরল যেখানে মাতৃভাষা সুরক্ষায় দেশপ্রেমিক নাগরিক প্রতিপক্ষ শক্তিকে তোয়াক্কা না করে বীরদর্পে রক্ত দিতে তৈরি হয়ে যায়। আবহমান বাঙালীর সংগ্রামী ঐতিহ্য যেমন যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা এক অপ্রতিরোধ্য ঐতিহাসিক কাল পর্ব, ভাষার জন্য লড়াইও সেই মাত্রারই এক সাংস্কৃতিক অভিযোজন। বৈষয়িক এবং নৈসর্গিক বৈভবের এক সমৃদ্ধ জাতি তার চিরায়ত বোধ আর প্রতিদিনের কর্মযজ্ঞে ভাষার মতো একটি মহিমান্বিত গৌরবকে যে মাত্রায় লালন ও ধারণ করে, সেখানে সে অপরাজেয়, অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক পরাশক্তি। শাসক শ্রেণীর আধুনিক সমরাস্ত্রের সজ্জিত বাহিনী কিংবা রাষ্ট্রীয় কোন ধরনের কূটকৌশল এই ঐশ্বর্যম-িত অস্ট্রিক জাতির ভাবসম্পদকে ধুলায় লুণ্ঠিত করতে ব্যর্থ হয়। পর্বত সমান প্রতিরোধ আর বৈপ্লবিক ভূমিকায় কোন ধরনের অবদমনকে মাথা পেতে নেয়নি। যে কোন দেশের নিজস্ব ভাষা সেই নিদিষ্ট ভূ-খ-ের সম্পদ, ঐতিহ্য এবং চিরকালের সমৃদ্ধ চেতনা। যুগ যুগ ধরে বহু পরিবর্তন আর বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভাষা তার আপন বৈভবে সংহত হয়। ব্রিটিশ পূর্ব অবিভক্ত বাংলায় কোন শাসক কিংবা রাজণ্যবর্গের ছত্রছায়ার না পেলেও সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা বাংলা তার নিজস্ব বোধ, চাহিদা আর গতিতে সমৃদ্ধ বলয় তৈরি করতে কোন বেগ পায়নি। শাসকবর্গের কোন পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া বাংলা তার আপন ঐতিহ্যে ভাষার ক্রমাগত বিবর্তনের মাত্রা অবারিত করে, সেটাও ছিল যুগ-যুগান্তরের এক শুদ্ধ সাংস্কৃতিক বৈভব। যার যথার্থ কা-ারি সমকালের প-িত আর বিজ্ঞজনেরা। যেসব জ্ঞানাচার্যের শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চেতনা বাংলা ভাষার অভিগামিতাকে নিরন্তর আধুনিক এবং যুগোপযোগী করে তোলে। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের চর্যাপদের যে ঐতিহাসিক নমুনা আবিষ্কৃত হয়, সেখান থেকেই যদি আমরা ধরে নিতে পারি সাহিত্যের পথ পরিক্রমায় যথার্থ বাহন বাংলা ভাষাও তার গতি নির্ণয়ে নিজস্ব গন্তব্যে এগিয়ে যায়। ভাষা বিবর্তনের মহিমান্বিত পর্যায়ে জ্ঞানী, গুণী, সৃজন ব্যক্তিত্ব, মননশীল পুরোধা এবং বিশিষ্টজনেরা নিজস্ব দক্ষতা আর পরিচর্যায় বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ জোয়ারের অনুষঙ্গ করে উনিশ শতকের নবযুগের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়। এর পরবর্তী অধ্যায় বাংলা ও বাঙালীর নিরবচ্ছিন্ন এগিয়ে যাওয়ার স্বর্ণালী পর্ব।

প্রাক ব্রিটিশ ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলে বাংলার ঐতিহ্যিক সম্প্রসারিত পরিম-লে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জীবিত হওয়া ছাড়া অন্য কোন বিচ্যুতি কিংবা ছন্দপতন দৃশ্যমান হয়নি। ফলে ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনে বাংলা ভাষার ওপর কোন ধরনের আক্রমণ কিংবা আঘাত আসতে পারে এমন কিছু বাঙালীকে বিন্দুমাত্র শঙ্কিত করে তোলেনি। তার পরেও ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ কিংবা ’৪৭-এর দেশ বিভাগ সাধারণ জনগোষ্ঠীর কোন কল্যাণে আসবে না, এমন ধারণা অনেকেরই ছিল। যেমন, কবিগুরু বঙ্গভঙ্গ মানতে পারেননি। অবিভক্ত বাংলা ও বাঙালীর মূল শেকড় থেকে তুলে আনা তাঁর দেশাত্মবোধক সিংহভাগ গানই সেই অস্থির সময়ে রচিত। সেভাবে অবিভক্ত বাংলার ভাগও তৎকালীন অনেক রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্টজনেরা আমলে নিতে চাননি। নেতাজী সুভাষ বসুও তাঁদের একজন যিনি বাংলা ভাগের বিপক্ষে ছিলেন। তাঁর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া দুই বাংলার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি ছিল। ’৪৭-এর দেশ বিভাগে পূর্ব বাংলার ওপর যে দুর্যোগের ঘনঘটা নেমে আসে, তার প্রথম এবং গুরুতর আঘাতটি আসে আবহমান বাঙালীর সাংস্কৃতিক বৈভবের ওপর। ঐতিহ্য সমৃদ্ধ বাংলা ভাষা এবং তার চারপাশের শুদ্ধ পরিশীলিত নান্দনিক বলয় সময়ের মিছিলে আধুনিকতার সম্প্রসারিত ক্ষেত্রকে নানামাত্রিকে উদ্দীপ্ত করার সে মহিমান্বিত পর্যায়কে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর তীব্র রোষানলে পড়তে হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পরও যারা এই নতুন রাষ্ট্রের কর্ণধার হলেন, তারা কোনভাবেই বাংলা ভাষা চর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। পূর্ব বাংলার শাসক গোষ্ঠীও নামে মাত্র বাঙালী হয়ে চিন্তা-চেতনা এবং বুদ্ধিবৃত্তিতে ছিলেন উর্দু ভাষার প্রতি অনুরক্ত। আত্মপরিচয় বিঘিœত হওয়ার এই বিক্ষুব্ধ পর্বে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে এক জনসভায় ঘোষণা দিলেনÑ উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এই অগণতান্ত্রিক, অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্তে পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এর পরবর্তী পর্যায়ে মওলানা ভাসানীসহ গাজীউল হকের মতো অনেক ভাষাসৈনিক ধর্মঘট এবং বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করেন এমন হতাশাব্যঞ্জক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে।

ফেব্রুয়ারি মাসের গোড়া থেকে শুরু হওয়া এসব আন্দোলন, প্রতিরোধ, বিক্ষোভে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে সাড়া জাগানো অনুষ্ঠান পালিত হয়। শুধু তাই নয় সারা বাংলা থেকে অসংখ্য মানুষের বৈপ্লবিক কণ্ঠের যে সোচ্চার আওয়াজ তোলা হয়, সেটা যেমন পাকিস্তান সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দেয়, একইভাবে ভাষা প্রেমিক বাঙালীদের সুসংহত করতেও জোরদার ভূমিকা রাখে। ’৪৭-এর দেশ বিভাগ সাধারণ বাঙালীর জীবন ও মানোন্নয়নে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হওয়া ছাড়াও ভাষা এবং ঐতিহ্যিকবোধে যে মাত্রার কূটকৌশল খাটানো হয়, সেটাও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পুরো সামাজিক অবয়বে এক বেসামাল পরিস্থিতি তৈরি করে। চিরায়ত বাংলা ও বাঙালীর আত্মপরিচয় এবং মর্যাদা অক্ষুণœ রাখতে জ্ঞানী, গুণী, বিজ্ঞজন থেকে শুরু করে সাদারণ মানুষ যে বৈপ্লবিক অভিঘাতের মুখোমুখি হয়, ঐতিহ্যিক ভাষা সংগ্রাম সেই লড়াইয়ের জোরালো ভিত্তি। বাংলার সাংস্কৃতিক বৈভবে সমৃদ্ধ আঙ্গিনায় প্রতিপক্ষ আর প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি বিভেদবোধকে জিইয়ে রেখে প্রয়োজনে আরও সংহত করে মাতৃভাষাকে পদানত করতে সব ধরনের ষড়যন্ত্রের পাঁয়তারা করতে থাকে। কিন্তু ঐতিহাসিক ক্রমবিবর্তনের ধারায় বাংলা ভাষা যে মাত্রায় তার মর্যাদাকে সমুন্নত রাখে, সেখানেই সুসংহতভাবে এর সুরক্ষার বীজও রোপিত ছিল। ফলে নয়া ঔপনিবেশিক পাকিস্তানী শাসক চক্র অবদমন এবং পীড়ন বাঙালীীদের প্রতিদিনের জীবনবোধের ওপর চাপিয়ে দেয়ার হীন চক্রান্তে মেতে উঠলেও, সময়ের দুর্বার মিছিলে তা প্রতিরোধ আর প্রতিবাদের ঝড়ে তোলপাড় হয়ে যায়। সঙ্গত কারণেই নতুন পাকিস্তানের পক্ষে থাকা অনেক দেশপ্রেমিক বাঙালী নিজের ভাষার ওপর এমন বল প্রয়োগের হীনম্মন্যতাকে কোনভাবেই মানতে পারেনি। সেই দুর্বার আর অপ্রতিহত সংগ্রামী অভিযাত্রায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন যে মহিমান্বিত পর্বের শুভসূচনা করে, সেই অগ্নিঝরা সময় থেকে শুরু হয়ে যায় স্বাধিকার আদায়ের আরও এক নতুন মাত্রা। যা মহাকালের বৈপ্লবিক বিবর্তনের ধারাকে বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকে মোড় ঘুরিয়ে দিতেও সময় নেয়নি। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ প্রায় ২০ বছরের অধিকার অর্জনের লড়াই-সংগ্রাম বাঙালীর নিজ মাতৃভূমিতে পুনরায় আপন কৃষ্টি সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষায় পায়ের তলার মাটিকে আরও মজবুত করার এক অনমনীয় প্রত্যয়। অনেকে এই নবযাত্রাকে পূর্ববাংলার মুসলমানদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সংগ্রাম হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন, যার প্রাথমিক মঙ্গলযাত্রা ১৯৫২ সাল থেকেই শুরু হয়। এই ভাষা আন্দোলন শুধু নিজ দেশে ফেরা নয়, পুরো আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের এক সম্প্রসারিত বৈপ্লবিক অভিগমনও বটে। আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনা এই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুন করে গ্রন্থি তৈরি করতে থাকে। সঙ্গত কারণে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তি দুর্বল ও অসংহত হয়ে পড়ে।

১৯৫২ সালের রক্তস্নাত ফেব্রুয়ারি বাঙালীর জীবন ও মননবোধে যে সুদূরপ্রসারী ঐতিহ্যিক চেতনা সংহত করে, সে ইতিহাসও এক অগ্নিঝরা সময়ের দুর্বার প্রতিরোধ। ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে যে বৈপ্লবিক কর্মসূচীতে ঢাকার রাজপথ উত্তপ্ত করে, সেই উন্মাদনা পূর্ব বাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়তেও সময় লাগেনি। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আর বিক্ষোভে পাকিস্তানী শাসকবর্গের ভিত কেঁপে ওঠে। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে এমন উন্মত্ততাকে সামাল দেয়া শক্তিশালী শাসকবর্গের পক্ষেও অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে ২০ ফেব্রুয়ারি বাজেট অধিবেশনের অজুহাতে ১ মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করলে পরিস্থিতি নমনীয় হওয়ার বিপরীতে আরও দুর্বার আর অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। গাজীউল হক, হাবিবুর রহমান, মোহাম্মদ সুলতান, জিল্লুর রহমান, আখতার মুকুল, আবদুল মোমিনের মতো ভাষাসৈনিকরা অকারণে, অপ্রয়োজেন জারি করা ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে ফেলার দিক নির্দেশনা দিলে বাংলার দামাল ছেলেরা সেই বেড়াজাল ডিঙ্গিয়ে রাজপথে নেমে আসে। ঐতিহাসিক ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর রাজপথ ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষ’দের লড়াকু সৈনিকদের মিছিল-শোভাযাত্রায় মুখরিত হয়ে ওঠে। হতোদ্যম ও দিশেহারা পাকিস্তানী জঙ্গী বাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণের মুখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ এলাকায় ছাত্রদের মিছিল ও সমাবেশে কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ, লাঠিচার্জ করা গোলাগুলির বীভৎসতায় সুশৃঙ্খল মিছিল শুধু ছত্রভঙ্গই হয়নি, রক্তাক্ত অবস্থায় অনেকের দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ভাষা শহীদ জব্বার ও রফিক ঘটনাস্থলেই মারা যান। হাসপাতালে মারা যান বরকত। আর ৭ এপ্রিল পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন সালাম। ২১ ফেব্রুয়ারির সেই রক্তমাখা রাজপথ যে দুর্জয় সাহসের পরিচয় দিয়ে শাসক গোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে তোয়াক্কা না করে সম্মুখ সমর অবারিত করেছিল, বাঙালীর সংগ্রামী ইতিহাসে আজও তা স্মরণীয় বরণীয়ই শুধু নয়, তার চেয়েও বেশি ঐতিহ্যিক বাংলা ভাষাকে আপন মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে চিরস্থায়ী মনন ও বোধের এক অকৃত্রিম যোগসাজশও বটে। বাংলা ভাষাকে নিয়ে উচ্চ, মধ্য এবং নিম্নবিত্তের বাঙালীদের মধ্যে যে অন্তর্দ্বন্দ্ব, বিরোধ এবং সূক্ষ্ম লড়াই ছিল, ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক পরিস্থিতি ও পরিণতিতে সে ফারাকও ঘুচে গেল নির্বিঘেœ, নিঃসংশয়ে। ধর্ম, বর্ণ, বিত্ত নির্বিশেষে পুরো বাঙালী এক ও অভিন্ন সুতায় আত্মপরিচয়ের গ্রন্থি আরও সুদৃঢ় করল। অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সমুন্নত রেখে প্রতিটি অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে বাঙালী এক কাতারে এসে দাঁড়ালো। এরই ধারাবাহিকতায় একুশ ফেব্রুয়ারির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ২১ দফা দাবির চারটিই ছিল বাংলা ভাষা সম্পর্কিত।

১. বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা, ২. বাংলা সাহিত্যের গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা, ৩. ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে শহীদ মিনার নির্মাণ এবং ৪. একুশে ফেব্রুয়ারিকে সরকারীভাবে শহীদ দিবসের মর্যাদায় অভিষিক্ত করা। মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ সংগঠন সংহত করে যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে শাসকগোষ্ঠীর ভরাডুবি হয়। নির্বাচনে মুসলিম লীগের এমন বিপর্যয়েও সত্যিকার অর্থে বাঙালীদের হাতে স্বায়ত্তশাসন দেয়া কিংবা রাষ্ট্রভাষা বাংলার ব্যাপারে সূক্ষ্ম বিরোধ জিইয়ে রাখাÑ সবটাই পাকিস্তানী কুচক্রী শাসক গোষ্ঠীর ইশারায় চলতে থাকে। ফলে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভার বিরল রদবদল বাঙালীদের কখনও সেভাবে ক্ষমতাসীন করতে পারেনি। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রভাষা নিয়েও বাংলার তেমন কোন মর্যাদা দৃশ্যমান হয়নি। ফলে বাঙালী জাতির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার লড়াই অব্যাহত থাকে। যার সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে।

লেখক : সাংবাদিক