১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৯

বাণিজ্যনীতি পুনর্বিন্যাস ॥ দীর্ঘ ছয় বছর পর

এম শাহজাহান ॥ বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে দীর্ঘ ছয় বছর পর বাণিজ্য নীতি পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এতে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ ও বাংলাদেশের রফতানি বাড়বে। গতি আসবে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাভুক্ত (ডব্লিউটিও) ১৬৩ দেশের হাতে এখন বাংলাদেশের বাণিজ্য নীতি। দেশগুলো পুনর্বিন্যাসকৃত বাণিজ্য নীতিটি পর্যবেক্ষণ করছে। বাংলাদেশ থেকে বছরে রফতানি হচ্ছে ৪৩ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে আমদানি হচ্ছে ৫৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ও সেবা সামগ্রী। রফতানি যে হারে বাড়ছে তার চেয়ে বেশি বাড়ছে আমদানি। এই বাস্তবতায় একটি বিনিয়োগবান্ধব বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। অধিকতর স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে এরকম একটি বাণিজ্য নীতির প্রণয়ন করেছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে ডব্লিউটিওর সেক্রেটারিয়েট সম্প্রতি বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতি প্রকাশ করে সেই প্রতিবেদনের ওপর মতামত চেয়েছে সদস্য দেশগুলোর কাছে। বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতির ওপর তাদের কোন পরামর্শ কিংবা প্রশ্ন থাকলে তা আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে লিখিত আবেদন করতে হবে। পরবর্তী এক মাস বা আগামী ২৭ মার্চের মধ্যে সদস্য দেশগুলোর যে কোন বিষয়ের ওপর মতামত প্রদান করবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশসহ বর্তমান ডব্লিউটিওর সদস্য সংখ্যা দেশ ১৬৪। বাণিজ্য নীতি পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত সমাপনী বৈঠক হবে ডব্লিউটিওর প্রধান কার্যালয় জেনেভায়। আগামী ৩-৫ এপ্রিল এই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের মহাপরিচালক মুনীর চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, বাণিজ্য নীতি পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এমনভাবে বাণিজ্য নীতি ঢেলে সাজানো হয়েছে, যাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায়। তিনি বলেন, বাণিজ্য নীতির পুনর্বিন্যাস একটি ধারাবাহিক কাজ। ডব্লিউটিও ইতোমধ্যে কিছু সুপারিশ দিয়েছে। বাংলাদেশও তার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। রূপকল্প-২১ বাস্তবায়ন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন উত্তরণ, ৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন এবং ৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন পূরণ করতে হলে আমদানির বিপরীতে রফতানি বাড়ানো প্রয়োজন। এ কারণে পৃথিবীর সেরা উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশে বাণিজ্য নীতি পৌঁছে দিয়েছে ডব্লিউটিও। বিনিয়োগে ওয়ান স্টপ সার্ভিস নিশ্চিত, কাস্টমস ও বন্দর পরিস্থিতি, বিদেশী বিনিয়োগ নীতি, দেশের শ্রম বাজার পরিস্থিতি, পিটিএ-এফটিএ, লভ্যাংশ স্থানান্তর প্রক্রিয়া, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিস্থিতিসহ দেশের সামগ্রিক অবকঠামোর একটি চিত্র প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। আশা করছি, বাণিজ্য নীতি পুনর্বিন্যাস সদস্য দেশগুলো ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখবে এবং এদেশে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে।

এদিকে, ডব্লিউটিওর সদস্য হিসেবে প্রত্যেকটি দেশকেই বাণিজ্য নীতি পুনর্বিন্যাস করতে হয়। এটি হয়ে থাকে বিশ্ব বাণিজ্যে কোন দেশের কতটা অংশগ্রহণ, তার ভিত্তিতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), জাপান ও চীনকে পর্যালোচনা করতে হয় দুই বছর পর পর। উন্নত আরও ১৬ দেশকে করতে হয় চার বছর পর পর। বাংলাদেশসহ বাকি দেশগুলো করে থাকে ছয় বছর পর। বাংলাদেশের সর্বশেষ বাণিজ্যনীতি পর্যালোচনা হয়েছিল ’১২ সালে। এবার হচ্ছে পঞ্চমবারের মতো। প্রথমটি হয়েছিল ১৯৯২ সালে। ডব্লিউটিওর নিয়মনীতি অনুযায়ী বাণিজ্য পরিবেশ উন্নয়ন সংক্রান্ত বিধিবিধান প্রত্যেক সদস্য দেশের মেনে চলা বাধ্যতামূলক। এর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।

এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি মোঃ জসিম উদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, বাণিজ্যনীতি পুনর্বিন্যাস হয় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম মেনে। এমনভাবে বাণিজ্যনীতি হওয়া উচিত যাতে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়ে। দেশীয় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে এগিয়ে আসেন। তিনি বলেন, দেশকে মধ্য আয়ের দেশে রূপান্তর, দারিদ্র্য বিমোচন ও ব্যাপক ভিত্তিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সবচয়ে বেশি প্রয়োজন বিদেশী বিনিয়োগ। আশা করছি বাণিজ্যনীতি পুনর্বিন্যাসের ফলে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে। তবে ডব্লিউটিও শর্ত না মেনে ভ্যাট ও আয়কর আইন কার্যকরে দেশী উদ্যোক্তাদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা প্রয়োজন।

এদিকে, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে প্রভাবিত করে এমন নিয়মকানুন ও রীতিনীতিসমূহের একটি সমন্বিত রূপ হলো বাণিজ্যনীতি। বাণিজ্যনীতি যত স্পষ্ট হয়, ততই তা ব্যবসায়ী ও বাণিজ্য অংশীদারদের জন্য সহায়ক হয়। এবারের বাণিজ্য নীতিতে যেসব বিষয়ে ধারণা দেয়া হয়েছে তা হলো-আমদানি নীতি আদেশ, রফতানিনীতি, বাণিজ্য প্রতিরক্ষা, বিভিন্ন ধরনের সংস্কার, কাস্টমস ও সীমান্ত বিষয়, আন্তর্জাতিক পরিবহন নেটওয়ার্ক, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি ও মুক্তবাণিজ্য চুক্তি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার নীতি, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস সুরক্ষা, গুণগত অবকাঠামো, সরকারী কেনাকাটা, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাণিজ্য উদ্যোগ, মুদ্রা ও বিনিময় হার নীতি, আর্থিক নীতি ও কর কাঠামো, বাণিজ্য সম্পর্কিত অবকাঠামো উন্নয়ন ও সরকারী-বেসরকারী অংশীদারিত্ব প্রভৃতি।

এছাড়া দেশের শিল্প ও এসএমই নীতি কৃষি ও অন্যান্য খাত বিষয়ক নীতি, বিশ্ববাজারে প্রবেশগম্য, আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশগম্যতা, বিদ্যমান ও সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের চ্যালেঞ্জ, কর্মসংস্থান ও শ্রম অধিকার, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও সামাজিক সুরক্ষা, পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন, আমদানি-রফতানি নীতির মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়ও বাণিজ্যনীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, বাণিজ্যনীতি পর্যালোচনা একটি বহুমাত্রিক ও বিশদ কাজ। এটি শুধু বাণিজ্যের মধ্যে আটকে থাকার বিষয় নয়। আমদানিনীতি, রফতানিনীতি, উৎপাদিত পণ্যের মান, পর্যটনশিল্প, আইনী পদ্ধতি, সেবা খাত এমনকি রাষ্ট্রব্যবস্থা কী ধরনের তাও এই বাণিজ্যনীতি পর্যালোচনার মধ্যে উঠে আসে। এবারের বাণিজ্যনীতি পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে প্রধান ও সম্ভাবনাময় বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে এফটিএ করার বিষয়টি অনেকদূর এগিয়ে নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া, তুরস্ক, ভুটান, নাইজিরিয়া, মেসিডোনিয়া, মিয়ানমার, মালি ও মরিশাসের সঙ্গে এফটিএ করা নিয়ে আলোচনা করছে সরকার।