২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চট্টগ্রাম হবে ওয়ান সিটি টু টাউন ॥ স্বপ্নের কর্ণফুলী টানেল

চট্টগ্রাম হবে ওয়ান সিটি টু টাউন ॥ স্বপ্নের কর্ণফুলী টানেল

মোয়াজ্জেমুল হক/হাসান নাসির ॥ নদীর তলদেশ দিয়ে উপমহাদেশের প্রথম সুড়ঙ্গপথ স্বপ্নের কর্ণফুলী টানেল। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার এই মহাপ্রকল্পের কাজ এর মধ্যেই ৩২ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হবে টানেলের মূল খনন কাজ। চীন থেকে এসে গেছে প্রয়োজনীয় ভারি যন্ত্রপাতি। এখন শুধু কর্মযজ্ঞ শুরু হওয়ার অপেক্ষা। কর্ণফুলী নদীর এই টানেলে চট্টগ্রাম হবে চীনের সাংহাই সিটির আদলে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার পথে অর্থনীতিকে পূর্বমুখী করার ক্ষেত্রে বড় একটি ধাপ এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। কেননা, এই টানেল ধরেই অদূর ভবিষ্যতে যোগাযোগ সম্প্রসারিত হবে দেশের বাইরে। কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়, মূল খনন কাজ শুরু করতে সকল প্রস্তুতিই সম্পন্ন। চট্টগ্রাম নগরীর প্রান্ত নেভাল একাডেমি দিয়ে টিউব প্রবেশ করে তা বের হবে আনোয়ারায় অবস্থিত কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো) ও চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) মাঝামাঝি স্থান দিয়ে। ১১ মিটার দূরত্বে নির্মিত হবে দুটি টিউব। একটি দিয়ে শহর থেকে যানবাহন যাবে নদীর ওপারে, আরেকটি টিউবে প্রবেশ করবে চট্টগ্রাম শহরে। টানেলের সঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড যুক্ত হয়ে সৃষ্টি হবে দীর্ঘ এক মেরিন ড্রাইভ, যা এক পর্যায়ে প্রসারিত হবে মীরসরাই থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত দীর্ঘ এক মেলবন্ধনে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি কর্ণফুলী টানেলের বোরিং কাজ উদ্বোধনে সম্মতি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। নেভাল একাডেমি থেকে আনোয়ারা প্রান্ত পর্যন্ত এই টানেলের দৈর্ঘ্য হবে সোয়া ৩ কিলোমিটার। টিউব স্থাপিত হবে নদীর তলদেশ হতে ১৮ থেকে ৩১ কিলোমিটার গভীরে। চার লেনের এই টানেলে চলাচল করতে পারবে ভারি যানবাহনও। এতে করে বন্দর সুবিধা নিয়ে নদীর দক্ষিণ পাড়েও গড়ে উঠবে শিল্প কারখানা ও শহর। চট্টগ্রাম হবে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’। পাশাপাশি কর্ণফুলীর তীর থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর দীর্ঘ এলাকা সাজবে দৃষ্টিনন্দন সাজে। প্রাচ্যের রানী চট্টগ্রাম ফিরে পাবে তার নান্দনিক চেহারা।

কর্ণফুলীর তলদেশে টিউব দুটির দৈর্ঘ্য হবে ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার। পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে থাকবে মোট ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার এপ্রোচ সড়ক। একই প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ৭২৭ মিটার ওভারব্রিজ। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন এ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে এরই মধ্যে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে অধিগ্রহণ করা জমি। আগামী ২০২২ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এই টানেল দিয়ে যানবাহন চলাচল করবে বলে আশা করছে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়।

সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সোমবার ঢাকায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নিশ্চিত করেন কর্ণফুলী টানেলের বোরিং কাজ শুরুর বিষয়টি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি মূল খনন কাজ শুরু হয়ে তা ২০২২ সালের মধ্যে শেষ হবে, এমনই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মন্ত্রী।

কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী হারুনুর রশিদ চৌধুরী জানান, সড়ক ও সেতু বিভাগের অধীনে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ইতোপূর্বে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। জি টু জি (সরকার টু সরকার) ভিত্তিতে মূল টানেলের সমুদয় অর্থ যোগান দিচ্ছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত এক্সিম ব্যাংক। সার্বক্ষণিক বিদ্যুত সুবিধার জন্য থাকবে ১৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পাওয়ার স্টেশন। চীন থেকে আমদানি করা সকল যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের শুল্ককর প্রদান করবে বাংলাদেশ সরকার। এপ্রোচসহ এর দৈর্ঘ্য হবে ৯ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার।

কর্ণফুলী টানেলের মূল খনন কাজ শুরু করার সকল প্রস্তুতি চূড়ান্ত। মাটি খুঁড়ে টিউব ঢোকাতে চীন থেকে এসে গেছে ৯৪ মিটার দৈর্ঘ্যরে ও ২২ হাজার টন ওজনের বোরিং মেশিন। দুটি টিউবের মধ্যে প্রতিটি টিউব চওড়ায় হবে প্রায় ৩৫ ফুট এবং উচ্চতা হবে প্রায় ১৬ ফুট। ফলে বড় যানবাহন চলাচলেও কোন সমস্যা হবে না। প্রতিটি টিউবে দুটি স্কেল থাকবে, যানবাহন চলাচল করবে দুই লাইনে। পাশে থাকবে একটি সার্ভিস টিউব। টিউব দুটির মাঝখানে দূরত্ব থাকবে ১১ মিটার।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সুদূর প্রসারী পরিকল্পনায় চট্টগ্রাম পেয়েছে অনেক বেশি গুরুত্ব। কেননা, এই চট্টগ্রামেই রয়েছে দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর, যা আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের অন্তত ৯০ শতাংশ হ্যান্ডলিং করে। তাছাড়া সরকারের রয়েছে মিয়ানমার, চীন, থাইল্যান্ড পর্যন্ত বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপন করার পরিকল্পনা। চট্টগ্রামকে বাদ দিয়ে পূর্বমুখী হওয়া বা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা অসম্ভব, বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই বাস্তবায়িত হচ্ছে অনেকগুলো মেগাপ্রকল্প। দেশের বৃহত্তম ইকোনমিক জোন হচ্ছে চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলায়। মীরসরাই, সীতাকু-ু ও সোনাগাজী নিয়ে গঠিত বৃহৎ এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের নামকরণ হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগর’। আনোয়ারায় হচ্ছে আরেকটি ইকোনমিক জোন। কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়িতে এলএনজি টার্মিনাল, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ফোরলেন সড়কসহ বৃহৎ প্রকল্পগুলোর কাজ চলমান, যা এ সরকারের মেয়াদেই শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।