২১ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্যাকেটজাত গরুর দুধের রাসায়নিকের মাত্রা নিরূপণের নির্দেশ

  • হাইকোর্টের রুল

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঢাকাসহ সারাদেশে উৎপাদিত ও বাজারে প্যাকেটজাত গরুর দুধ, দই ও গোখাদ্যে কী পরিমাণ ব্যাক্টেরিয়া, কীটনাশক, এ্যান্টিবায়োটিক ও সীসা রাসায়নিকের মাত্রা রয়েছে তা নিরূপণের জন্য একটি জরিপ পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে খাদ্য সচিব, মৎস্য ও প্রাণী সচিব, কৃষি সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ সকল সদস্য, কেন্দ্রীয় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটি এবং বিএসটিআইর চেয়ারম্যানকে জরিপের প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে। রুলে দুগ্ধজাত খাবার ভেজাল প্রতিরোধে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন বেআইনী ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি খাদ্যে ভেজালের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া পরবর্তী শুনানির জন্য ৩ মার্চ দিন ঠিক করেছে হাইকোর্ট। বিচারপতি মোঃ নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ সোমবার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুলে এ আদেশ প্রদান করে।

রবিবার জনস্বার্থ ইনস্টিটিউটের সভাকক্ষে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, প্রতিমন্ত্রী ডাঃ মুরাদ হাসানসহ অন্যান্য কর্মকর্তার উপস্থিতিতে। ওই প্রতিবেদনের আলোকে সোমবার আদালত উপরোক্ত আদেশ দিয়েছে। আদালতে দুদকের পক্ষে ছিলেন এ্যাডভোকেট মামুন মাহবুব। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি এ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক। শুনানির সময় আদালত মন্তব্য করেছে দুধ, দই ও দুধজাত পণ্যে ভেজাল মেশানোকে মারাত্মক দুর্নীতি। খাদ্যে ভেজাল মেশানো একটি সিরিয়াস করাপশন। এ ধরনের ভেজালে মানুষের কিডনি, লিভার নষ্ট হচ্ছে, ক্যান্সার হচ্ছে। মানুষ শুধু টাকার পেছনে ঘুরছে। দেশ ও দেশের মানুষ নিয়ে কেউ ভাবছে না। স্বাস্থ্যই যদি ঠিক না থাকে, তাহলে এত টাকাপয়সা দিয়ে হবেটা কী?

আদেশের পর মামুন মাহবুব সাংবাদিকদের বলেন, দুধ, দই, গোখাদ্যে ভেজাল মেশানো এবং তা বাজারজাত করাকে আদালত সিরিয়াস করাপশন বলেছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধান, তদন্ত করে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে দুদককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের ডিএজি আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, আদেশের আগে প্রথমেই আদালত এ বিষয়ে সরকার ও দুদকের বক্তব্য জানতে চায়। পরে আদালত অন্তর্বর্তী নির্দেশনাসহ রুল জারি করেছে। তিনি বলেন, দেশের ভেতরে উৎপাদিত ও বাজারে প্যাকেটজাত দুধ, দই ও গোখাদ্যে ব্যাক্টেরিয়া, কীটনাশক, এ্যান্টিবায়োটিক, সীসা, রাসায়নিকের মাত্রা নিরূপণে বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে জরিপ চালানোর নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য আগামী ৩ মার্চ ঠিক করেছে আদালত। সেই সঙ্গে একটি ইংরেজী দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবেদককে প্রতিবেদনটি হলফনামা আকারে দাখিল করতে বলেছে। এখানে সর্বোচ্চ শাস্তি বলতে বলা হয়েছে স্পেশাল পাওয়ার এ্যাক্টের ২৫(৩) এ যাবজ্জীবন কারাদ- ।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আর্থিক সহায়তায় গোখাদ্য, দুধ, দই ও বাজারে থাকা প্যাকেটের পাস্তুরিত দুধ নিয়ে সরকারী প্রতিষ্ঠান জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগার (এনএফএসএল) জরিপ চালায়। এনএফএসএল জরিপের জন্য দেশের বিভিন্নস্থান থেকে গাভীর দুধের ৯৬টি নমুনা সংগ্রহ করে। ঢাকাসহ তিন জেলার ছয়টি উপজেলাসহ ১৮টি স্থান থেকে দুধের পাশাপাশি অন্যান্য নমুনাও সংগ্রহ করা হয়। গাভীর দুধ ও গোখাদ্য সরাসরি খামার থেকে সংগ্রহ করা হয়। ঢাকা শহরের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দোকান ও আশপাশের উপজেলার দোকান থেকে দই সংগ্রহ করে এনএফএসএল। বিভিন্ন সুপার স্টোর থেকে সংগ্রহ করা হয় বাজারে প্রচলিত প্রায় সব ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত তরল দুধ এবং আমদানি করা প্যাকেট দুধ।

রবিবার জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে খবর প্রকাশিত হয়। ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, গরুর দুধ বা দুগ্ধজাত খাদ্যে মিলেছে মানুষের শরীরের জন্য নানান ক্ষতিকর উপাদান। গরুর খোলা দুধে অণুজীবের সহনীয় মাত্রা সার্বোচ্চ ৪ থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে ৭ দশমিক ৬৬ পর্যন্ত। গোখাদ্যের ৩০টি নমুনা পরীক্ষা করে কীটনাশক (২ নমুনায়), ক্রোমিয়াম (১৬টি নমুনায়), টেট্রাসাইক্লিন (২২টি নমুনায়), এনরোফ্লোক্সাসিন (২৬টি নমুনায়), সিপ্রোসিন (৩০টি নমুনায়) এবং আফলাটক্সিন (৪টি নমুনায়) গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রা পাওয়ার কথা জানিয়েছে এনএফএসএল। গাভীর দুধের ৯৬টি নমুনার মধ্যে ৯ শতাংশ দুধে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কীটনাশক, ১৩ শতাংশে টেট্রাসাইক্লিন, ১৫ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রায় সীসা পেয়েছে তারা। ৯৬ শতাংশ দুধে বিভিন্ন ব্যাক্টেরিয়াও পাওয়া গেছে। প্যাকেটের দুধের ৩১টি নমুনায় ৩০ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি হারে টেট্রাসাইক্লিন পাওয়ার কথাও জানিয়েছে এনএফএসএল। একটি নমুনায় সীসা মিলেছে। একই সঙ্গে ৬৬ থেকে ৮০ শতাংশ দুধের নমুনায় বিভিন্ন ব্যাক্টেরিয়া পাওয়ার কথা জানিয়েছে তারা। দইয়ের ৩৩টি নমুনা পরীক্ষা করে একটিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি সীসা পাওয়ার কথা জানিয়েছে এনএফএসএল। ৫১ শতাংশ নমুনায় মিলেছে বিভিন্ন ব্যাক্টেরিয়া।